শিরোনাম
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ — পার্বত্য মন্ত্রী বছরে একদিন এক সুতোয় ‘প্রেমের’ মালা গাঁথেন তারা ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী যে মেলায় পুরুষের প্রবেশ নিষেধ, কোটি টাকার বেচাকেনা পাহাড়ে শুরু হচ্ছে বৈসাবি উৎসব: বিঝু দিয়ে সূচনা, সাংগ্রাইয়ে সমাপ্তি—ভিন্ন নামে একই আনন্দ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি পায়নি ‘বাংলার জয়যাত্রা’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন বিল পাস বিএনপি কেন এক টার্মের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারে না রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে বিজিবির অভিযানে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার

বছরে একদিন এক সুতোয় ‘প্রেমের’ মালা গাঁথেন তারা

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬৪ দেখা হয়েছে

ডেস্ক রির্পোট:::-পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের লোকজনকে জাত্যাভিমান, হিংসা-বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতা ভুলে, শান্তি-সম্প্রীতি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন বছর উদযাপনে এক সুতোয় গেঁথেছে একটি শব্দ। আর তা হলো ‘বৈসাবি’ উৎসব। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আনন্দগাঁথা জীবনের গল্প। যে গল্প এক হওয়ার, মিলেমিশে থাকার, স্বপ্নের জাল বুনার, মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের মাধ্যমে উন্নয়নের শীর্ষে নিজেদেরকে নিয়ে যাওয়ার।

‘বৈসাবি’ এখন আগের চেয়ে বর্ণিল——-
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘বৈসাবি’ হয়েছে আগের চেয়ে আরও বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য। উৎসবে যুক্ত হয়েছে নানা আয়োজন। সময়ের পাটাতনে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন জাগে, তাহলে ৩৫ থেকে ৪০ বছর আগে কেমন ছিল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর বর্ষবরণ ও বিদায় উদযাপন? তখন কীভাবে উদযাপন করা হতো মারমাদের সাংগ্রাইং, ম্রোদের সাংক্রান, ত্রিপুরাদের বৈসু, চাকমাদের বিজুসহ অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলোর এই উৎসব। তখনকার বর্ষবরণের আয়োজন জানার আগ্রহ ও কৌতূহল রয়েছে অনেকের।

রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি—দেশের এই তিন পার্বত্য জেলায় বসবাস ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর। তাদের মধ্যে আটটি জাতিগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসব হচ্ছে ‘বৈসাবি’। মূলত ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাইয়ের সঙ্গে প্রায় মিল থাকা ম্রোদের চাংক্রান, খেয়াংদের সাংলান, খুমিদের চাংক্রাই ও চাকদের সাংগ্রাই এবং চাকমাদের বিজু ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু উৎসবের আদ্যক্ষর থেকে ‘বৈসাবি’ নামের শব্দটি নেওয়া হয়। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বম, পাংখোয়া ও লুসাইরা খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদযাপন করেন।

আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে উৎসব অর্থে বৈসাবি শব্দটি ধীরে ধীরে পরিচিতি লাভ করেছে। এর আগে বিজু, বিষু, বৈসু, সাংগ্রাইং, সাংক্রানসহ আরও বিভিন্ন নামে উৎসব হয়েছে। উৎসবটি সবার অভিন্ন, শুধু নাম ভিন্ন। তবে বেশ কিছু বছর ধরে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ে বৈসাবি শব্দটি নিয়ে বিতর্ক চলছে। অনেকের মতে, বৈসাবি নামে পাহাড়ে কোনও উৎসব নেই। অন্যরা বলছেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রয়োজনেই বৈসাবি শব্দটি এসেছে।

 

যে গল্প এক হওয়ার, মিলেমিশে থাকার, স্বপ্নের জাল বুনার

বৈসাবি নাম আসার সঙ্গে লোকজ উৎসবটির দৃশ্যমান নাগরিক ছোঁয়াও এসেছে। তখন থেকে শোভাযাত্রা, ফুল ভাসানো, মৈত্রী পানিবর্ষণ, ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়াসহ নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। অবশ্য বান্দরবানে ১৯৭০–এর দশকের মাঝামাঝিতে পাশের দেশ মিয়ানমারের অনুকরণে মৈত্রী পানিবর্ষণ শুরু হয়েছিল। অভিন্ন নাম বৈসাবি করার আগে উৎসবের কোনও আনুষ্ঠানিকতা ছিল না।

বৈসাবি ঐতিহ্য——-
খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. সুধীন কুমার চাকমার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার ও জীবনগাঁথা রয়েছে। শত শত বছর ধরে এসব ঐতিহ্য ও চলে আসা রীতি-নীতির আলোকেই প্রত্যেক বছর বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে আর বিদায় দেওয়া হয় পুরাতন বছরকে। প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠী নিজেদের ধারণ করা রীতিনীতি, কৃষ্টি-সংস্কৃতির ও নিজ নিজ ধর্মীয় বিধিবিধানের আলোকে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি ধারণ-লালন ও পালন করে আসছিল বিধায় পাহাড়ের নব বর্ষ পালনকে এখন সবচেয়ে বড় সামাজিক অনুষ্ঠান। শত শত বছর ধরে চলে আসা, লালন করা, পালন করা এবং বংশ পরম্পরায় প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রচলিত রয়েছে বিবেচনায় এটিকে ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান বলা হয়।

তিনি জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর বর্ষ পালন অনুষ্ঠান বৈসু বা বৈসুক, চাকমা জাতিগোষ্ঠী বিজু, মারমা জাতিগোষ্ঠী সাংগ্রাইকে উৎসব হিসেবে পালন করে আসছে। এর মধ্যে ত্রিপুরা ও চাকমা জাতিগোষ্ঠী পুরাতন বছরের শেষ দুই দিন থেকে নববর্ষের প্রথম দিন পর্যন্ত তিন দিন ধরে নববর্ষ বরণ করে আসছে।

ত্রিপুরাদের নববর্ষ বৈসু বা বৈসুক——
গভেষক-লেখক প্রভাংশু ত্রিপুরা, জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, সাবেক খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরা জানান, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর নতুন বর্ষ পালনকে ’বৈসু’ বা ’বৈসুক’ নামে অবহিত করা হয়। এই জনগোষ্ঠী নতুন বছরকে স্বাগত জানায় তিন দিনের কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে। ত্রিপুরারা প্রথম দিন তথা চৈত্র মাসের শেষের দিনের আগের দিন হাড়ি বৈসু পালন করে। এই দিন তারা বিভিন্ন ফুল সংগ্রহ করে এবং ঘর-বাড়ি-আঙ্গিনা-প্রার্থনালয় তথা মন্দির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সংগ্রহ করা ফুল দিয়ে সাজায় এবং সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির আশায় প্রার্থনা করে। চৈত্র মাসের শেষ দিনে ত্রিপুরারা বৈসুকমা পালন করে। এই দিন তারা পাজনসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার খায় এবং অতিথিদের আপ্যায়ন করে এবং তৃতীয় দিন তথা পহেলা বৈশাখ ত্রিপুরারা বিসি কতাল পালন করে থাকে। এই দিন নানা খেলাধুলা, ঘুরে বেড়ানো, ঐতিহ্যবাহী খাবার-পানীয় গ্রহণ ও মন্দিরে প্রার্থনা করার মাধ্যমে পালন করা হয়।

 


আটটি জাতিগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসব হচ্ছে ‘বৈসাবি’

মারমাদের সাংগ্রাই——
মারমা সুশীল সমাজের প্রতিনিধি উক্য জেন, মংসানু মারমা, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী ও ম্রাসাথোয়াই মারমা জানান, সাংগ্রাই উৎসব মারমারা তিন দিনব্যাপী উদযাপন করে। সাংগ্রাইয়ের প্রথম দিনকে মারমারা সাংগ্রাই আক্যা পালন করে থাকে। এদিন তারা বাড়িঘর, আশপাশের রাস্তা-ঘাট, বিহার, প্রার্থনালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কক্ষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে এবং প্রার্থনা করে। দ্বিতীয় দিন সাংগ্রাই বাক পালন করে থাকে। এদিন তারা বিভিন্ন ফুল সংগ্রহের প্রতিযোগিতা করে তা দিয়ে ঘরবাড়ি, ধর্মালয় সাজায় ও প্রার্থনা করে। তারা বিশ্বাস করে যে যত বেশি ফুল দিয়ে পূজা করবে, বুদ্ধ তাকে তত পুণ্য দেবেন। মারমারা তৃতীয় দিনে সাংগ্রাই আপ্যাইং পালন করেন। এই দিন মারমা ধর্মীয় গুরু ভিক্ষুদের, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও আগত অতিথিদের পিঠা-পায়েশ-পাজন ও নানা ধরনের আধুনিক খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে আপ্যায়ন করে থাকে। সাংগ্রাইয়ের তিন দিন মারমাদের অনেকে ধর্মীয় অষ্টশীল পালন করে থাকে।

চাকমাদের বিজু——
খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. সুধীন কুমার চাকমা, সাবেক অধ্যক্ষ বোধিসত্ব দেওয়ান ও প্রফেসর মধু মঙ্গল চাকমা জানান, চাকমারা নতুন বছরকে বিজু উৎসব হিসেবে পালন করে। তারাও চৈত্রের শেষ দিনের আগের দিন ফুল বিজু পালন করে। এই দিন তারা ফুল সংগ্রহ করে। নারী-পুরুষ-শিশুরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নিকটস্থ খাল-বিল-নদী ও লেকে ফুল ভাসায়। পুরাতন বছরের দুঃখ মুছে নতুন বছরে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি কামনা করে। বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিন তারা মূল বিজু পালন করে। সেদিন কমপক্ষে সাত এবং সর্বোচ্চ শতাধিক ধরনের শাকসবজি রান্না করে পাজন তৈরি করে। তা দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করে। শেষ দিন তথা নতুন বছরের প্রথম দিন চাকমারা ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খাবার ও পানীয় গ্রহণের মাধ্যমে গোজ্যে-পোজ্যে বা আরাম আয়েশ করেন।

বৈসাবি শব্দের উৎপত্তি ও ব্যবহার——
বৈসু বা বৈসুক, সাংগ্রাই বা বিজু শব্দগুলো স্ব-স্ব জাতিগোষ্ঠীর সূচনাকাল থেকেই ব্যবহার করে আসলেও বৈসাবি শব্দটির সূচনা ঠিক কবে কিংবা এর ব্যবহার ঠিক কখন শুরু হয়েছে; এ নিয়ে কিছুটা মতবিভেদ রয়েছে। বৈসাবি শব্দটির প্রকৃত ইতিহাস জানা না গেলেও ধারণা করা হচ্ছে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পরে যখন খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি-বান্দরবান নামে তিনটি পার্বত্য জেলা ঘোষণা করা হয়েছে, তার পর থেকেই সব জাতিগোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্নভাবে নববর্ষকে উদযাপনের পাশাপাশি বৈশাখের প্রথম দিনটি উদযাপন একসঙ্গে করার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বৈসাবি শব্দটির প্রচলন শুরু করেছিল।

 


আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে উৎসব অর্থে বৈসাবি শব্দটি ধীরে ধীরে পরিচিতি লাভ করেছে

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বৈসাবি শব্দটি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ১৯৯০ সালের শুরুর দিক থেকে ব্যবহার করে আসছে। অনেকের ভাষ্যমতে, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে রাঙামাটি কলেজের ছাত্ররা সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং প্রশাসনিক দমন-পীড়নের প্রতিবাদের জন্য একত্রিত হয়ে সর্বপ্রথম শব্দটি ব্যবহার করেন। আবার অনেকের মতে, তিন পার্বত্য জেলার কার্যক্রম পৃথকভাবে চালুর পর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ পালন একত্রিতভাবে করার জন্য এই শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।

খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি তরুন কুমার ভট্টাচার্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নতুন করে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি-বান্দরবানের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা চিন্তা করেন; পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি সম্প্রদায়ের লোকজন পৃথক পৃথক চিন্তাভাবনা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ধর্মীয় রীতিনীতির আলোকে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করলে নিজেদের মধ্যে ঐক্য অর্জিত হবে না। উন্নয়ন হবে না, ভাতৃত্ববোধ গড়ে উঠবে না। কী করা যায় এমন চিন্তাভাবনা থেকে ত্রিপুরাদের বৈসু বা বৈসুক শব্দের আদ্যক্ষর হতে বৈ, মারমাদের সাংগ্রাই শব্দের আদ্যক্ষর হতে সা এবং চাকমাদের বিঝু শব্দের আদ্যক্ষর বি নিয়ে সম্মিলিতভাবে পাহাড়ের সার্বজনীন নববর্ষের উদযাপনের জন্য অনুষ্ঠানের নামকরণ করা হয় বৈসাবি। এটি এখন পাহাড়িদের প্রাণের স্পন্দন। প্রতি বছর সম্মিলিতভাবে মিলনের সুতো। এক পতাকার নিচে দাঁড়ানোর নতুন রূপরেখা।’

তরুন কুমার ভট্টাচার্য আরও বলেন, ‘১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার পাহাড়ের প্রতিনিধিত্বকারী জনসংহতি সমিতির সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করার পর থেকে স্ব স্ব পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর মাধ্যমে বৈসাবি ব্যানারে স্ব-স্ব জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ পালনের অনুষ্ঠানাদি পালিত হয়ে আসছে। জেলা পরিষদগুলোর পাশাপাশি সেনা রিজিয়ন, সেনা জোন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, চাকমা-মারমা ও ত্রিপুরাদের প্রতিনিধিত্বকারী সামাজিক ও সাংষ্কৃতিক সংগঠনগুলো এবং বর্ষবরণ করার জন্য নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে। এখন আর পাহাড়িরা পৃথক চিন্তাভাবনা করে না। পাহাড়বাসীর স্বপ্ন একতা-সংহতি ও অগ্রগতি।’

বৈসাবি পালনকাল—–
মূলত চেত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখ মাসের প্রথম দিন পাহাড়ের সব জাতিগোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্নভাবে তথা নিজেদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী নাচগান, খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পাহাড়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক অনুষ্ঠান উদযাপন করলেও বৈশাখ মাসের প্রথম দিন পাহাড়বাসী সবাই মিলে বৈসাবি পালন করে থাকে। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনা রিজিয়ন, সেনা জোন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, চাকমা-মারমা-ত্রিপুরাদের প্রতিনিধিত্বকারী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পুরো দিনব্যাপী র‌্যালি, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতাসহ নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে। এই একটি দিনে পাহাড়িরা এক সুতোয় তাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মালা গাঁথে, পুরাতন বছরকে বিদায় দেয় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানান। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই উৎসবের ব্যাপ্তি বাড়ানো হয়েছে। পুরাতন বছরের শেষ সপ্তাহ এবং নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহ মিলে প্রায় ১৫ দিন ধরে পালিত হয় বৈসাবি উৎসব।

আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে চলতি বছরের বৈসাবি শুরু—–
মঙ্গলবার খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত বর্নাঢ্য র‌্যালির মাধ্যমে শুরু হয়েছে চলতি বছরের বৈসাবি অনুষ্ঠান। এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা। র‌্যালিতে জেলা পুলিশ, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

 

তবে বেশ কিছু বছর ধরে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ে বৈসাবি শব্দটি নিয়ে বিতর্ক চলছে

কী কী হয় বৈসাবিতে—–
ড. সুধীন কুমার চাকমা, কংজরী চৌধুরী ও প্রভাংশ ত্রিপুরা জানান, বৈসাবিতে নানা কর্মসূচি পালিত হয়। এর মধ্যে নদীতে ফুল ভাসানো, ঘরবাড়ি, মন্দির-বিহার-গির্জা ফুল দিয়ে সাজানো ও প্রার্থনা করা, চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলা ঘিলা, নাদ্যাদ্যা, হাডুডু, কুস্তি, বলি খেলা, বাঁশ খেলা, ঘিলা হারা, নাদেং হারা ও গুদু হারা, মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলা, আলারি, ঘিলা, জলকেলি, রশি টানাটানি, ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী খেলা কালদং বা কাদং, গেলা চ্যাট, লেবাং বুমানি, কুস্তি ও দড়ি টানাটানির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নাচগান উল্লেখযোগ্য।

বৈসাবি আনন্দ উপভোগকারী—–
তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ি-বাঙালি সবাই বৈসাবি উৎসব উপভোগ করেন। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য জেলার লোকজনও উৎসব উপভোগ করতে পাহাড়ে আসেন। দেশের বাইরে অবস্থান করা বিভিন্ন পাহাড়ি সম্প্রদায়ের লোকজন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে দেশে ফিরে আসেন। বেশিরভাগ সময় দেশের ভেতরের পাশাপাশি দেশের বাইরে থেকেও অনেক বিদেশি পর্যটক উৎসব উপভোগ করতে আসেন।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা—-
জেলার পুলিশ সুপার মোরতজা আলী সরকার বলেন, ‘খাগড়াছড়ি জেলায় পুলিশ তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রেখেছে। এ ছাড়া অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। পুরো জেলার প্রায় সব সম্প্রদায়ের নেতাদের নিয়ে বসে তাদের পরিকল্পনা মাফিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আশা করছি, শান্তিপূর্ণভাবেই উদযাপিত হবে পাহাড়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান বৈসাবি।’বাংলা ট্রিবিউন

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions