
এসএম শামসুল আলম:– বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের একটি নতুন অধ্যায়ের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্ভাবনাকে নতুন করে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছান তিনি এবং ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন। সফরকালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
চার কর্মদিবসে তারেক রহমানের প্রায় ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল। ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অংশীদারত্ব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব আলোচনায় সমতা, ন্যায় ও মর্যাদার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বাংলাদেশ এখন আর শুধু জনবহুল একটি উন্নয়নশীল দেশ নয়; উৎপাদন, রপ্তানি, জনশক্তি, প্রবাসী আয় এবং শিল্পায়নের কারণে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও দেশটির গুরুত্ব রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে আরও বিদেশি বিনিয়োগ, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সক্ষমতার একটি উদাহরণ হচ্ছে দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে BEPZA-এর আওতাধীন অঞ্চলগুলো থেকে ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা দেশের মোট রপ্তানির ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। একই সময়ে এসব অঞ্চলে ২৫ হাজারের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং মোট কর্মসংস্থান ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯১-এ পৌঁছেছে।
প্রবাসীরাই অর্থনীতির অন্যতম শক্তি
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশে ২ দশমিক ৮৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও সাম্প্রতিক সময়ে আগের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে; ২০২৬ সালের আগস্টে মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং তাদের বিনিয়োগ ও দক্ষতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ
তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগ মহলের সঙ্গে যোগাযোগ। সফরসূচিতে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও ছিল। সেখানে বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে বাস্তব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরে রূপ দেওয়া। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আদায় ও কর্মসংস্থানের মতো অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান করাও জরুরি। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে এসব চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছে।
সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়
একটি দেশের সাফল্য শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়; অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের মধ্য দিয়েই তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও শিল্পায়নে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন এই সক্ষমতাকে আরও সুসংগঠিত করে একটি শক্তিশালী, বিনিয়োগবান্ধব ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা।
তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর সেই বৃহত্তর সম্ভাবনার কথাই সামনে এনেছে—বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে একটি সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে উপস্থাপন, জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিচয় আরও শক্তিশালী করতে হলে দেশের অর্জনগুলোকে সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলোরও বাস্তবসম্মত সমাধান করতে হবে। উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ব্যবসায়ী সমাজ, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক:- এসএম শামসুল আলম।
স্টাফ রির্পোটার,যমুনা টেলিভিশন।
সাবেক সভাপতি রাঙ্গামাটি প্রেসক্লাব।