
শামসুল আলম,রাঙ্গামাটি:- দীর্ঘ তিন দশকের ভোগান্তি, অনিশ্চয়তা ও সময়ক্ষয়ের অবসান ঘটাতে যাচ্ছে রাঙ্গামাটি-বান্দরবান আঞ্চলিক সড়ক। কর্ণফুলী নদীর উপর কাপ্তাই-চন্দ্রঘোনা অংশে একটি আধুনিক ক্যাবল স্টেইড সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে উত্তর ও দক্ষিণ পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে স্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই-চন্দ্রঘোনা হয়ে রাজস্থলী ও বাঙ্গালহালিয়া পেরিয়ে বান্দরবান পর্যন্ত বিস্তৃত এই আঞ্চলিক সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কৃষিপণ্য পরিবহন, স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, জরুরি চিকিৎসা সেবা—সব ক্ষেত্রেই এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষ।
তবে কর্ণফুলী নদীর উপর স্থায়ী সেতু না থাকায় কাপ্তাই-চন্দ্রঘোনা ফেরিঘাটে এসে থেমে যায় এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ। ফলে প্রতিদিনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, দীর্ঘ যানজট এবং অনিশ্চয়তা পোহাতে হয় যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের। বিশেষ করে জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সকেও ফেরির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবনঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে এই দুর্ভোগ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কর্ণফুলী নদীতে স্রোত বেড়ে গেলে কিংবা অতিবৃষ্টির কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একইসঙ্গে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধ খুলে দিলে নদীর পানির চাপ বৃদ্ধি পায়, যা ফেরি চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এ অবস্থায় অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট নৌকা বা ইঞ্জিনচালিত বোটে নদী পারাপার করতে বাধ্য হন।
এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে প্রায় ৫৩২ মিটার দীর্ঘ একটি আধুনিক ক্যাবল স্টেইড সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সেতুটির নকশায় নদীর মাঝখানে কোনো পিলার রাখা হবে না, ফলে কর্ণফুলী নদীর স্বাভাবিক স্রোত ও নৌযান চলাচলে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না। এটি হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ক্যাবল স্টেইড সেতু।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নযোগ্য এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং অনুমোদন পেলে দ্রুত বাস্তবায়ন কাজ শুরু হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সেতু নির্মাণ হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই নয়, বরং পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে, পর্যটন খাত বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে।
এছাড়া সীমান্ত সড়কের সঙ্গে সংযোগ সহজ হওয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত প্রকল্পটির অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা—এই সেতু নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।