
এ এইচ এম ফারুক:- পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের ‘বিভেদ নয়, সংহতির’ পথে হাঁটতে হবে। বাঙালি হোক বা পাহাড়ি- সবাই এই মাটির সন্তান। কাউকে উচ্ছেদ করে বা কাউকে বঞ্চিত করে এখানে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি আসবে না। বহু জাতি হিসেবে আমাদের “বাংলাদেশি” পরিচয় এক হলেও পাহাড়ের বৈচিত্র্যকে সম্মান জানাতে হবে। সেই লক্ষ্যে আসন্ন নতুন সরকারের উদ্দেশে কিছু প্রস্তাবনা নিচে তুলে ধরা হলো।
এক. এক-দশমাংশ ভূখণ্ডের গুরুত্ব বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় দশভাগের একভাগজুড়ে বিস্তৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন জেলা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়, বরং বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২৬ সালের শুরুর দিকের জনমিতিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এ অঞ্চলের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৯ লাখ ২৫ হাজার ৭৭০ জন, যা দ্রুতই ২০ লাখের মাইলফলক স্পর্শ করবে। তবে এই বিশাল জনপদ ও তার বিচিত্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের জীবনযাত্রা সমতলের তুলনায় অনেক বেশি কণ্টকাকীর্ণ। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অভিযোগ, উন্নয়নের সুষম বণ্টনহীনতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা পাহাড়কে বারবার অস্থির করে তুলেছে। এখন সময় এসেছে প্রচলিত কাঠামো ভেঙে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বমূলক প্রশাসনিক সংস্কারের পথে হাঁটার।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সত্য হলো এর বিচিত্র জনমিতি। ২০২৬ সালের প্রক্ষেপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে এই অঞ্চলে বাঙালি জনগোষ্ঠী একক সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫০.৬২%)। এর পাশাপাশি চাকমা (২৩.৮৯%), মারমা (১০.৯৫%) এবং ত্রিপুরা (৭.৮৭%) বড় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে বিদ্যমান। এছাড়াও ম্রো, তঞ্চঙ্গা, বম, খিয়াং, খুমি, চাক, পাংখোয়া ও লুসাইদের মতো ক্ষুদ্র ও অতি-ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো এই জনপদের গুরুত্বপূর্ণ বাসিন্দা।
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো- সমতলের জনঘনত্বের মডেলে পাহাড়কে বিচার করার ফলে এখানকার মানুষ চরম রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার। বর্তমানে তিন পার্বত্য জেলার ২৬টি উপজেলায় ৩০টি পুলিশি থানা রয়েছে, অথচ সংসদীয় আসন মাত্র ৩টি। সমতলে যেখানে গড়ে ২ থেকে ৩টি থানা বা ১-২টি উপজেলা নিয়ে একটি সংসদীয় আসন গঠিত হয়, সেখানে পাহাড়ের বিশাল দুর্গম এলাকা; যা আয়তনে সমতলের এক একটি জেলার সমান—সেখানে মাত্র একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে জনসেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব। এটি কেবল প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়, বরং একটি সুষ্পষ্ট গণতান্ত্রিক বৈষম্য।
তিন. ভূ-রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ অনৈক্য পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তির মূলে রয়েছে নানামুখী অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রভাব। বিশেষ করে ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ার কারণে এ অঞ্চলটি সবসময়ই আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে যেমনটি উঠে এসেছে, পার্শ্ববর্তী দেশের নানামুখী ‘নীলনকশা’ এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে নড়বড়ে করতে চায়।
অভ্যন্তরীণভাবে, বিভিন্ন সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যকার ভাতৃঘাতী সংঘাত, চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াই সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। চাঁদাবাজি, ভূমি বিরোধ ও অধিকারের প্রশ্নে সাম্প্রদায়িক তিক্ততা মাঝে-মাঝেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সব জাতিগোষ্ঠীর সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব না থাকায় অনেক ক্ষুদ্র গোষ্ঠী নিজেদের রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে, যা প্রকারান্তরে বিচ্ছিন্নতাবাদকে উসকে দেয়।
জেলা ও সংসদীয় আসন বিন্যাস পাহাড়ের এই বৈষম্য দূর করতে হলে আমাদের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণে সাহসী হতে হবে। আমাদের প্রস্তাবনা হলো—
১. থানার সংখ্যা বৃদ্ধি: বর্তমানে বিদ্যমান ৩০টি থানাকে পুনর্গঠিত করে অন্তত ৪০টি থানায় রূপান্তর করা প্রয়োজন। রাঙ্গামাটির দুর্গম সাজেক, খাগড়াছড়ি প্রাচীন এলাকা তবলছড়ি বা বান্দরবানের ঘুমধুমের মতো এলাকাগুলোতে পুলিশি সেবা পৌঁছাতে নতুন থানার কোনো বিকল্প নেই।
২. সংসদীয় আসন বৃদ্ধি: বর্তমানের ৩টি আসনের স্থলে জনসংখ্যার অনুপাত এবং ভৌগোলিক বিশালতা বিবেচনায় কমপক্ষে ১১ থেকে ১৫টি আসন করা জরুরি। একটি সম্ভাব্য বিন্যাস হতে পারে— বান্দরবানে ৪টি, রাঙ্গামাটিতে ৫টি এবং খাগড়াছড়িতে ৬টি আসন। এতে তৃণমূলের প্রতিটি সমস্যার কথা জাতীয় সংসদে জোরালোভাবে আলোচিত হবে। সংসদ হবে বৈচিত্র্যময়, যেখানে পাহাড়ের বড় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি কম জনসংখ্যার জনপ্রতিনিধিও সংসদে প্রতিনিধিত্ব করলে সবার অংশগ্রহণের পাশাপাশি বৈচিত্র্য বাড়বে।
৩. প্রশাসনিক পুনর্গঠন: যদি সম্ভব হয়, তবে তিনটি জেলাকে ভেঙে আরও ছোট ছোট প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করা যেতে পারে (যেমন ৬-৯টি জেলা), যাতে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ও সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে।
একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কাঠামো পাহাড়ের স্থায়ী শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কেবল আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন যথেষ্ট নয়। এখানে প্রয়োজন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্ল্যাটফর্ম। আমি একটি ৫০০ সদস্যের ‘জাতীয় উন্নয়ন ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করছি, যার কাঠামো হবে অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রতিনিধিত্বমূলক:
আহ্বায়ক ও প্রধান: মহামান্য রাষ্ট্রপতি, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবকের সরাসরি তত্ত্বাবধান পাহাড়ে বিবাদমান পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ম্যাজিকের মতো কাজ করবেন।
যুগ্ম আহ্বায়ক: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং ও সদস্য সচিব- মাননীয় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী।
সদস্য: প্রস্তাবিত ১৫টি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি।
কেন ৫০০ সদস্য? এই কমিটির সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হবে এর ‘সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’। ২০২৬ সালের প্রক্ষেপিত ডাটা অনুযায়ী, ৫০০ সদস্যের এই কমিটিতে বাঙালিদের জন্য থাকবে ২৫৩টি আসন। একইভাবে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের জন্য থাকবে যথাক্রমে ১১৯, ৫৫ ও ৩৯টি আসন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, খিয়াং, খুমি, চাক বা পাংখোয়াদের মতো অতি-ক্ষুদ্র জাতিসত্তা—যাদের সংখ্যা ৫ হাজার বা তারও কম; তারাও গাণিতিকভাবে অন্তত ১ জন প্রতিনিধি পাঠানোর সুযোগ পাবেন।
বর্তমান ব্যবস্থায় ক্ষুদ্রতম এই জাতিসত্তাগুলো (যেমন লুসাই বা পাংখোয়া) কোনো নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে না। ফলে তাদের অস্তিত্ব আজ বিলুপ্তির পথে; কিন্তু এই ৫০০ সদস্যের কমিটির মাধ্যমে তারা সরাসরি রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তাদের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরতে পারবেন। এটিই হবে প্রকৃত ‘বাংলাদেশপন্থি’ অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারলে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অপরিসীম। পর্যটন শিল্প, খনিজ সম্পদ এবং বনজ পণ্যের সঠিক ব্যবহার বাংলাদেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখতে পারে। সাজেক থেকে নীলগিরি পর্যন্ত যদি আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। সীমান্ত বাণিজ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে বান্দরবান ও খাগড়াছড়িকে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এসব সম্ভাবনার চাবিকাঠি হলো- স্থায়ী শান্তি এবং সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের ‘বিভেদ নয়, সংহতির’ পথে হাঁটতে হবে। বাঙালি হোক বা পাহাড়ি- সবাই এই মাটির সন্তান। কাউকে উচ্ছেদ করে বা কাউকে বঞ্চিত করে এখানে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি আসবে না। বহু জাতি হিসেবে আমাদের “বাংলাদেশি” পরিচয় এক হলেও পাহাড়ের বৈচিত্র্যকে সম্মান জানাতে হবে।
আমার প্রস্তাবিত ‘উন্নয়ন ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা কমিটি’ কেবল রাস্তাঘাট বা ব্রিজ বানাবে না, এটি কাজ করবে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ঘোচাতে। যখন একজন লুসাই প্রতিনিধি রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই টেবিলে বসে নিজের অধিকারের কথা বলবেন, তখন তিনি নিজেকে এই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার মনে করবেন। তখনই বিচ্ছিন্নতাবাদের রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে।
পরিশেষ: পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক অমূল্য সম্পদ। এ অঞ্চলকে ঘিরে বহিঃশত্রুর কোনো নীলনকশা সফল হতে দেওয়া যাবে না। আর সেই নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দেয়াল হলো অভ্যন্তরীণ ঐক্য। প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে সংসদীয় আসন বৃদ্ধি এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কমিটি গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
২০ লাখ মানুষের এই জনপদকে অবহেলা করে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আসুন সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে পাহাড়ের প্রতিটি ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করি। একটি বাংলাদেশপন্থি, সংহতিপূর্ণ এবং বৈষম্যহীন পার্বত্য চট্টগ্রামই হোক আমাদের আগামী দিনের লক্ষ্য। সুত্র যুগান্তর, লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক