
শামসুল আলম:- বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের অঙ্গনে আতিকুর রহমান রুমন একটি পরিচিত নাম। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন, লেখালেখি, গণমাধ্যমের সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই দীর্ঘ পথচলার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে এ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটেও তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আতিকুর রহমান রুমনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাগুলোর একটি হলো তাঁর সাংবাদিকতা-অভিজ্ঞতা। তিনি শুধু সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেননি; সংবাদ, রাজনীতি, রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের প্রত্যাশাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ফলে রাষ্ট্রের সঙ্গে গণমাধ্যমের যোগাযোগের জায়গাটিও তিনি একজন পেশাদার সাংবাদিকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দৈনিক দিনকালের সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবেও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁকে সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একজন সাংবাদিক যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের দায়িত্বে আসেন, তখন তাঁর কাছে প্রত্যাশাটাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে। কারণ একজন পেশাদার সাংবাদিক জানেন—একটি তথ্য কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়, একটি বক্তব্যের কোন শব্দটি কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে এবং মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহের সময় কী ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
এই জায়গায় আতিকুর রহমান রুমনের দীর্ঘ সাংবাদিকতা-অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে একটি বড় সম্পদ। তাঁর দায়িত্ব শুধু সরকারের বক্তব্য গণমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া নয়; একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সরকারের মধ্যে একটি কার্যকর, দায়িত্বশীল ও পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক তৈরিতেও ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগে একজন সাংবাদিকের দৃষ্টিভঙ্গি
আতিকুর রহমান রুমনের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতেও সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের সঠিক তথ্য পরিবেশনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন, সাংবাদিকরা যেন প্রকৃত তথ্য ও সঠিক চিত্র তুলে ধরেন এবং মিথ্যা বা অপতথ্যকে প্রশ্রয় না দেন।
একইভাবে অপসাংবাদিকতা ও অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বানও তিনি জানিয়েছেন।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার, যাচাইহীন তথ্য এবং গুজবের কারণে সাংবাদিকতার দায়িত্ব আরও বেড়েছে। এমন বাস্তবতায় একজন রাষ্ট্রীয় প্রেস কর্মকর্তার পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সঠিক তথ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান গণমাধ্যমের পেশাগত মানোন্নয়নের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
মাঠের সাংবাদিকদের বাস্তবতা বোঝার সুযোগ
আতিকুর রহমান রুমনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়—তিনি নিজেই সাংবাদিকতার মাঠ থেকে উঠে এসেছেন। ফলে ঢাকার নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে একজন সাংবাদিককে দেখার পাশাপাশি মাঠের একজন সাংবাদিকের বাস্তবতাও তিনি বোঝেন।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা প্রতিদিন সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ করেন। দুর্গম এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি, অর্থনৈতিক চাপ এবং পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যেও তাঁরা মানুষের কথা তুলে ধরেন। রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের দায়িত্বে থাকা একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের কাছে এসব বাস্তবতা তুলে ধরার সুযোগ থাকাটা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে রাজধানীর বাইরে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ আরও কার্যকর করা, মাঠপর্যায়ের সংবাদকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সাংবাদিকদের পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে—এমন প্রত্যাশা করাই যায়।
রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের মধ্যে সেতুবন্ধনের সম্ভাবনা
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার তার কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে চায়, আর গণমাধ্যম জনগণের প্রশ্ন, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার কথা সরকারের কাছে তুলে ধরে।
এই দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ যত বেশি স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল ও পেশাদার হবে, রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে আস্থার জায়গাটিও তত শক্তিশালী হবে।
আতিকুর রহমান রুমনের মতো একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের দায়িত্বে থাকেন, তখন তাঁর সাংবাদিকতা-অভিজ্ঞতা এই সেতুবন্ধন তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর কাছে প্রত্যাশা থাকবে—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা এবং জনগণের জানার অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগকে আরও আধুনিক, দ্রুত ও কার্যকর করে তুলবেন।
প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কমিটিতেও দায়িত্ব
গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও আতিকুর রহমান রুমনকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তাঁকে সদস্য করে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। এই কমিটির কাজের মধ্যে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড প্রদান, সংশ্লিষ্ট অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং নীতিমালা পর্যালোচনার বিষয় রয়েছে।
এ দায়িত্ব তাঁর সাংবাদিকতা-অভিজ্ঞতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে। সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয়, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং গণমাধ্যমের প্রয়োজন সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হতে পারে।
নেতৃত্বের জায়গায় একটি বড় প্রত্যাশা
আতিকুর রহমান রুমনের পথচলা শুধু একটি পদে পৌঁছানোর গল্প নয়; এটি দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা, লেখালেখি, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি পেশাগত যাত্রা।
তাঁর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো—রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে পেশাদার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে সরকার কী করছে, কেন করছে এবং জনগণের জন্য তার সুফল কী—এসব বিষয় সহজ, পরিষ্কার ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা।
তিনি যদি মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের সঙ্গে আরও বেশি যোগাযোগ তৈরি করেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের কথা শোনেন এবং তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরেন, তাহলে তাঁর দায়িত্ব আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে।
একজন সাংবাদিক থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে
আতিকুর রহমান রুমনের বর্তমান দায়িত্বকে তাই শুধু একটি সরকারি পদ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। একজন সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ সময় সংবাদপেশায় থাকার পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী কার্যালয়ের যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসা নিঃসন্দেহে তাঁর পেশাগত জীবনের একটি বড় অধ্যায়।
একজন সাংবাদিকের কলম থেকে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের টেবিলে—এই পথচলা তাঁকে একটি বিশেষ অবস্থান দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা তিনি যত বেশি জনগণ, সাংবাদিক সমাজ এবং রাষ্ট্রের মধ্যে ইতিবাচক যোগাযোগ তৈরিতে কাজে লাগাতে পারবেন, তাঁর দায়িত্ব তত বেশি সফল ও তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
আতিকুর রহমান রুমনের প্রতি প্রত্যাশা—তিনি তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা-অভিজ্ঞতা, পেশাগত প্রজ্ঞা ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সরকার ও গণমাধ্যমের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবেন। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের জন্য তিনি একজন সহজপ্রাপ্য, সহযোগিতাপূর্ণ ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের মুখ হয়ে উঠবেন।
সাংবাদিকতা থেকে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসা আতিকুর রহমান রুমনের এই নতুন অধ্যায় আরও সফল হোক—এটাই প্রত্যাশা। তাঁর অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা দেশের গণমাধ্যম, সাংবাদিক সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুক।
লেখক:- এসএম শামসুল আলম।
সাবেক সভাপতি,রাঙ্গামাটি প্রেসক্লাব।
স্টাফ রির্পোটার, যমুনা টেলিভিশন।