
ডেস্ক রির্পোট:- বগুড়ার পোড়াদহ মেলা প্রাচীন লোকজ উৎসব। এটি ঐতিহ্যবাহী ‘জামাই মেলা’ হিসেবেও পরিচিত। শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের পোড়াদহ এলাকায় ইছামতী নদীর তীরে বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বুধবার দিনব্যাপী মেলা বসে। এই মেলা ঘিরে অন্তত ১০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। এর মধ্যে কয়েক কোটি টাকার শুধু মাছই বিক্রি হয়।
‘বউ মেলা’
জামাই মেলা একদিনের হলেও এর রেশ থাকে সপ্তাহজুড়ে। পরদিন সকালে মেলা চত্বরে ‘বউ মেলা’ বসে। রেশমি চুড়ি, আলতা, চিরুনি, হাঁড়ি-পাতিল, খুন্তি-কড়াই, পানের বাটা, খেলনা, মিষ্টান্ন—কী নেই এখানে। হরেক রকম পণ্যের পসরা থাকে মেলা চত্বরে। ক্রেতা-দর্শনার্থীদের সবাই নারী। শিশুরা থাকলেও নারীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। দোকানদার ছাড়া সেখানে কোনও পুরুষ সদস্যের প্রবেশের অনুমতি নেই। এভাবে নারীদের বেশি অংশগ্রহণের কারণে এর নামকরণ হয়েছে ‘বউ মেলা’।
ইছামতী নদীর তীরের পশ্চিম মহিষাবান ত্রিমোহিনী এলাকায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে বসছে বউ মেলা। দিনব্যাপী মেলায় ঘুরে নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে বিভিন্ন ধরনের পণ্য কিনে থাকেন। এখানে নারীদের ঢল নামে।
জামাই মেলা একদিনের হলেও এর রেশ থাকে সপ্তাহজুড়ে, পরদিন সকালে মেলা চত্বরে ‘বউ মেলা’ বসে
তবে জামাই মেলা ঘিরে আশপাশের কয়েক গ্রামের বাড়িতে মেয়ে, জামাই, নাতি-নাতনি ও স্বজনদের দাওয়াত করা হয়। ঈদে দাওয়াত না করলেও মেলার সময় দাওয়াত দেওয়া রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তাই অনেকে এটিকে জামাই মেলা বলেন। জামাইরা মেলা থেকে বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়িতে যান। ওই মাছ রান্না করে আত্মীয়-স্বজনকে আপ্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি নানা পিঠা বানিয়ে খেতে দেওয়া হয়। মেলা থেকে মাছ কিনে শ্বশুরবাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে যাওয়ার চল আছে গাবতলী, সারিয়াকান্দি, ধুনটসহ এই অঞ্চলে।
মেলার আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, ইছামতী নদীর অদূরে বিস্তীর্ণ মাঠে বসে সারি সারি দোকান। বড় বড় মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। ভোরের আলো ফুটতেই দোকানে দোকানে মানুষের ঢল নামে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সরগরম থাকে গোটা এলাকা। প্রতি বছর পোড়াদহ মেলায় এ দৃশ্য দেখা যায়।
মেলায় মাছ ছাড়াও হরেক পদের মিষ্টান্ন, খেলনা, কাঠের আসবাব, প্রসাধনীর দোকান ছাড়াও চরকি, নাগরদোলা, মৃত্যুকূপে মোটরসাইকেল খেলা ও সার্কাসসহ নানা আনন্দ করা হয়। ঐতিহ্যবাহী এ মেলা সব ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও মতের মানুষের এক মহামিলন কেন্দ্র। কাজের ব্যস্ততায় আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এ অঞ্চলের লাখো মানুষ বছরে অন্তত একটিবারের জন্য হলেও একত্র হন মেলা ঘিরে। মেলার কয়েক দিন আগে থেকেই শতাধিক গ্রামে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ।

মেলা ঘিরে বড় মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা
কবে থেকে শুরু
পোড়াদহ মেলা শুরুর সঠিক সাল কেউ বলতে পারছেন না। তবে স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, মেলা শুরুর সঠিক দিনক্ষণ জানা যায় না। ধারণা করা হয়, অন্তত ৪০০ বছর আগে থেকে এই মেলা চলে আসছে।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৪০০ বছর আগে পোড়াদহ সংলগ্ন মরা বাঙ্গালী নদীতে প্রতি বছর মাঘের শেষ বুধবার অলৌকিকভাবে বড় একটি কাতলা মাছ সোনার চালুনি পিঠে নিয়ে ভেসে উঠতো। মাঘের শেষ বুধবার এ অলৌকিক ঘটনা দেখার জন্য অনেক মানুষ জড়ো হতো। পরে স্থানীয় একজন সন্ন্যাসী স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে অলৌকিক এ মাছের উদ্দেশে অর্ঘ্য নিবেদনের জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেন। সন্ন্যাসীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পোড়াদহ বটতলায় মাঘের শেষ বুধবার অলৌকিক মাছের উদ্দেশে স্থানীয় লোকজন অর্ঘ্য নিবেদন শুরু করেন। এটি সন্ন্যাসীপূজা নাম নেয়। ইছামতীর তীরে এখনও সন্ন্যাসীপূজা হয়। পূজা উপলক্ষে লোকসমাগম বাড়তে থাকে ও বড় বড় মাছ বেচাকেনার জন্য মেলাটি প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। কালক্রমে এটি পরিচিতি পায় পোড়াদহের মেলা হিসেবে। ইছামতী, করতোয়া, যমুনা ও বাঙ্গালী নদীতে ধরা বাহারি মাছ বিক্রির জন্য মেলায় নেন জেলেরা। দূরদূরান্ত থেকে ভিড় করেন ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা। বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বুধবার ইছামতীর তীরে পোড়াদহ মেলা বসে। একদিনের মেলা হলেও আবহ থাকে কয়েকদিন।
সন্ন্যাসী থেকে জামাই মেলায় রূপান্তর
সন্ন্যাসীপূজা ঘিরে মেলা শুরু হয়েছিল বলেই প্রথমে নাম দেওয়া হয়েছিল সন্ন্যাসী মেলা। স্থানটি পোড়াদহ এলাকায় হওয়ায় পরে ‘পোড়াদহ মেলা’ নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তী সময়ে মেলা ঘিরে আশপাশের কয়েক গ্রামের বাড়িতে মেয়ে, মেয়ের জামাই, নাতি-নাতনি ও স্বজনদের দাওয়াত দেওয়ার রীতি শুরু হয়। একসময় এটি রেওয়াজে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে পোড়াদহ মেলাকে ‘জামাই মেলা’ বলা শুরু করেন স্থানীয় লোকজন।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সরগরম থাকে গোটা এলাকা
পাশাপাশি তিন দশকের বেশি সময় ধরে পরদিন থেকে মেলা চত্বরে বউ মেলা বসে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, কসমেটিকস, আসবাবপত্র, আচারসহ বিভিন্ন খাবার বিক্রি হয়। এটির প্রধান বৈশিষ্ট্য ক্রেতারা নারী। এখানে পুরুষের প্রবেশাধিকারে নিষেধাজ্ঞা থাকে। তবে দোকানির কিছু অংশ পুরুষও থাকে।
প্রধান আকর্ষণ মাছ আকৃতির মিষ্টি
মেলা আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, মেলায় রকমারি মিষ্টির পসরা নিয়ে সারি সারি বসেন দোকানিরা। জামাইদের দৃষ্টি কাড়তে দোকানে দোকানে সাজিয়ে রাখা হয় মাছ আকৃতির মিষ্টি। এক কেজি থেকে ১২ কেজি পর্যন্ত মাছ আকৃতির মিষ্টি বিক্রি হয়। প্রতিটি দোকানে মাছ আকৃতির মিষ্টি ছাড়াও বাদশা ভোগ, সাজ বাদশা, কমলা ভোগ, কালোজাম, চমচম, কাটি মিষ্টি, ফলমন, ক্ষিরমন, রসগোল্লা, দুধ কলা, লাড্ডু, জিলাপি, ছানার জিলাপি, সন্দেশ, নিমকি, খই, মুড়ি, পানি তাওয়া, তিলের ও নারকেলের নাড়ু এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন সামগ্রী বিক্রি করা হয়। মেলায় আগতরা থালাভরে মিষ্টি কিনে খান ও প্যাকেট করে বাড়িতে নিয়ে যান।
এ ছাড়া আরেকটি আকর্ষণ হলো বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় মাছ। মেলার আগেই আড়তগুলোতে মাছ এনে রাখা হয়। সেখান থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা মাছগুলো কিনে মেলার নিজ নিজ দোকানে নিয়ে যান। দিনভর মাছ কেনাকাটা চলে। মেলায় আসা উল্লেখযোগ্য মাছগুলোর অন্যতম হলো- বাগাড়, রুই, কাতলা, মৃগেল বোয়াল, সিলভারকার্প, বিগহেড, গ্রাসকার্প, পাঙাশ, আইড় মাছ, কালিবাউশ ও চিতল। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় বাগাড় ও আইড় মাছ। আগে দেড় থেকে আড়াই মণ ওজনের বাগাড় মাছ পাওয়া যেতো। পরবর্তীতে ২০২২ সালে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে ‘মহাবিপন্ন’ প্রজাতি হিসেবে বাগাড় মাছ প্রকাশ্যে বিক্রি করা হয় না। তবে মেলায় আনা মাছগুলো ১৫ থেকে ২৫ কেজির ওজনের হয়ে থাকে। এজন্য এটিকে মাছের মেলাও বলা হয়।

প্রধান আকর্ষণ মাছ আকৃতির মিষ্টি
মেলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও বিক্রি হয়। চাকু, বঁটি, কুড়াল, দা এবং বিভিন্ন ধরনের মশলা বিক্রি হয়। কাঠের জিনিসপত্র, স্টিল ও লোহার বিভিন্ন সাইজ ও ডিজাইনের আসবাবপত্র কেনাবেচা হয়। পাশাপাশি কসমেটিকস, খেলনা, গিফট সামগ্রীর দোকানও বসে। এসব দোকানে নারী ও শিশুদের ভিড় থাকে। চুড়ি, ফিতা, দুল, ক্লিপ, মালা, কাজল, মেকআপবক্স ছাড়াও প্রসাধনী পাওয়া যায়। শিশুদের খেলনার মধ্যে ক্রিকেট ব্যাট, র্যাকেট, ফুটবল, টেনিস বল ও ভিডিও গেমসও বিক্রি হয়।
খাবার ও বিনোদনের আয়োজন
মেলায় আগতদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে। অসংখ্য অস্থায়ী হোটেল, ফুচকা, চটপটি, বিভিন্ন ধরনের ভাজাপোড়া, হরেক রকম আচার ও আইসক্রিম পাওয়া যায়। প্রখর রোদের মধ্যে কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকার পর একটু বিনোদনের জন্য নানা আয়োজন থাকে। ছোটদের জন্য নাগরদোলা, মিনি ট্রেন, ঘোড়ার গাড়ি, সার্কাস, মোটরসাইকেল খেলা, যাত্রাপালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
মেলা পরিচালনা করছে যারা
গাবতলীর মহিষাবান গ্রামের মন্ডল পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মেলাটি পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি ও মহিষাবান ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ মন্ডল। তিনি বলেন, ‘পোড়াদহ বা সন্ন্যাসী মেলা কবে শুরু হয়েছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে অন্তত ৪০০ বছর ধরে চলছে। বাপ-দাদার কাছ থেকে আমরা এমনটি শুনে আসছি।’

মেলায় রকমারি মিষ্টির পসরা নিয়ে সারি সারি বসেন দোকানিরা
আবদুল মজিদ মন্ডল বলেন, ‘মেলার জনপ্রিয়তা এখনও আগের মতোই আছে। শুধু গাবতলী উপজেলা নয়; আশপাশের বিভিন্ন এলাকা এবং দেশের অন্যান্য এলাকার লোকজন কেনাকাটা করতে আসেন। মেলা একদিনের হলেও এর রেশ থাকে অন্তত সাত-আট দিন। পরদিন বসে বউ মেলা। নারীদের নির্বিঘ্নে কেনাকাটার জন্য মেলায় পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে মেলায়। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসন সহযোগিতা করে থাকে। অন্তত ৫০০ দোকান বসে। বউমেলায় একদিনে পাঁচ কোটি টাকার কেনাবেচা হয়। মাছ ও বউমেলার পুরো আয়োজনে অন্তত ১০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। এর মধ্যে কয়েক কোটি টাকার মাছই বিক্রি হয়।’
মেলার আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর গত ১১ ফেব্রুয়ারি মেলার দিন ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু পরদিন ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় এ বছর পোড়াদহ মেলার আয়োজন করা হয়নি। বাংলা ট্রিবিউন