শিরোনাম
জাপানের চোখধাঁধানো জয় ‘আয়রন লেডি’ তাকাইচির ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ! সিসি ও বডি–ওর্ন ক্যামেরা থেকে ফুটেজ নেয়ার পরামর্শ যেসব কারণে ভোট বাতিল হতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিমুখী নির্বাচনী বাস্তবতা উত্তাপ, নীরবতা ও নেপথ্য সমঝোতার রাজনীতি পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচন ও সংবিধান: রাষ্ট্র কি নীরবে সীমান্ত হারাচ্ছে? পার্বত্য চট্টগ্রামের ভোট: ব্যালট নয়, ভয়ের রাজনীতি ও রাষ্ট্রের নীরব পশ্চাদপসরণ পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচন: ভোট নয়, ক্ষমতার অদৃশ্য মানচিত্র রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে ভোটের সরঞ্জাম ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট লোকবল সন্ন নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ভূমিকা ইরানের সঙ্গে খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে–ডনাল্ড ট্রাম্প

পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচন: ভোট নয়, ক্ষমতার অদৃশ্য মানচিত্র

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ দেখা হয়েছে

শামসুল আলম:- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়—বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, জাতিগত ভারসাম্য, নিরাপত্তা কাঠামো ও ভূমির মালিকানাকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দ্বন্দ্বের আরেকটি অধ্যায়। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান—এই তিন জেলার নির্বাচনী বাস্তবতা তাই একই ফ্রেমে ধরা পড়ে না; বরং এখানে তিন রকম রাজনীতি সক্রিয়—উত্তাপ, নীরবতা ও নেপথ্য সমঝোতা।
নীরবতা কি সত্যিই শান্তি?
রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে এবারের নির্বাচন বাহ্যিকভাবে শান্ত ও উত্তাপহীন। কিন্তু এই নীরবতা কি স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিণতি, নাকি এটি পরিকল্পিত নিস্তব্ধতা—সে প্রশ্ন স্থানীয় রাজনীতিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। দৃশ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় ভোটার অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে—কার স্বার্থে এই ফাঁকা মাঠ?
রাঙ্গামাটিতে বিএনপির দীপেন দেওয়ান এবং বান্দরবানে সাচিং প্রু জেরির সামনে কার্যকর কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা নিছক রাজনৈতিক দুর্বলতার ফল নয়—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা। জামায়াতে ইসলামীর সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে দুর্বল জোটসঙ্গীকে সামনে আনা এবং আঞ্চলিক শক্তি জেএসএস-এর সরাসরি প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে একটি অদৃশ্য সমঝোতার ইঙ্গিত দেয়, যা গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আঞ্চলিক শক্তির কৌশল: প্রকাশ্যে নয়, পর্দার আড়ালে
পার্বত্য রাজনীতিতে জেএসএস ও ইউপিডিএফ কেবল রাজনৈতিক দল নয়—তারা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা বাস্তবতা এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে তারা কোথায় প্রার্থী দেবে, কোথায় দেবে না—এ সিদ্ধান্ত আদর্শিক নয়, বরং কৌশলগত।
রাঙ্গামাটিতে ইউপিডিএফ প্রার্থী থাকলেও তার প্রভাব সীমিত—কারণ জেলার বড় অংশে জেএসএসের সামাজিক আধিপত্য। আর বান্দরবানে ইউপিডিএফের অনুপস্থিতি নির্বাচনকে প্রায় একতরফা করে তুলেছে। প্রশ্ন হলো—এই শূন্যতা কার জন্য তৈরি হলো?
খাগড়াছড়ি: যেখানে সব মুখোশ খুলে যায়
এই তিন জেলার মধ্যে খাগড়াছড়ি একেবারেই আলাদা। এখানে নির্বাচন আর কৌশলের খেলা নয়—এটি সরাসরি শক্তির প্রদর্শনী। বিএনপি, জামায়াত ও ইউপিডিএফ—তিন পক্ষই জানে, এই আসনের ফল পার্বত্য রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ দেবে।
আবদুল ওয়াদুদ ভুঁইয়ার উপস্থিতি আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে অস্বস্তিতে ফেলেছে—কারণ তিনি কেবল একজন প্রার্থী নন, বরং পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় উপস্থিতির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। ফলে তার বিপরীতে ইউপিডিএফের সরাসরি প্রার্থী এবং জেএসএসের পরোক্ষ তৎপরতা একসঙ্গে সক্রিয় হয়েছে।
এখানেই নির্বাচন ভয়ংকর হয়ে ওঠে। অভিযোগ উঠছে ভয়ভীতি, প্রতীকনির্ভর হুমকি, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের আধিক্য—সব মিলিয়ে খাগড়াছড়ির ভোট যেন আর ব্যালটের মাধ্যমে নয়, বরং ভয়ের মানচিত্র ধরে এগোচ্ছে।
বাঙালি অনৈক্য বনাম আঞ্চলিক ঐক্য
পার্বত্য রাজনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—আঞ্চলিক দলগুলো কৌশলে ঐক্যবদ্ধ, আর বাঙালি রাজনৈতিক শক্তি বিভক্ত। খাগড়াছড়িতে বাঙালি ভোট যদি বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, তবে পাহাড়ি ভোট সংগঠিতভাবে যেদিকে যাবে—ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে।
এই চিত্র নতুন নয়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে এটি আরও নগ্নভাবে দৃশ্যমান।
ভোটের পরে কী?
এই নির্বাচন শেষ হলে শুধু তিনটি আসনের ফলাফল জানা যাবে না—জানা যাবে পাহাড়ে রাষ্ট্রের অবস্থান কতটা শক্ত বা দুর্বল। যদি আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব আরও বেড়ে যায়, তাহলে ভূমি কমিশন, জেলা পরিষদে পুলিশ হস্তান্তর, সেনা উপস্থিতি হ্রাস—এসব বিতর্কিত ইস্যু আবার সামনে আসবে। ইতিহাস বলে, এসব সিদ্ধান্তের ভুক্তভোগী প্রথমে বাঙালিরা হলেও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই এর মূল্য দিতে হয়।
উপসংহার
পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচন তাই আরেকটি সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। গণতান্ত্রিক রাজনীতির শূন্যতা যেখানে তৈরি হয়, সেখানে অগণতান্ত্রিক শক্তি ঢুকে পড়ে—এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।
জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর এখনই ভাবা উচিত—পাহাড়ে প্রতিনিধিত্ব মানে শুধু প্রার্থী দেওয়া নয়; এটি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। তা না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই নীরব, উত্তপ্ত ও সমঝোতামূলক রাজনীতি একদিন রাষ্ট্রের জন্য বড় সংকেত হয়ে উঠবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions