কী চায় নতুন প্রজন্ম

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৮ দেখা হয়েছে

ফাইজুস সালেহীন:- জেন-জি (Gen-Z) টার্মটি বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের আগে খুব বেশি শোনা যেত না। সেটা ছিল ডিজিটালাইজেশনের যুগ। তখনো জেন-জিরা ছিল। তবে তখনো তারা ভালো করে গোঁফে তা দিতে শেখেনি। যদিও অনেকের ওষ্ঠাধারে গোঁফের কালো রেখা উঁকি দিয়েছিল। কেউ কেউ বিয়ে থা করে বাচ্চাকাচ্চার বাপও হয়ে গিয়েছিল। তাদের কেউ কেউ বাল্যবিবাহের দোষে দুষ্ট হয়ে থাকতে পারেন। আগের জেনারেশনের কাছ থেকে গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা ইত্যাদি মাদক সেবনও রপ্ত করেছেন হয়তো অনেকে। ইঁচড়ে পেকেছে কোনো কোনো জেন-জি। ‘শাওয়্যা’ ভাষায় স্লোগান দেওয়া বালকবালিকারা এবং রংবাজ কিশোর গ্যাংগুলো তো সেই সাক্ষ্যই দেয়। যে কিশোর সদলবলে থানায় গিয়ে অফিসারের সামনে টেবিল চাপড়ে বলেছিল, আমরা থানা জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম, অমুক পুলিশ অফিসারকে জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম, সে-ও ইঁচড়ে পাকা কাঁঠালকুঁড়ি বৈ তো নয়। অকালে পেকে গেলে যে আর পরিপুষ্ট কাঁঠাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না, সে সবাই জানে। এই জেন-জিদের অনেকে আবার টিকটক করে, অনলাইনে বিজনেস জমিয়ে কামাই রোজগার ভালোই করতে শিখেছে।

কী চায় নতুন প্রজন্মদোষেগুণে যেমন মানুষ তেমনই একটি জেনারেশনও। আগের জেনারেশন মিলেনিয়ান, এক্স, ওয়াই, বেবিবুমার কিংবা সাইলেন্ট জেনারেশন কোনোটিই একেবারে নিষ্কলুষ বা গুণেভরা নয়। আমরা যারা ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে জন্মেছি তারা নাকি বেবিবুমার জেনারেশন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকার অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করেছিল। সেই সময়টায় মানুষ অধিকারসচেতন হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা লাভ করতে শুরু করে পরাধীন দেশগুলো। এই জেনারেশন পরিশ্রমী, উদ্যমী ও চিন্তাশীল। এরা বিশ্বাস করে সিম্পল লিভিং অ্যান্ড হাই থিংকিং দর্শনে। এদের তথ্যপ্রবাহের বাহন ছিল রেডিও-টেলিভিশন, টেলিফোন-টেলিপ্রিন্টার ও সংবাদপত্র। এদের বয়স এখন কমপক্ষে ৬২ এবং সর্বোচ্চ ৮০। এদের ব্র্যান্ডিং করে বিভ্রান্ত করা অত সহজ নয়। না বিদেশে, না দেশে। কিছু সময়ের জন্য ভ্রান্তির বেড়াজালে আটকা পড়লেও অচিরেই সেই বিভ্রম কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে এই বুমার প্রজন্ম। অনুরূপ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী আগের সাইলেন্ট জেনারেশন (যাদের জন্ম ১৯২৮-১৯৬৩) এবং পরের এক্স (১৯৬৪-১৯৮০) জেনারেশন। সেজন্যই ’৪৭-এর ভুলের সংশোধনের জন্য তারা একযোগে জেগে উঠেছিলেন ১৯৪৮ সালেই। ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত করেন তারা সে বছরই। আইউব খানের ধোঁকায় পড়ে মৌলিক গণতন্ত্রের বড়ি গিলে ’৬৯ সালে এসে গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তা উগরে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু তারা নিজেদের গায়ে কোনো জেনারেশনের মার্কা সেঁটে দেননি। কে কোন জেনারেশন, কী নাম তার জেনারেশনের, সেই চিন্তা তাদের মাথায় আসেনি। তারা কেবল জানতেন সব মানুষের রক্তের রং লাল, অধিকার ও স্বাধীনতার স্বাদও একই রকম। তারা নিজেদের ব্র্যান্ডিং করেননি। ব্র্যান্ডিং বা মার্কার দিয়ে চিহ্নিত করার ধারণা হাইলি কমার্শিয়াল। অতীতের রাজনীতি, আর যা-ই হোক কমার্শিয়াল ছিল না। বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রোডাক্টের বাণিজ্যিক পসারের লক্ষ্যে ব্র্যান্ডিং করার দায়িত্ব পালন করে অ্যাডভারটাইজিং ফার্মগুলো। কনসালটেন্টরাও এই কাজ করে থাকেন পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে। অতীতে সমাজচিন্তা বা রাজনীতি-কোনোটাই বাণিজ্যিক ছিল না। কাজেই ব্র্যান্ডিংয়ের চিন্তা কারও মাথায় আসেনি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্র্যান্ডিংয়ের ধারণাটি এসেছে সম্ভবত এনজিও-ওয়ালাদের মাথা থেকে। আর এই চিন্তাটিকে কার্যে পরিণত করে এনসিপি নামক নবীন দলটি। দল গঠনের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা থাকা অবস্থায়ই তারা জেন-জি টার্মটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ড. ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা হয়ে জেন-জির জন্য টেলিটকের একটা আলাদা প্যাকেজও চালু করেছিলেন। এনসিপির নেতাদের প্রায় সবাই জি (ত) জেনারেশনের। সে হিসাবে তারা নিজেদের জি জেনারেশনের প্রতিনিধি বিবেচনা করে থাকেন। মহান জাতীয় সংসদেও একজন সোচ্চার কণ্ঠে বলেছেন যে তিনি জেন-জিদের প্রতিনিধি এবং জে-জিরা বাহাত্তরের সংবিধান চায় না। সত্যিই কি তারা তা চায় না! না! হলফ করে বলতে পারি; এই কথা মিথ্যার চেয়েও কঠিন মিথ্যা। ডাহা মিথ্যা। এনসিপি নামক দলটিও জি জেনারেশনের সবার প্রতিনিধিত্ব করে না। বড় জোর ৩ বা সোয়া ৩ শতাংশ জেন-জির প্রতিনিধিত্ব করে মাত্র। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে এনসিপি সারা দেশে কুড়িয়ে বাড়িয়ে ৩.০৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অথচ দেশে জেন-জি জনসংখ্যা ৫-৬ কোটি। শতকরা হিসাবে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ এনসিপির সঙ্গে যুক্ত। পক্ষান্তরে এই প্রজন্মের বিরাট এক অংশ জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগের মতাদর্শের অনুসারী জি প্রজন্মের সংখ্যাও বিপুল। সিপিবিসহ বিভিন্ন বাম দলের ইয়াং কমরেডের সংখ্যাও কম নয়। এনসিপি ও ছাত্রশিবিরের কর্মী-সমর্থক মিলিয়ে ৩ কি সাড়ে ৩ পার্সেন্ট জেন-জি তাদের পিতৃপার্টির প্ররোচনায় বাহাত্তরের সংবিধান ছুড়ে ফেলার পক্ষপাতী হলে হতেও পারেন। কিন্তু বাকি ৩৩ শতাংশ নবীন-নবীনা রক্ত¯œাত মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা, স্বাধীনতার দলিল বাহাত্তরের সংবিধান, সংবিধান নির্দেশিত লাল-সবুজের পতাকা ও জাতীয় সংগীতকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন। এই ভালোবাসা হৃদয়নিসৃত; সহজাত-কৃত্রিম বা লোকদেখানো নয়। বাহাত্তরের সংবিধান যারা ছুড়ে ফেলতে চান, জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় যারা বসে থাকেন, তারা শহীদ মিনারে, জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে লোকের চোখে ধুলা দিতে পারেন। কিন্তু দেশ ও দেশের সংবিধানের প্রতি তরুণ প্রজন্মের ভালোবাসায় কোনো ধুলাময়লা নেই।

জুলাই সনদের দোহাই দিয়ে যারা বাহাত্তরের সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চান তারা আসলে কী চান! অবশ্য আনকাট জুলাই সনদ, গণভোট ইত্যাদি এখন পাস্ট ট্যানস-অতীতকালের ঘটনা। সে অর্থে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যথার্থই বলেছেন ‘জুলাই সনদ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল।’ বস্তুত এই জুলাই সনদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্রেইন চাইল্ড। এই সনদের মাধ্যমে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা ইতিহাস রিসেট করতে চেয়েছিলেন। সাতচল্লিশের পরে চব্বিশ। মাঝখানে আর কোনো ইতিহাস নেই, থাকবে না। এনসিপি-জামায়াত জোটভুক্ত ১১ দলের নেতারা এই রাজনৈতিক ধারার মুখ বা মুখপাত্র। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই মিশন ইউটোপিয়া কবে থেকে শুরু হয়েছিল, তা বলা মুশকিল। তবে নব্বই দশকের শুরুতে রাজনৈতিক দল গঠনের (তাঁর নিজের ভাষায়) দিবাস্বপ্ন দেখার সময় থেকেই হয়তো মিশনটি শুরু হয়েছিল। ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময়েও তিনি তাঁর মিশন নিয়ে সক্রিয় হয়েছিলেন। তখন তিনি নাগরিক শক্তি নামে একটি পার্টি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

শেখ হাসিনা এই নোবেল লরিয়েটকে হয়তো ঠিকই চিনতে পেরেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁকে মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন স্বৈরাচারী পন্থায়। তদুপরি তিনি বিরুদ্ধ মতের প্রতি না ছিলেন সহিষ্ণু, না ছিলেন প্রিয়ভাষিণী। বস্তুত স্তাবক পরিবেষ্টিত শেখ হাসিনা তৈল স্রোতে ভাসতে ভাসতে কূল হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি দেশটাকে পৈতৃক সম্পত্তি ভাবতে শুরু করেছিলেন। জাতির জনক আর ব্যক্তি শেখ হাসিনার পিতার মধ্যকার প্রভেদরেখাটি তিনি মুছে দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া সংবিধানকে তিনি রাফখাতা বানিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। তৈলসিক্ত শেখ হাসিনা যখন অহেতুক আত্মপ্রসাদে নিমগ্ন নার্সিসিস্ট, তখন অনিবার্য পরাজয় এসে তাঁর দম্ভ উড়িয়ে দেয়। তাঁকে পালিয়ে যেতে হলো। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো; হোয়াট ইজ লটেড ক্যান নট বি ব্লটেড। অতঃপর মঞ্চে প্রবেশ করলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি যেন বা হয়ে উঠতে চাইলেন জাতির কাঁধে চেপে বসা সিন্দাবাদের বুড়ো দৈত্য। যে ছদ্মবেশী ক্ষুধার্ত বুড়োর হাঁটুতে প্রচ- শক্তি ছিল। সিন্দাবাদ সেই বুড়োকে যতবার কাঁধ থেকে নামাতে চেয়েছে ততবার বুড়ো দুই হাঁটু দিয়ে টুঁটি চেপে ধরেছে সিন্দাবাদের। অবশেষে কৌশলে নামাতে হয়েছিল সেই বুড়ো দৈত্যটিকে।

ক্ষমতা পাওয়ার পর ড. ইউনূস তাঁর মিশন বাস্তবায়নের জন্য আমেরিকা থেকে ডেকে আনেন আলী রীয়াজকে। ডেকে নিলেন চৌকশ এনজিও সংগঠকদের। রাতারাতি তাঁরা হয়ে উঠলেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ। তাঁদের কাজ হলো এমন একটি সনদ বানানো যা দিয়ে একটি অক্ষম পার্লামেন্ট গঠন করতে পারা যাবে, যে পার্লামেন্ট হবে রাবার স্ট্যাম্পেরও অধম। সেই পার্লামেন্টের চোখের সামনে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ মিথ্যা হয়ে যাবে, ২৫ মার্চের কালরাত, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়-সব ডিলিট হয়ে যাবে। পার্লামেন্ট শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে। কিন্তু সেটা হলো না। বিএনপি রুখে দিল।

মুক্তির সনদ বাহাত্তরের শাসনতন্ত্র সমুন্নত থাকুক। সময়ের প্রয়োজনে দরকারি পরিবর্তন-পরিমার্জন হবে, সেও স্বাভাবিক।

বিএনপি যে নৈতিক শক্তি দিয়ে শাসনতন্ত্রের সুরক্ষা করছে, সেই শক্তি নিয়ে সব ধরনের বিকৃতির হাত থেকে ইতিহাসকেও বাঁচাতে হবে। পুরাতন ইতিহাস মেরামত করার কাজ কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দলের নয়। তারা নিজেদের কাজের মধ্য দিয়ে নতুন ইতিহাস তৈরি করে। আর ইতিহাস নিজে বয়ে যায় আপন বেগে।
♦ লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions