
এসএম শামসুল আলম:– একজন মানুষের পরিচয় শুধু তাঁর পদমর্যাদা, ক্ষমতা কিংবা অর্জিত পুরস্কারে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে মানুষের প্রতি আচরণে, বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায় এবং দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সমাজে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেন, তার ওপর। একজন মানুষের সাফল্য তাঁকে পরিচিতি দিতে পারে, কিন্তু মানবিকতা তাঁকে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দেয়।
বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএমের কর্মজীবন ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই কথাগুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর পেশাগত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়, নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রকাশ একজন পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয়ের পাশাপাশি একজন মানুষের জীবনদর্শন সম্পর্কেও ভাবতে শেখায়।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে তিনি চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পান। এর আগে তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার এবং খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কর্মজীবনে অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব ও পেশাগত দক্ষতা—-
পুলিশের চাকরি কেবল আইন প্রয়োগের দায়িত্ব নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা এবং জনসাধারণের আস্থা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা। এই পেশায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে হলে প্রয়োজন শৃঙ্খলা, ধৈর্য, বিচক্ষণতা, সাহসিকতা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।
ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং এবং জনবান্ধব পুলিশি সেবা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
২০২৬ সালের মে মাসে পেশাগত অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম-সেবা) পাওয়ার জন্য নির্বাচিত হন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মদক্ষতা ও পেশাগত অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ ধরনের সম্মাননা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একজন কর্মকর্তার কর্মজীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু পদোন্নতি কিংবা পদক দিয়ে করা যায় না। তাঁর নেতৃত্বে অধীনস্থ সদস্যরা কতটা দায়িত্বশীল হচ্ছেন, সাধারণ মানুষ কত সহজে পুলিশি সেবা পাচ্ছেন এবং অপরাধের শিকার মানুষ কতটা ন্যায়সংগত আচরণ পাচ্ছেন—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মানবিক পুলিশিং: মানুষের আস্থাই সবচেয়ে বড় অর্জন—–
পুলিশের কাছে একজন মানুষ যখন সাহায্য চাইতে যান, তখন তিনি প্রায়ই কোনো বিপদ, ভয়, অনিশ্চয়তা কিংবা অসহায়ত্বের মধ্যে থাকেন। সেই মুহূর্তে পুলিশের একটি সহানুভূতিশীল কথা, মনোযোগ দিয়ে অভিযোগ শোনা কিংবা যথাযথ সহযোগিতা তাঁর মনে নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী থানাকে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় পরিণত করা এবং ভুক্তভোগীদের যথাযথ সেবা দেওয়ার ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব অনেক গভীর। কারণ, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় কেবল অপরাধী গ্রেপ্তারের মাধ্যমে নয়; বরং একজন সাধারণ নাগরিক থানায় গিয়ে কেমন ব্যবহার পেলেন, তাঁর অভিযোগ কতটা গুরুত্ব পেল এবং তিনি ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে কতটা সহযোগিতা পেলেন—তার মধ্য দিয়েও।
একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার নেতৃত্ব তখনই সার্থক হয়, যখন তাঁর অধীনস্থ প্রতিটি সদস্য উপলব্ধি করেন যে ইউনিফর্মের মর্যাদা রক্ষা করার অর্থ শুধু আইন প্রয়োগ করা নয়, মানুষের মর্যাদাকেও সম্মান করা।
বাবার শিক্ষা থেকে জীবনের দর্শন—–
ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর মানবিক চিন্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক উঠে এসেছে তাঁর বাবার কাছ থেকে পাওয়া একটি শিক্ষায়। বাবার শেখানো কথা ছিল—‘মানুষকে উপকার করতে না পারো, ক্ষতি করো না।
কথাটি ছোট, কিন্তু এর তাৎপর্য ব্যাপক। মানুষের জীবনে অনেক সময় বড় কিছু করার সুযোগ আসে না। সবাই হয়তো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির সমস্যা সমাধান করতে পারেন না, কিংবা সবার পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্যও থাকে না। কিন্তু কাউকে অকারণে কষ্ট না দেওয়া, অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন না করা, অসহায় মানুষের দুর্বলতার সুযোগ না নেওয়া এবং নিজের আচরণে কারও ক্ষতি না করা—এসব প্রত্যেকের সাধ্যের মধ্যে।
বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এই নীতির গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ, তাঁর সিদ্ধান্ত ও আচরণ মানুষের জীবন, নিরাপত্তা, সম্মান এবং ন্যায়বিচারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ক্ষমতা ও দায়িত্বের অবস্থানে থেকে মানুষের প্রতি সহমর্মী থাকা, আইন প্রয়োগে ন্যায্যতা বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত আচরণে সংযম দেখানো একজন কর্মকর্তার পেশাগত ও নৈতিক মর্যাদাকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের দায়িত্ব: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা—-
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর দায়িত্বের পরিধি গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত। এ অঞ্চলে মহানগর ও জেলা এলাকার পাশাপাশি রয়েছে পাহাড়ি জনপদ, সীমান্তবর্তী এলাকা, উপকূলীয় জনবসতি এবং নানা ধরনের সামাজিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা।
মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ, সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, সড়ক নিরাপত্তা, সাধারণ মানুষের অভিযোগের প্রতিকার এবং পুলিশি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা—এসব ক্ষেত্রে কার্যকর নেতৃত্বের প্রয়োজন।
বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক বাস্তবতা, নিরাপত্তাবোধ ও ন্যায্য প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিকতার সমন্বয় এখানে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
এ ক্ষেত্রে তাঁর সামনে যেমন বড় দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি মানুষের আস্থা অর্জন এবং জনবান্ধব পুলিশিংকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগও রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে গৃহীত উদ্যোগের বাস্তবায়ন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তার ওপর।
একজন কর্মকর্তার প্রকৃত সাফল্য কোথায়?——
একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাফল্য কেবল কতজন অপরাধী গ্রেপ্তার হলেন, কতটি অভিযান পরিচালিত হলো কিংবা কতটি পদক অর্জিত হলো—এসব পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এসবের পাশাপাশি দেখতে হয়, অপরাধের শিকার মানুষ কতটা সুরক্ষা পেলেন, নিরপরাধ মানুষ কতটা ন্যায্য আচরণ পেলেন এবং সাধারণ নাগরিক কতটা নির্ভয়ে পুলিশের কাছে যেতে পারলেন।
মানুষ এমন পুলিশ চায়, যিনি অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর হবেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রতি হবেন সহানুভূতিশীল। যিনি আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন, আবার অসহায় মানুষের কথা শোনার জন্যও সময় দেবেন। যিনি নিজের পদমর্যাদার মর্যাদা বজায় রাখবেন, পাশাপাশি অন্যের মর্যাদাকেও সম্মান করবেন।
ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর প্রকাশিত মানবিক বক্তব্য ও জনবান্ধব পুলিশিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়গুলো এ ধরনের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এসব মূল্যবোধের প্রকৃত প্রতিফলন নিশ্চিত হবে তখনই, যখন তা মাঠপর্যায়ে পুলিশের প্রতিটি সেবা ও সিদ্ধান্তে দৃশ্যমান হবে।
শেষ কথা: পদ নয়, মানুষের জন্য কাজই হোক পরিচয়—–
একজন মানুষের জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য তাঁর অর্জনের পাশাপাশি তাঁর মূল্যবোধে। পদমর্যাদা মানুষকে দায়িত্ব দেয়, ক্ষমতা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে, আর মানবিকতা সেই দায়িত্ব ও ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের শিক্ষা দেয়।
ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএমের কর্মজীবন, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং মানুষের ক্ষতি না করার যে জীবনবোধ সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতাই একজন মানুষের পরিচয়কে মহৎ করে তুলতে পারে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার সর্বোচ্চ অর্জন হবে, যদি তাঁর কর্মমেয়াদ শেষে সাধারণ মানুষ তাঁকে শুধু একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং একজন ন্যায়নিষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে স্মরণ করেন।
কারণ, পদ একসময় বদলে যায়, দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়, অর্জিত সম্মাননার তালিকাও একসময় অতীত হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতি, ন্যায়সংগত আচরণের অভিজ্ঞতা এবং মানবিক ব্যবহারের ছাপ দীর্ঘদিন মানুষের মনে থেকে যায়।
একজন মানুষের প্রকৃত বড়ত্ব তাঁর চেয়ারে নয়, তাঁর চরিত্রে; তাঁর ক্ষমতায় নয়, সেই ক্ষমতার ব্যবহারে; আর তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশটি ফুটে ওঠে মানুষের প্রতি তাঁর আচরণে।
লেখক:
এসএম শামসুল আলম
স্টাফ রিপোর্টার, যমুনা টেলিভিশন
সাবেক সভাপতি, রাঙ্গামাটি প্রেসক্লাব
smshamsu.cht@gmai.com