
শামসুল আলম:- পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে সুপরিচিত নাম দীপেন দেওয়ান। ছাত্ররাজনীতি থেকে বিচার বিভাগ এবং সেখান থেকে সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন—তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা অবশেষে গিয়ে পৌঁছেছে জাতীয় সংসদে। চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি রাঙ্গামাটি-২৯৯ আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় অঙ্গনে
১৯৬৩ সালের ৮ জুন জন্মগ্রহণকারী দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু ছাত্রজীবনে। রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সংগঠক হিসেবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন।
পরবর্তীতে “প্রাচ্যের অক্সফোর্ড”খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে সাফল্যের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ। ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন।
বিচার বিভাগ থেকে রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন
৭ম বিসিএসের মাধ্যমে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দিয়ে প্রায় ১৯ বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সিনিয়র যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে কর্মরত অবস্থায় সততা ও দক্ষতার পরিচয় দেন।
২০০৫ সালে দলীয় আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন এবং রাঙ্গামাটিতে বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া-এর নির্দেশনায় তিনি জেলা পর্যায়ে দলকে পুনর্গঠনে কাজ শুরু করেন।
১/১১-পরবর্তী সংকটে নেতৃত্ব
২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপির কার্যক্রম যখন স্থবির হয়ে পড়ে, তখন দীপেন দেওয়ান জেলা কার্যালয়ের কার্যক্রম পুনরায় চালু করেন। নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে জেলা বিএনপিকে সক্রিয় ও সুসংগঠিত করেন। পরবর্তীতে তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিপুল ভোটে সংসদে
চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙ্গামাটি-২৯৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দীপেন দেওয়ান ২,০১,৫৪৪ ভোট লাভ করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে তিনি ১,৭০,৩২২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। এই ফলাফল রাঙ্গামাটির নির্বাচনী ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজয়ের পর স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মাঝে উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন, শান্তি ও সম্প্রীতির প্রশ্নে তার ওপর বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে প্রত্যাশা
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন মহল ও সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে প্রত্যাশা রয়েছে—দীপেন দেওয়ানকে যেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পারিবারিক ঐতিহ্য
দীপেন দেওয়ানের পিতা স্বর্গীয় সুবিমল দেওয়ান ছিলেন একজন বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও রাজনীতিক। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে দীপেন দেওয়ান স্ত্রী মৈত্রী চাকমা ও দুই কন্যা—অদিতি দেওয়ান (কানাডা প্রবাসী) এবং রাজেশ্বরী দেওয়ান জুহি (আইন বিভাগের শিক্ষার্থী)—কে নিয়ে পারিবারিক জীবনযাপন করছেন।
উপসংহার
ছাত্ররাজনীতি থেকে বিচার বিভাগ, তারপর সক্রিয় দলীয় নেতৃত্ব—দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক যাত্রা এক বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার গল্প। বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে রাঙ্গামাটির রাজনীতিতে তিনি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন।
এখন পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা—জাতীয় সংসদে ও সম্ভাব্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই উন্নয়ন, শান্তি ও সম্প্রীতির লক্ষ্যে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।