
এসএম শামসুল আলম:–রাজনীতিতে কেউ নেতা হয়ে জন্ম নেন না। মাঠের রাজনীতি, কর্মীদের পাশে থাকা, প্রতিকূলতা মোকাবিলা, ত্যাগ ও সময়ের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে একজন কর্মী ধীরে ধীরে নেতায় পরিণত হন। কেউ কেউ আবার ক্ষমতার সময়ে পরিচিতি পান, কিন্তু দুঃসময়ে হারিয়ে যান। আর যারা প্রতিকূল সময়েও নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখেন, দীর্ঘদিন সংগঠনের জন্য কাজ করেন এবং কর্মীদের পাশে থাকেন—তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয় ভিন্নভাবে।
ফারুক আহমেদ সাব্বিরের রাজনৈতিক জীবনকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা যায়।
কাঠালতলীর স্থানীয় রাজনীতি থেকে যাত্রা শুরু করে ছাত্রদলের রাজনীতির বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে রাঙ্গামাটি জেলা ছাত্রদলের সভাপতি, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, পরবর্তীতে জেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক এবং সর্বশেষ রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য—এ পথচলা একদিনে তৈরি হয়নি।
এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সংগঠনের জন্য সময় দেওয়া, নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং কঠিন সময়ে রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার ইতিহাস।
একসময় তিনি ছিলেন কাঠালতলীর সাব্বির। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় সেই পরিচয় ছড়িয়ে পড়েছে পুরো রাঙ্গামাটিতে। আজ তিনি শুধু কোনো একটি এলাকার রাজনৈতিক কর্মী নন; রাঙ্গামাটির রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত একটি নাম—ফারুক আহমেদ সাব্বির।
কাঠালতলীর মাটি থেকেই রাজনৈতিক পথচলা
ফারুক আহমেদ সাব্বিরের রাজনৈতিক জীবনের শুরুর অধ্যায় কাঠালতলীকে ঘিরে।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে কাঠালতলীর আঞ্চলিক কমিটির দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি সংগঠনের মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হন বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।
শুরুতে বড় কোনো পদ ছিল না, ছিল না রাজনৈতিক পরিচিতির বড় কোনো ব্যানার। ছিল একজন কর্মীর পরিচয়।
কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ, দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে।
এই সময়টিই ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরির সময়।
ওয়ার্ড থেকে শহর, শহর থেকে কলেজ
স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতির পর সাব্বিরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হয় ছাত্রদলের রাজনীতিতে।
পর্যায়ক্রমে তিনি ওয়ার্ড ছাত্রদল, রাঙ্গামাটি শহর ছাত্রদল এবং রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হন।
ছাত্ররাজনীতির মাঠই তাঁকে সংগঠক হিসেবে গড়ে তোলে।
রাজনীতির এই পর্যায়ে তাঁকে শুধু কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নয়, কর্মীদের সংগঠিত করা, নতুন কর্মী তৈরি করা এবং সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচি সফল করার কাজে যুক্ত হতে হয়।
রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ ছিল তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে তিনি শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও প্রত্যন্ত এলাকার ছাত্রনেতা-কর্মীদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ বাড়তে থাকে।
ধাপে ধাপে জেলা নেতৃত্বে
তৃণমূল থেকে উঠে আসা সাব্বির একসময় রাঙ্গামাটি জেলা ছাত্রদলের নেতৃত্বে আসেন।
২০১৮ সালে ঘোষিত রাঙ্গামাটি জেলা ছাত্রদলের কমিটিতে ফারুক আহম্মেদ সাব্বিরকে সভাপতি এবং আলী আকবর সুমনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। একই কমিটিতে হেলাল উদ্দীন সিনিয়র সহসভাপতি এবং বেলাল হোসেন সাক্কু সাংগঠনিক সম্পাদক হন।
এই কমিটি পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করে।
ফলে সাব্বিরের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে ওঠে জেলা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব।
আট বছর পর ২০২৬ সালে রাঙ্গামাটি জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা হলে তাঁর সেই অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। নতুন কমিটির সভাপতি হন অলি আহমেদ। বিদায়ী সভাপতি হিসেবে সাব্বির তখন বলেন, দীর্ঘদিন পর নতুন কমিটি হওয়ায় সংগঠন শক্তিশালী ও গতিশীল হবে এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটিকে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।
একজন নেতার জন্য দীর্ঘ আট বছর একই সংগঠনের জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বে থাকা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক জীবনের বড় অধ্যায়।
শুধু পদ নয়, দায়িত্বের রাজনীতি
সাব্বিরের নেতৃত্বের সময় জেলা ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটে কমিটি গঠনের কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে তাঁর ও সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর সুমনের স্বাক্ষরে বাঘাইছড়ির কাচালং সরকারি ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের ৩৫ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
একইভাবে রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রদলের নতুন কমিটির কর্মসূচিতেও জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে তিনি উপস্থিত ছিলেন।
২০২৬ সালের এপ্রিলেও রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রদলের উদ্যোগে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রধান অতিথি হিসেবে দেখা যায়।
এসব কর্মকাণ্ড থেকে বোঝা যায়, তাঁর জেলা ছাত্রদলের নেতৃত্বের সময় সংগঠন পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন ইউনিটের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
দুঃসময়ের রাজনীতিই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন সময় আসে যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়।
সেই সময় একজন নেতার সামনে দুটি পথ থাকে—পিছিয়ে যাওয়া অথবা আরও দৃঢ়ভাবে মাঠে থাকা।
সাব্বিরের রাজনৈতিক জীবনে দুঃসময়ের অধ্যায় কম নয়।
বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে এবং কারাবরণও করতে হয়েছে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সংবাদ সম্মেলনের বিবৃতিতে রাঙ্গামাটি জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ফারুক আহমেদ সাব্বিরকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
তাঁর মুক্তির দাবিতে রাঙ্গামাটিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় তাঁর দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে নেতাকর্মীরা তাঁর মুক্তির দাবি জানান।
রাজনীতিতে কারাবরণ শুধু একজন নেতার ব্যক্তিগত কষ্ট নয়; এর সঙ্গে পরিবার, কর্মজীবন, সামাজিক জীবন—সবকিছুই জড়িয়ে থাকে।
সাব্বিরের ক্ষেত্রেও সেই কঠিন সময় এসেছে।
কিন্তু কারাগারের চার দেয়াল তাঁর রাজনৈতিক পথচলা থামিয়ে দিতে পারেনি।
অসুস্থ মায়ের খবরেও কারাগারের কষ্ট
রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি ছিল তাঁর মায়ের অসুস্থতা।
তাঁর মুক্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত সমাবেশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সে সময় তাঁর মা অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে সাব্বির নিজেও অসুস্থ হয়ে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তাঁর মা উম্মে বসর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। রাঙ্গামাটির রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন নেতাকর্মী তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। তখন তাঁকে রাঙ্গামাটি জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
একজন রাজনৈতিক কর্মীর জীবনে এর চেয়ে কঠিন সময় আর কী হতে পারে—একদিকে রাজনৈতিক মামলা ও কারাবাস, অন্যদিকে অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা ও পরিবারের দুশ্চিন্তা।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দায়িত্ব
জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়েও দায়িত্ব পালন করেছেন ফারুক আহমেদ সাব্বির।
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে একই পরিচয়ে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
কারণ জেলা পর্যায়ের রাজনীতি থেকে বিভাগীয় পর্যায়ের দায়িত্ব পাওয়া মানে বৃহত্তর সাংগঠনিক পরিসরে কাজ করার সুযোগ পাওয়া।
রাঙ্গামাটির পাহাড়ি জেলা থেকে উঠে এসে চট্টগ্রাম বিভাগের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে দায়িত্ব পালন তাঁর সাংগঠনিক পরিচিতিকে আরও বিস্তৃত করে।
কর্মীদের কাছে সম্পর্কের রাজনীতি
সাব্বিরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আরেকটি দিক হলো কর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক।
২০২৫ সালে তিনি প্রয়াত ছাত্রনেতা জসিম উদ্দিনের কবর জিয়ারত করেন এবং তাঁর পরিবারের খোঁজখবর নেন। জসিম উদ্দিন ছিলেন রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সংগঠক ছাত্রদল নেতা।
রাজনীতির বাইরে গিয়ে একজন প্রয়াত সহযোদ্ধার পরিবারের খোঁজ নেওয়া এবং তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কের একটি মানবিক দিক তুলে ধরে।
রাজনীতিতে এই সম্পর্কই অনেক সময় একজন নেতার প্রকৃত শক্তি হয়ে ওঠে।
আন্দোলন-সংগ্রামের রাজপথে
রাঙ্গামাটির রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতেও সাব্বিরকে নিয়মিত সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রাঙ্গামাটিতে বিএনপির আয়োজিত সমাবেশে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ফারুক আহমেদ সাব্বির উপস্থিত ছিলেন। এর আগে শহরে অনুষ্ঠিত বিজয় মিছিলেও তিনি অংশ নেন।
এ ধরনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন তিনি জেলা পর্যায়ের ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার একটি বড় অংশই ছিল রাজপথের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে।
আট বছর পর দায়িত্ব হস্তান্তর—কিন্তু রাজনীতি থেকে বিদায় নয়
২০২৬ সালে রাঙ্গামাটি জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সাব্বিরের আট বছরের জেলা ছাত্রদল সভাপতির অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়।
কিন্তু এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়।
বরং ছাত্ররাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বিএনপির মূল রাজনীতিতে আরও বড় পরিসরে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।
তাঁকে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ যে সংগঠন দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অধ্যায় তৈরি হয়েছিল, সেই ছাত্রসংগঠনের অভিজ্ঞতা এবার তিনি মূল দলের সাংগঠনিক কাজে কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
নতুন অধ্যায়—রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ
রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় নতুন অধ্যায় আসে ২০২৬ সালে।
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের নতুন নেতৃত্বে তাঁকে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার দীপুর সঙ্গে সদস্য হিসেবে অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ, ফারুক আহমেদ সাব্বির, শাশ্বত চাকমা ও সায়রা চন্দ্রার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
যে মানুষটি দীর্ঘদিন ছাত্ররাজনীতির মাঠে কর্মীদের সংগঠিত করেছেন, এখন তাঁর সামনে রয়েছে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।
এখানে তাঁর সামনে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের জন্য কাজ করার বাস্তব সুযোগ।
কাঠালতলীর সাব্বির থেকে রাঙ্গামাটির সাব্বির
একসময় তাঁর পরিচয় ছিল—কাঠালতলীর সাব্বির।
স্থানীয় রাজনীতির মাঠে একজন কর্মী হিসেবে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা বিস্তৃত হয়েছে শহর, কলেজ, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে।
তিনি হয়েছেন—
একজন তৃণমূল কর্মী,
ছাত্রদল নেতা,
জেলা ছাত্রদলের সভাপতি,
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের বিভাগীয় নেতা,
জেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক
এবং এখন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য।
এই ধারাবাহিকতাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
রাজনীতিতে ত্যাগের অগ্নিপরীক্ষা
রাজনীতিতে পদ পাওয়া যায় বিভিন্নভাবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একটি রাজনৈতিক অবস্থানে টিকে থাকা সহজ নয়।
বিশেষ করে বিরোধী রাজনীতির কঠিন সময়ে মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, রাজনৈতিক চাপ এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রতিকূলতা একজন নেতাকে ভেতর থেকে পরীক্ষা করে।
সাব্বির সেই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এসেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাই কোনো একটি পদ নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতির মাঠে থাকা।
এই কারণেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে বলা যায়—ত্যাগের অগ্নিপরীক্ষায় খাঁটি হয়ে ওঠার গল্প।
নতুন দায়িত্বে নতুন পরীক্ষা
তবে অতীতের ত্যাগ একজন নেতাকে সম্মান এনে দিতে পারে, কিন্তু নতুন দায়িত্বে সেই সম্মান ধরে রাখা আরও কঠিন।
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে এখন সাব্বিরের সামনে রয়েছে মানুষের প্রত্যাশা পূরণের বড় দায়িত্ব।
রাঙ্গামাটির প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি, পর্যটন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং শান্তি-সম্প্রীতির পরিবেশ আরও শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলোতে জেলা পরিষদের ভূমিকা রয়েছে।
দীর্ঘদিন মাঠের রাজনীতিতে থাকার কারণে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর যে যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।
রাজনীতির শেষ কথা মানুষের আস্থা
একজন নেতার রাজনৈতিক পরিচয় শেষ পর্যন্ত শুধু পদ-পদবিতে নির্ধারিত হয় না।
মানুষ তাঁকে কীভাবে দেখে, কর্মীরা তাঁর ওপর কতটা আস্থা রাখে এবং দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি মানুষের জন্য কী করতে পারেন—এসবই একজন নেতার প্রকৃত মূল্যায়নের জায়গা।
ফারুক আহমেদ সাব্বিরের সামনে তাই এখন নতুন সময়।
ছাত্ররাজনীতির দীর্ঘ অধ্যায় শেষ হয়েছে। রাজপথের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা তাঁর সঙ্গে রয়েছে। কারাবরণের স্মৃতি রয়েছে। হারানোর কষ্ট রয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের সম্পর্ক রয়েছে।
আর এখন রয়েছে মানুষের জন্য কাজ করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ।
শেষ কথা
কাঠালতলীর একজন তরুণ কর্মী থেকে রাঙ্গামাটির রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার গল্পটি সহজ কোনো গল্প নয়।
এ গল্পে আছে তৃণমূল থেকে উঠে আসার সংগ্রাম।
আছে ছাত্ররাজনীতির দীর্ঘ পথচলা।
আছে জেলা নেতৃত্বের দায়িত্ব।
আছে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা।
আছে মামলা ও গ্রেপ্তার।
আছে কারাবরণের কঠিন সময়।
আছে অসুস্থ মাকে নিয়ে উদ্বেগ ও পরে তাঁকে হারানোর বেদনা।
আছে আট বছর জেলা ছাত্রদলের নেতৃত্ব দেওয়ার অধ্যায়।
আছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে জায়গা করে দেওয়ার মানসিকতা।
আর সবশেষে আছে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে নতুন দায়িত্বের অধ্যায়।
তাই ফারুক আহমেদ সাব্বিরের রাজনৈতিক জীবনের গল্পকে শুধু একজন ছাত্রনেতার গল্প বললে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
এটি একজন তৃণমূল কর্মীর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রা—যে অভিযাত্রার শুরু কাঠালতলীতে, বিস্তার রাঙ্গামাটিতে, আর এখন যার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে জনসেবার প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে।
একসময় তিনি ছিলেন কাঠালতলীর সাব্বির।
রাজনীতির দীর্ঘ পথ তাঁকে আজ পরিচিত করেছে রাঙ্গামাটির সাব্বির হিসেবে।
এখন তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—অতীতের ত্যাগ ও সংগ্রামের সেই রাজনৈতিক পরিচয়কে মানুষের কল্যাণের কাজে রূপ দেওয়া।
কারণ রাজনীতিতে অতীতের ত্যাগ একজন নেতাকে পরিচিত করে, কিন্তু বর্তমানের কাজই তাঁকে ইতিহাসে জায়গা করে দেয়।
লেখক:—
এসএম শামসুল আলম।
স্টাফ রির্পোটার যমুনা টেলিভিশন।
সাবেক সভাপতি
রাঙ্গামাটি প্রেসক্লাব।
smshamsul.cht@gmail.com