বিএনপি কেন এক টার্মের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারে না

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪৬ দেখা হয়েছে

আবু জুবায়ের:- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কৌতূহলোদ্দীপক এবং জটিল অধ্যায় হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক পরিক্রমা। দলটির বিশাল জনসমর্থন এবং আপামর জনসাধারণের মধ্যে তাদের ভোটের রাজনীতি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই ও তীব্র গণআন্দোলনের পর ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ক্ষমতায় আরোহণের এই আনন্দঘন মুহূর্তেই একটি মৌলিক প্রশ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজতাত্ত্বিকদের ভাবিয়ে তুলছে- কেন এই বিপুল জনভিত্তি থাকা সত্ত্বেও দলটি ঐতিহাসিকভাবে এক মেয়াদের বেশি ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল নির্বাচনী রাজনীতির হিসাব মেলালে চলবে না, বরং দলটির আদর্শিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংগঠনিক কাঠামোর গভীরে দৃষ্টিপাত করতে হবে।রাজনৈতিক সংবাদ বিশ্লেষণ

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর দলটির নীতিনির্ধারকদের প্রথম এবং প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত যে, এই ভূমিধস বিজয় বা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানেই যা খুশি তা করার অধিকার বা ম্যান্ডেট পেয়ে যাওয়া নয়। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তাদের গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি যে, বিগত সরকারের মতো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটালে জাতি আবারও এক ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুলসংখ্যক অধ্যাদেশের (যার মধ্যে ১৩৩টি অধ্যাদেশের যৌক্তিক সুরাহার বিষয়টি চলমান) একটি টেকসই ও গণতান্ত্রিক সমাধান তাদের বের করতে হবে। নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ চার বছর নাকি পাঁচ বছর হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে কথা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে বিএনপি পাঁচ বছরের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে; তাদের যুক্তি হলো- স্বল্প সময়ে নির্বাচন দিলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়ে। কিন্তু এই দাবিকে জনগণের কাছে যৌক্তিক প্রমাণ করতে হলে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করার মতো কাঠামোগত সংস্কারগুলোতে তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলগুলোর সাথে একটি কার্যকর ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারলে ক্ষমতার অন্ধ অহমিকা তাদের দ্রুতই জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে।

বিএনপির দীর্ঘস্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারার পেছনে অন্যতম প্রধান একটি কারণ হলো তাদের মতাদর্শিক স্থবিরতা। বিএনপির রাজনীতির মূল ভিত্তি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’, যা সময়ের সাথে সাথে নিজেকে আধুনিকীকরণ করতে পারেনি। বর্তমান বিশ্বায়ন এবং বহু সংস্কৃতির যুগে একটি রাষ্ট্রকে কেবল পরিচয়ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দিয়ে ঐক্যবদ্ধ রাখা কঠিন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বিভক্তি দূর করে একটি প্রগতিশীল সমাজ গড়তে ‘নাগরিক জাতীয়তাবাদ’ বা সিভিক ন্যাশনালিজম-এর দিকে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন, যা নাগরিকত্বের সাম্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। কিন্তু বিএনপি তাদের দলীয় দর্শনকে এই আধুনিক নাগরিক জাতীয়তাবাদের সমান্তরালে বিকশিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে তাদের রাজনৈতিক আখ্যান প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে আটকে থাকে এবং বৃহত্তর উদারনৈতিক জনগোষ্ঠীর কাছে আবেদন হারায়।

সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ‘হেজেমনি’ বা আধিপত্য নির্মাণে ঐতিহাসিক ব্যর্থতা দলটির জন্য এক অশনিসংকেত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রাচীন বাংলার পুণ্ড্রবর্ধন থেকে শুরু করে চর্যাপদের সাংগীতিক ঐতিহ্য এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের লোকজ সাংস্কৃতিক ভিত্তির সাথে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শনকে একীভূত করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এবং ১৯৭৮ সালে জাসাস প্রতিষ্ঠা করে যে সাংস্কৃতিক জাগরণের বীজ বপন করেছিলেন, পরবর্তী নেতৃত্ব তা ধরে রাখতে পারেনি। দলটির সাংস্কৃতিক বলয় জাসাস বর্তমানে কেবল দলীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া এবং গুটিকয়েক আলোচনা সভার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। জাতীয় মনন গঠনে, বুদ্ধিবৃত্তিক সাহিত্য রচনায় বা প্রগতিশীল শিল্পী, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের সাথে মেলবন্ধন তৈরিতে দলটির চরম অনীহা সমাজে তাদের একটি বিশাল সাংস্কৃতিক শূন্যতার মধ্যে ফেলে রেখেছে।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি সফল ও দূরদর্শী রাজনৈতিক দলের প্রাণভোমরা হলো তার নিজস্ব গবেষণা সেল বা থিংক ট্যাংক। কিন্তু প্রতিষ্ঠার চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিএনপির নিজস্ব কোনো কাঠামোগত থিংক ট্যাংক গড়ে ওঠেনি। দলটি ঐতিহাসিকভাবেই বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গাগুলোতে ‘আউটসোর্সিং’-এর ওপর নির্ভরশীল। দলের মূল কাঠামোর বাইরে থাকা কতিপয় পেশাজীবী বা ‘জি-নাইন’-এর মতো সংগঠনের ওপর তারা দীর্ঘমেয়াদি নীতি নির্ধারণের জন্য নির্ভর করে, যাদের দলের শেকড় বা তৃণমূলের প্রতি কোনো প্রত্যক্ষ কাঠামোগত দায়বদ্ধতা নেই। এই প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের কারণে ক্ষমতায় গেলে তারা অতিমাত্রায় আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ২০১৫ সালের দিকে ১৬টি উপভাগ নিয়ে একটি থিংক ট্যাংক গড়ার খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি হলেও তা আজও আলোর মুখ দেখেনি ।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার সরাসরি প্রভাব পড়ে তাদের ভূ-রাজনৈতিক পাঠের ক্ষেত্রে। লম্বা সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়গুলোতে পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ বুঝতে তারা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্ব-দরবারে ভারতের ভূমিকা, ভারত-চীনের মধ্যে দ্রুত বর্ধনশীল বাণিজ্য এবং এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারতের ওপর কৌশলগত নির্ভরশীলতার সমীকরণগুলো অনুধাবন করতে দলটির নীতিনির্ধারকরা বারবার ভুল করেছেন। আগাম পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ‘প্রোঅ্যাকটিভ’ নীতি গ্রহণের বদলে তারা সবসময় ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন।

তথ্যপ্রবাহের এই আধুনিক যুগে ক্ষমতার স্থায়িত্ব অনেকটাই নির্ভর করে শক্তিশালী মিডিয়া ইকোসিস্টেমের ওপর। বিএনপি যখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা এমন কোনো টেকসই ও স্বাধীন মিডিয়া অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি, যা ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও চরম বৈরিতার মাঝে তাদের রাজনৈতিক আখ্যানকে জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারে। ফলে ক্ষমতার বাইরে যাওয়ার পর ‘দৈনিক দিনকাল’ বা ‘আমার দেশ’-এর মতো তাদের আদর্শিক পত্রিকাগুলো আইনি মারপ্যাঁচে সহজেই স্তব্ধ করে দেয়া সম্ভব হয়েছে। প্রকাশনা আইন লঙ্ঘনের ঠুনকো অভিযোগে দিনকালের মতো ব্রডশিট বন্ধ হয়ে যাওয়া তাদের মিডিয়া শূন্যতার এক করুণ দৃষ্টান্ত। সাম্প্রতিক সময়ে তারা একটি ‘মিডিয়া সেল’ গঠন করে ডিজিটাল স্পেসে নিজেদের অবস্থান কিছুটা সুদৃঢ় করার চেষ্টা করেছে এবং শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সাথে মতবিনিময় করে ‘ক্রিটিক্যাল জার্নালিজম’-এর চর্চা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শক্তিশালী গণমাধ্যম বলয় তৈরিতে তারা এখনো যোজন যোজন পিছিয়ে।

তবে সবচেয়ে আত্মঘাতী যে বিষয়টি দলের সাংগঠনিক ভিত্তিকে বারবার ভেতর থেকে ফোকলা করেছে, তা হলো দলের প্রাণভোমরা তৃণমূল কর্মীদের চরম অবমূল্যায়ন। যারা রাজপথে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করেছেন, জীবনের সোনালি সময়গুলো কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন এবং শত শত রাজনৈতিক মামলার আসামি হয়েছেন, দল ক্ষমতায় গেলে বা পুনর্গঠনের সময় তাদের সরিয়ে অপেক্ষাকৃত গুরুত্বহীন পদে বসানোর এক অদ্ভুত ও নির্মম প্রবণতা দলটিতে বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, বিগত দিনগুলোতে যে নেতার বিরুদ্ধে ৩৫৭টি মামলা হয়েছে এবং জীবনের প্রায় ছয়টি বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, কিংবা যার বিরুদ্ধে ১৪৭টি মামলা রয়েছে, তাদেরকে দলের মূল নির্বাহী পদ থেকে সরিয়ে স্রেফ ‘উপদেষ্টা’ বানিয়ে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া হয়েছে। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় প্রধানকে পরামর্শ দেয়া ছাড়া উপদেষ্টাদের সাংগঠনিক কোনো ক্ষমতাই নেই। এর বিপরীতে সুবিধাবাদী, নব্য অনুপ্রবেশকারী এবং নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের অনুসারীদের আধিপত্য দলের স্বাভাবিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেয়। তৃণমূলের ক্ষোভের একটি বড় কারণ হলো, জেলা সম্মেলনগুলোতে পতিত স্বৈরাচারী সরকারের সুবিধাভোগী এবং ভিন্ন মতাদর্শের শ্রমিক লীগ বা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাদের ডেলিগেট হিসেবে অনুপ্রবেশ করার সুযোগ দেওয়া। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে মাঠ পর্যায়ে নজরদারির কতটা অভাব রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ওয়ার্ড কমিটির নেতারা গড়ে ২০ থেকে ২৫টি মামলার ঘানি টেনে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। ত্যাগী নেতাদের এই অবমূল্যায়ন দলের মূল চালিকা শক্তিকে হতাশ করে তোলে, যা যেকোনো রাজনৈতিক সংকটে দলের পতনকে ত্বরান্বিত করে।

পরিশেষে এটি বলা অত্যুক্তি হবে না যে, কেবল ব্যালট বাক্সের উন্মাদনা বা নির্বাচনী বিজয় কোনো রাজনৈতিক দলের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার নিশ্চয়তা দেয় না। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জনগণের কাছ থেকে প্রাপ্ত এই বিশাল ম্যান্ডেটকে যদি বিএনপি একটি টেকসই ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় রূপ দিতে চায়, তবে তাদের নীতি-নির্ধারণী ‘আউটসোর্সিং’ বন্ধ করে নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে ‘নাগরিক জাতীয়তাবাদ’-এর পথে হাঁটতে হবে। সংস্কৃতির ময়দানে উদার বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি, তৃণমূলের পরীক্ষিত কর্মীদের ঘাম ও রক্তের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে, বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও ‘এক মেয়াদের অভিশাপ’ তাদের পিছু ছাড়বে না। মানবজমিন
লেখক : কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions