
শামসুল আলম,রাঙ্গামাটি:- রাঙ্গামাটির সদর খাদ্যগুদামকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ সামনে এসেছে। নিম্নমানের চাল বিতরণ, অবৈধভাবে খাদ্যশস্য মজুদ, তথ্য গোপনসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগের পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট গুদাম কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের মাঝেই কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই তাকে তড়িঘড়ি স্ট্যান্ড রিলিজ (অব্যাহতি) দেওয়ায় নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগের শুরু থেকেই বিতর্ক
রাঙ্গামাটি সদর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে প্রায় এক বছর আগে দায়িত্ব নেন তারেকুল আলম। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ জমা হতে থাকে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রমে নিম্নমানের চাল সরবরাহ করা হয়, নিয়মবহির্ভূতভাবে পুষ্টি চাল মজুদ ও বিতরণ করা হয় এবং গুদাম ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি দেখা দেয়। এছাড়া দায়িত্বকালীন সময়ে একাধিকবার অফিসে অনুপস্থিত থাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।


নিম্নমানের চাল নিয়ে জনঅসন্তোষ
গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ওএমএস চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নিম্নমানের চাল পাওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অনেক ভোক্তা চাল নিতে অস্বীকৃতি জানান, আবার কেউ কেউ ক্রয়কৃত চাল ফেরত দেন।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে পৌর এলাকার ১২ জন ডিলার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
পরিদর্শনে অনিয়মের প্রমাণ
অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ৮ জানুয়ারি জেলা খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে গুদাম পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট গুদাম কর্মকর্তাকে বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত পাওয়া যায়।
গুদামের মজুদ যাচাইয়ে প্রায় ৬২ মেট্রিক টন চালের সঙ্গে ভিন্নজাতীয় পণ্যের মিশ্রণ পাওয়া যায়। পাশাপাশি পরীক্ষাগারে চাল পরীক্ষা করে পুষ্টি চালের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়, যা খাদ্য অধিদপ্তরের বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) সেলিম মাহমুদ সাগর।

প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, বিভাগীয় ব্যবস্থার সুপারিশ পাঠানোর তিন দিনের মাথায় সংশ্লিষ্ট গুদাম কর্মকর্তা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে লাঞ্ছিত করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন।
এ ঘটনায় পরদিন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক।
অভিযুক্ত কর্মকর্তার দাবি
তবে তারেকুল আলম তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, পুষ্টি চাল মজুদ বা বিতরণের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি।
অবৈধ মজুদ নিয়ে নতুন বিতর্ক
সবশেষ গত ২ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২০০ মেট্রিক টনের বেশি খাদ্যশস্য অবৈধভাবে মজুদের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে জনমনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ওই দিনই কোনো ধরনের তদন্ত বা অভিযান পরিচালনা না করেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়।

হিসাব জালিয়াতির অভিযোগ
একই দিনে গুদামের হিসাব বইতে তড়িঘড়ি করে ৩৬৪ মেট্রিক টন খাদ্যশস্যের প্রাপ্তি ও বিতরণের হিসাব দেখানো হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা।
প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী—
সিদ্ধ চাল: ৬২৩ থেকে ৬১৭ মেট্রিক টন
আতপ চাল: ১৩২০ + ৩০০ হয়ে ১৫৭৫ মেট্রিক টন
গম: ১৩৮ + ১৪ হয়ে ১৫২ মেট্রিক টন
খালি বস্তা: ৯৩৭৮টি
এতে করে হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।


স্থানীয়দের প্রশ্ন ও দাবি
স্থানীয়দের প্রশ্ন—এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তদন্ত ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া হলো? এতে কি প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে?
তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও যদি তা স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া হয়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ফলে জনআস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।