
এসএম শামসুল আলম:—পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সমস্যা, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে নতুন করে কর্মকৌশল নির্ধারণে উচ্চপর্যায়ের তিনটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। ১০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনে গঠিত এসব কমিটিকে প্রচলিত আইন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির শর্ত ও বিদ্যমান বাস্তবতা পর্যালোচনা করে জাতীয় কর্মকৌশল তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে দেশের ৫২ জন বিশিষ্ট নাগরিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মূল বক্তব্য—পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় পক্ষগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
তবে সরকারের গঠিত কমিটিগুলোর দায়িত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উদ্যোগটির লক্ষ্য শুধু নিরাপত্তা নয়; এর সঙ্গে উন্নয়ন, সন্ত্রাস দমন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, আইন ও চুক্তির বাস্তবতা পর্যালোচনা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মকৌশল তৈরির বিষয়ও যুক্ত করা হয়েছে। পরামর্শক কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে সুপারিশ দিতে এবং নির্বাহী কমিটিকে সেই সুপারিশের ভিত্তিতে তিন মাসের মধ্যে জাতীয় কর্মকৌশলের খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা ও উন্নয়ন—দুই দিকেই নজর
পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা সমতলের অন্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্তবর্তী এলাকা, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট—সবকিছু মিলিয়ে এখানে প্রশাসন ও নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে শুধু একটি দিক বিবেচনায় নিয়ে পাহাড়ের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের তিন কমিটির কাঠামোতে নিরাপত্তা, উন্নয়ন, আইন, চুক্তি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে একই আলোচনার আওতায় আনার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে।
উদ্বেগকে সংলাপের সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে
৫২ বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্বেগকে সরকারের উদ্যোগের বিরোধিতা হিসেবে না দেখে প্রয়োজনীয় মতামত ও পরামর্শ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। পাহাড়ের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সরকার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বৈধ প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কার্যকর সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের কমিটিগুলো যদি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন পক্ষের মতামত গ্রহণ করে সুপারিশ প্রণয়ন করে, তাহলে উদ্বেগের জায়গাগুলোও অনেকটাই দূর করা সম্ভব হতে পারে।
চুক্তি, আইন ও বাস্তবতার সমন্বয় জরুরি
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। তাই চুক্তির বাস্তবায়ন, প্রচলিত আইন এবং বর্তমান পাহাড়ের বাস্তব পরিস্থিতি—এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সরকারের নির্বাহী কমিটিকে প্রচলিত আইন, চুক্তির শর্ত ও বিধিবিধান পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংস্কার কিংবা নতুন আইন প্রণয়নের বিষয়ে সুপারিশ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পাহাড়ের মানুষও চান শান্তি ও উন্নয়ন
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—নিরাপদ জীবন, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। পাহাড়ি ও বাঙালি—সব জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য সমান নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত যেকোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
সরকারের নতুন কমিটিগুলো যদি মাঠপর্যায়ের মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পর্যটন, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পাহাড়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সামনে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে মতপার্থক্য থাকবেই। কিন্তু মতপার্থক্যকে সংঘাতের কারণ না বানিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের তিন কমিটি সেই আলোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে—এখন এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে তারা কতটা বাস্তবভিত্তিক, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলকভাবে কাজ করতে পারে তার ওপর।
৫২ বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্বেগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তেমনি সরকারের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দায়িত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তির জন্য নিরাপত্তা, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক আস্থা এবং সংলাপ—সবকিছুকে একইসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ।
শেষ পর্যন্ত সরকারের এই উদ্যোগের সফলতা নির্ধারিত হবে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা নিরাপত্তা, শান্তি, উন্নয়ন ও আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়—তার ওপর।
লেখক:– এসএম শামসুল আলম।
স্টাফ রির্পোটার,যমুনা টেলিভিশন।
সাবেক সভাপতি,রাঙ্গামাটি প্রেসক্লাব।