
রাঙ্গামাটি:- রাঙ্গামাটিতে অনুষ্ঠিত ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ এবং বিজ্ঞান মেলায় এবার দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে এক ক্ষুদে বিজ্ঞানীর ব্যতিক্রমধর্মী দুটি উদ্ভাবন। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সামনে রেখে রাঙ্গামাটির লেকার্স পাবলিক স্কুল ও কলেজ এর শিক্ষার্থী সুজন চাকমা উপস্থাপন করেছে “আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা” এবং “বোমা নিষ্ক্রিয়কারী রোবট” নামের দুটি উদ্ভাবনী প্রকল্প। মেলায় অংশ নেওয়া শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অভিভাবক ও সাধারণ দর্শনার্থীদের মধ্যে তার প্রজেক্ট নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
“উদ্ভাবন নির্ভর বাংলাদেশ গঠন” প্রতিপাদ্যে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই বিজ্ঞান মেলা শুক্রবার সকালে রাঙ্গামাটি শহরের কুমার সুমিত রায় জিমনেসিয়ামে উদ্বোধন করেন রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এ মেলায় জেলার ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে। আগামী ১৭ মে পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন।
মেলার বিভিন্ন স্টলে কৃষি প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, রোবোটিক্স, স্মার্ট সিকিউরিটি, স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক নানা উদ্ভাবন স্থান পেলেও সুজন চাকমার উদ্ভাবিত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিভিত্তিক প্রকল্প দুটি দর্শনার্থীদের কাছে আলাদা গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে তার উদ্ভাবন।
মেলায় প্রদর্শিত “আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা” সম্পর্কে সুজন চাকমা জানান, এটি মূলত রাডারনিয়ন্ত্রিত একটি স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। দেশের আকাশসীমায় কোনো শত্রুপক্ষের মিসাইল বা সন্দেহজনক বস্তু প্রবেশ করলে রাডার সেটিকে শনাক্ত করবে এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয় করবে। এরপর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান নির্ণয় করে সেটিকে আকাশেই ধ্বংস করার চেষ্টা করবে।
তিনি বলেন, “বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেভাবে আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, সেই ধারণা থেকেই আমি ছোট পরিসরে এই মডেলটি তৈরি করেছি। ভবিষ্যতে উন্নত প্রযুক্তি ও গবেষণার সুযোগ পেলে এটিকে আরও আধুনিক করা সম্ভব।”
অন্যদিকে তার উদ্ভাবিত “বোমা নিষ্ক্রিয়কারী রোবট” নিয়েও দর্শনার্থীদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। সুজন জানান, রোবটটি দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এটি বিপজ্জনক বা সন্দেহজনক বিস্ফোরক দ্রব্যের কাছে গিয়ে সেটিকে পরীক্ষা ও নিষ্ক্রিয় করার কাজ করতে পারে। যদি কোনো বোমা নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব না হয়, তাহলে রোবটটি সেটিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে বিস্ফোরণের ব্যবস্থা করতে পারবে।
তিনি আরও জানান, রোবটটি বিশেষ তাপ সহনশীল উপাদান দিয়ে তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে এটি ১৩০০ থেকে ১৫০০ ডিগ্রি তাপমাত্রাও সহ্য করতে পারে। এর ফলে বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ অভিযানে মানুষের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
সুজন চাকমা বলেন, “আমি সবসময় প্রযুক্তিকে মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণে ব্যবহার করার চিন্তা করি। দেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজে সহায়তা করার মতো প্রযুক্তি উদ্ভাবনের স্বপ্ন দেখি। এই বিজ্ঞান মেলা আমাকে নিজের কাজ উপস্থাপনের সুযোগ দিয়েছে।”
ক্ষুদে এই বিজ্ঞানীর এমন উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় গর্বিত লেকার্স পাবলিক স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষও। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, সুজন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান, রোবোটিক্স ও প্রযুক্তি বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও তাকে বিভিন্ন গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, “বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা বাস্তবমুখী প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছে। সুজনের এই অর্জন শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, পুরো রাঙ্গামাটির জন্য গর্বের বিষয়।”
মেলায় আগত দর্শনার্থীরাও সুজন চাকমার উদ্ভাবনের প্রশংসা করেন। অনেকেই মনে করছেন, পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এসব শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
বিজ্ঞান মেলা উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (আইসিটি) আলমগীর হোসেন এবং জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সরিৎ কুমার চাকমা।
বক্তারা বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনী চিন্তা বিকাশে এ ধরনের বিজ্ঞান মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা আরও বলেন, প্রযুক্তিতে দক্ষ নতুন প্রজন্মই ভবিষ্যতে দেশের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দেবে।