শিরোনাম

পাহাড়ের সাংবাদিকতা: কষ্ট আছে, ঐক্য কোথায়?

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ দেখা হয়েছে

শামসুল আলম:- পাহাড়ে সাংবাদিকতা করা সহজ কোনো কাজ নয়। দুর্গম পথ, সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ঝুঁকি, দীর্ঘ সময় মাঠে থাকা, পর্যাপ্ত অর্থের অভাব—সবকিছুকে সঙ্গে নিয়েই পাহাড়ের সাংবাদিকরা প্রতিদিন কাজ করেন।
একজন সাংবাদিক খবর সংগ্রহ করতে কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড়ি পথে ছুটছেন, কখনো নৌপথে দুর্গম এলাকায় যাচ্ছেন, কখনো রাত-বিরাতে ছুটে যাচ্ছেন ঘটনাস্থলে। অনেক সময় নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সংবাদ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অথচ সেই সাংবাদিকের চাকরির নিশ্চয়তা নেই, নিয়মিত বেতন নেই, চিকিৎসা বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা নেই।
তারপরও তারা থেমে নেই। কারণ সাংবাদিকতা তাদের কাছে শুধু পেশা নয়—এটি মানুষের কথা বলার একটি দায়িত্ব।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি কষ্টের জায়গাটি কোথায় জানেন?
আমরা নিজেরাই নিজেদের শক্তি নষ্ট করছি।
পাহাড়ের সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যের চেয়ে এখন বিভাজন বেশি দৃশ্যমান। কে কোন সংগঠনে, কে কার সঙ্গে, কে কোন পক্ষের—এসব নিয়ে দলাদলি বাড়ছে। একই পেশার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার জায়গায় অনেক সময় প্রতিযোগিতা, বিরোধ এবং ব্যক্তিস্বার্থ জায়গা করে নিচ্ছে।
ব্যাঙের ছাতার মতো একের পর এক সাংবাদিক সংগঠন গড়ে উঠছে। সংগঠন হওয়া খারাপ কিছু নয়। বরং সাংবাদিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য শক্তিশালী সংগঠন প্রয়োজন। কিন্তু যখন সংগঠন ব্যক্তিগত প্রভাব, পদ-পদবি কিংবা বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সেটি সাংবাদিকদের শক্তি বাড়ায় না—বরং দুর্বল করে।
আজ পাহাড়ের সাংবাদিকদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আরও বেশি সংগঠন নয়; প্রয়োজন একটি শক্তিশালী পেশাগত ঐক্য, পারস্পরিক সম্মান এবং একে অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা।
আর একটি বিষয়ে আমাদের সবাইকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে—কানকথা ও গুজব।
কারও মুখের কথাকে যাচাই না করে আমরা যেন প্রশ্রয় না দিই। নিজেদের মধ্যকার ঐক্য নষ্ট করতে সব জায়গাতেই কিছু দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ থাকতে পারে। তারা কখনো সত্যকে মিথ্যা, আবার কখনো মিথ্যাকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে পারে।
তাই কারও বিরুদ্ধে কোনো কথা শুনলেই তা বিশ্বাস না করে আগে সত্যতা যাচাই করতে হবে। একজনের কথা শুনে আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা যাবে না। কোনো অভিযোগ থাকলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে হবে।
কারণ যারা আমাদের বিভক্ত দেখতে চায়, তাদের সুযোগ করে দিলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবো আমরাই।
আমরা যদি একজন সাংবাদিক বিপদে পড়লে তার পাশে না দাঁড়াই, চাকরি হারালে খোঁজ না নিই, অসুস্থ হলে পাশে না থাকি, অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার হলে প্রতিবাদ না করি—তাহলে আমাদের এত সংগঠন দিয়ে লাভ কী?
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন সাংবাদিকের দুর্বলতা মানে পুরো সাংবাদিক সমাজের দুর্বলতা।
পাহাড়ের সাংবাদিকতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ আছে, পেশাগত ঝুঁকি আছে, অর্থনৈতিক সংকট আছে। এর সঙ্গে যদি নিজেদের মধ্যকার বিভাজন, অবিশ্বাস, কানকথা ও পারস্পরিক সন্দেহ যোগ হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ আরও কঠিন হবে।
তাই এখন সময় এসেছে নিজেদের দিকে তাকানোর।
কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপি, কে জামায়াত—এই হিসাবের বাইরে গিয়ে আগে দেখতে হবে, কে সাংবাদিক।
কে কোন সংগঠনের নেতা—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত, সে সংগঠনটি সাংবাদিকদের জন্য কী করছে।
পদ-পদবির জন্য প্রতিযোগিতা নয়, সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিযোগিতা হোক।
নেতৃত্বের জন্য বিভাজন নয়, সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য ঐক্য হোক।
একজন আরেকজনকে টেনে নামানোর চেষ্টা নয়, বরং একজন পড়ে গেলে তাকে তুলে দাঁড় করানোর সংস্কৃতি তৈরি হোক।
পাহাড়ের সাংবাদিকরা অনেক কষ্ট করেন। তাদের অনেকের ঘরে অভাব আছে, জীবনে অনিশ্চয়তা আছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। এসব বাস্তবতা অস্বীকার করে শুধু সংগঠন আর পদ-পদবি দিয়ে সাংবাদিক সমাজকে শক্তিশালী করা যাবে না।
আমাদের দরকার সাংবাদিকদের জন্য একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ।
দরকার এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে নতুন সাংবাদিককে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহকর্মী হিসেবে দেখা হবে। সিনিয়র সাংবাদিক জুনিয়রকে পথ দেখাবেন, জুনিয়র সিনিয়রকে সম্মান করবেন। মতের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকবে না।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই নৌকার যাত্রী।
পাহাড়ের মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে তাদের কথা বলার জন্য। অথচ আমরা যদি নিজেদের কথাই একসঙ্গে বলতে না পারি, তাহলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের হয়ে কতটা শক্তভাবে দাঁড়াতে পারব?
তাই আসুন, সংগঠন কমাই বা না কমাই—বিভাজনটা অন্তত কমাই।
কানকথায় কান না দিয়ে সত্য যাচাই করি।
গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে একে অন্যের ওপর বিশ্বাস রাখি।
আসুন, পদ-পদবির রাজনীতি থেকে বের হয়ে সাংবাদিকতার মর্যাদার রাজনীতি করি।
আসুন, একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—সহযোদ্ধা হই।
পাহাড়ের সাংবাদিকতা বাঁচুক, পাহাড়ের সাংবাদিক বাঁচুক।
সাংবাদিকের কলম হোক স্বাধীন, নিরাপদ ও শক্তিশালী।
কানকথা, বিভাজন ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হোক—আমরা সাংবাদিক।
এসএম শামসুল আলম, সংবাদকর্মী। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions