শিরোনাম
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরে ১১ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ ৩০ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত : মাহদী আমিন কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক ক্ষমতার সঙ্গে বদলে যায় ইতিহাস ও সংস্কৃতির পাঠ, শেষ কোথায়? জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক কঙ্গোয় ১০০ যাত্রী নিয়ে নৌকাডুবি, নিহত অন্তত ৪১ শান্তিময় ও মানবিক বিশ্ব দেখতে চায় বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী সাজেকে সোলারভিত্তিক পানি সরবরাহ ও কৃষি সেচ প্রকল্পের উদ্বোধন সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে চুয়েটে শিক্ষার্থীদের মশাল মিছিল কক্সবাজার সৈকতে বসছে তিনদিনের পর্যটন উৎসব রাঙ্গামাটিতে আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্সের ভিত্তি স্থাপন করলেন মীর হেলাল

২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও কাটেনি সংকট, পাহাড়ের মানুষের ভরসা রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ দেখা হয়েছে

শামসুল আলম:- পাহাড়, হ্রদ আর দুর্গম জনপদে ঘেরা রাঙ্গামাটি জেলার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান আশ্রয় রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা থেকে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে হাসপাতালটির গুরুত্বও অনেক বেশি।
সময় ও প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত হয়েছে। এতে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি জেলার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু শয্যা সংখ্যা বাড়লেও রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসক, নার্স, অন্যান্য জনবল, অবকাঠামো, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত সেবার ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি। ফলে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত হওয়ার সুফল সব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২৫০ শয্যায় উন্নীত, বেড়েছে মানুষের প্রত্যাশা
দীর্ঘদিনের চাহিদার পর হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ায় রাঙ্গামাটিবাসীর মধ্যে চিকিৎসাসেবা নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জেলার প্রত্যন্ত উপজেলা থেকে আসা রোগীদের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কাপ্তাই, রাজস্থলী, লংগদু, নানিয়ারচর, বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি ও কাউখালীসহ বিভিন্ন উপজেলার রোগীদের অনেক ক্ষেত্রেই জটিল চিকিৎসার জন্য রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে আসতে হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে নৌপথ ও সড়কপথ পেরিয়ে রোগী নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতেই অনেক সময় লেগে যায়।
ফলে জেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ যত বাড়বে, প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের দুর্ভোগও তত কমবে।
জরুরি চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
সড়ক দুর্ঘটনা, পাহাড়ধস, নৌ-দুর্ঘটনা কিংবা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে আহতদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল জেলার অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র।
এছাড়া মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, শিশু, অর্থোপেডিকসহ বিভিন্ন বিভাগে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রসূতি ও শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও হাসপাতালটি জেলার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
জেলার দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অনেক রোগীর পক্ষে চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে জেলা শহরের এই হাসপাতালটিই তাদের শেষ ভরসা।
শয্যা বাড়লেও কাটেনি মূল সংকট
হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও শুধু শয্যা সংখ্যা বাড়ালেই একটি হাসপাতালের পূর্ণ সক্ষমতা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন হয় সেই অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ প্রয়োজনীয় জনবল।
রোগীর চাপের তুলনায় পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সময় ও মানের সেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
একইভাবে শয্যা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ডের জায়গা, জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সক্ষমতা, অক্সিজেন সরবরাহ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রোগী ও স্বজনদের অন্যান্য সুবিধাও বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রয়োজন বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা
রাঙামাটির ভৌগোলিক বাস্তবতায় জেলা পর্যায়েই যত বেশি সম্ভব বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। হৃদরোগ, কিডনি, নিউরোলজি, শিশু, প্রসূতি, অর্থোপেডিকসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি বাড়ানো গেলে রোগীদের চট্টগ্রামমুখী চাপ কমবে।
বিশেষ করে গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ, এইচডিইউ, উন্নত জরুরি চিকিৎসা এবং ২৪ ঘণ্টা কার্যকর ডায়াগনস্টিক সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জটিল রোগীকে দ্রুত চট্টগ্রাম বা অন্যত্র স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স ও সমন্বিত রেফারেল ব্যবস্থাও থাকা জরুরি।
আধুনিক যন্ত্রপাতি, কিন্তু ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি
সরকারি বিনিয়োগে হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম যুক্ত করা হলেও যন্ত্রপাতি স্থাপনই শেষ কথা নয়। এগুলো নিয়মিত সচল রাখা, দক্ষ টেকনিশিয়ান নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
একটি আধুনিক জেলা হাসপাতালের জন্য পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা, রেডিওলজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে, প্রয়োজনীয় জরুরি পরীক্ষা এবং অন্যান্য ডায়াগনস্টিক সুবিধা ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
পাহাড়ি মানুষের জন্য আলাদা বাস্তবতা
রাঙামাটির স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনায় জেলার ভৌগোলিক বাস্তবতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের সমতল এলাকার একটি জেলা হাসপাতালের সঙ্গে পাহাড়ি জেলার হাসপাতালের প্রয়োজন এক নয়।
দুর্গম ইউনিয়ন থেকে রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। বর্ষাকালে পাহাড়ধস ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
তাই রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালকে শুধু একটি জেলা হাসপাতাল হিসেবে নয়, পুরো পার্বত্য অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেল হাসপাতাল হিসেবে বিবেচনা করে পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
কী করা দরকার
রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালকে ২৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক হাসপাতালে রূপ দিতে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, অনুমোদিত পদ অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, হাসপাতালের জরুরি বিভাগকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে।
চতুর্থত, আইসিইউ ও এইচডিইউসহ গুরুতর রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার সুবিধা বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, অপারেশন থিয়েটার, ল্যাবরেটরি ও ডায়াগনস্টিক সেবার সক্ষমতা বাড়িয়ে ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স এবং উপজেলা হাসপাতালগুলোর সঙ্গে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সপ্তমত, হাসপাতালের পানি, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রোগী ও স্বজনদের বসার জায়গা এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।
অষ্টমত, আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার পাশাপাশি সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে
রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়; পাহাড়ের লাখো মানুষের স্বাস্থ্যনিরাপত্তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত। ২৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার মাধ্যমে হাসপাতালটি ইতোমধ্যে একটি বড় সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এখন প্রয়োজন সেই সক্ষমতাকে কার্যকর করার জন্য জনবল, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশেষায়িত সেবা ও অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়ন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। এতে একদিকে জেলার মানুষের চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার প্রবণতা কমবে, অন্যদিকে দুর্গম এলাকার রোগীরা দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
পাহাড়ের মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা হিসেবে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। এখন ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালকে কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব সক্ষমতায় পূর্ণাঙ্গ ২৫০ শয্যার হাসপাতালে পরিণত করাই সময়ের দাবি।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions