
মেহেদী হাসান পলাশ:- বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতভুক্তির দাবীতে হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে(আইসিজে) যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন ভারতীয় ও ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশী চাকমা সম্প্রদায়। গতকাল ( ১৫ আগস্ট) ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা বার্ষিকীতে ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতীয় পতাকা উত্তোলনের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি ওয়েবিনারে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন ভারতীয় ও ভারত প্রবাসী বাংলাদেশী চাকমা নেতৃত্ব।
ওয়েবিনারে মিজোরামের বিধায়ক এবং চাকমা স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদের (সিএডিসি) সদস্য রসিক মোহন চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাকিস্তানভুক্তি চ্যালেঞ্জ করে এবং ভারতভুক্তির দাবীতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) উত্থাপন করার প্রস্তাব দেন। তার এ প্রস্তাব হিউম্যানিটি প্রোটেকশন ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক গৌতম চাকমা; অরুণাচল প্রদেশের চাকমা হাজং এল্ডার্স ফোরামের প্রীতিময় চাকমা এবং চাকমা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সুহাস চাকমা এই প্রস্তাবটিকে সমর্থন করেন।
গৌতম চাকমার পিতা স্নেহ কুমার চাকমা ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট রাঙামাটিতে ভারতের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের ২১ আগস্ট পাকিস্তানের বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা রাঙামাটিতে ওড়ানো ভারতের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে।
অনুষ্ঠানের আয়োজক ও সঞ্চালক সুহাস চাকমা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা হলেও দীর্ঘদিন ধরে দিল্লীতে বসবাস করছেন। তার ভারতীয় নাগরিকত্বও রয়েছে। তিনি রাইটস অ্যান্ড রিস্কস অ্যানালাইসিস গ্রুপ (RRAG) নামে দিল্লিভিত্তিক এই মানবাধিকার গবেষণা ও থিঙ্ক-ট্যাংক সংস্থার পরিচালক, তিনি ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (NHRC) মানবাধিকার কর্মী ও এনজিও বিষয়ক কোর গ্রুপের একজন সদস্য। এবং ‘এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস’ (ACHR) এবং ‘চাকমা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়া’ (CDFI)-সহ বেশ কয়েকটি অধিকার রক্ষা সংগঠনের সাথে যুক্ত আছেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পক্ষে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম ও স্যোশাল মিডিয়ায় সোচ্চার রয়েছেন।
ওয়েবিনারে চাকমা নেতারা বলেন, ১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামের মর্যাদা নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি, যা ১৮৬০ সাল থেকে একটি পৃথক জেলা হিসেবে শাসিত হয়ে আসছিল।
তারা বলেন, সাইরিল র্যাডক্লিফের নেতৃত্বাধীন বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ জনসংখ্যা অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও এবং এই অঞ্চলের আদিবাসীদের বক্তব্য পেশ করার কোনো সুযোগ না দিয়েই অঞ্চলটিকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করেছে।
অনুষ্ঠানে সঞ্চালক সুহাস চাকমা বলেন “সিরিল র্যাডক্লিফের নেতৃত্বাধীন বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ জনসংখ্যা অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও এবং সেখানকার উপজাতিদের বক্তব্য পেশ করার কোনো সুযোগ না দিয়েই এটিকে পূর্ব পাকিস্তানকে প্রদান করে,” তিনি আরও বলেন, এই রায়কে ঘিরে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অংশ হওয়া উচিত ছিল—এই দাবির বিচার আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে হওয়া উচিত।
এই চাকমা নেতা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মর্যাদা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টি উত্থাপন করার জোরালো যুক্তি ভারত সরকারের রয়েছে। তিনি এই অঞ্চলের উপজাতি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সমাধানের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকেও আহ্বান জানিয়েছেন। ওয়েবিনারে অংশগ্রহণকারীরা ভারত সরকারসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো তুলে ধরতে সম্মত হয়েছেন।
উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলেও কলকাতা বন্দর রক্ষা ও ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সাথে যোগাযোগের নাম করে বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল মুর্শিদাবাদ, মালদহ, নদীয়া, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, করিমগঞ্জ ও দিনাজপুর জেলার একটি অংশকে ভারতভূক্ত করে বাউন্ডারি কমিশন। অন্যদিকে মুসলিম লীগ চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তার জন্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ না হওয়া সত্ত্বেও তাকে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভূক্ত করার দাবি জানায়।Geographic Reference
সেসময় স্নেহ কুমার চাকমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা নেতৃত্ব পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের অন্তর্ভূক্ত করার জন্য জওহার লাল নেহেরু ও সরদার বল্লভভাই প্যাটলের নিকট দাবী জানাতে থাকে। এ নিয়ে মাউন্টব্যাটেন ও বাউন্ডারি কমিশনের প্রধান স্যার সিরিল রাড ক্লিফের সামনে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে বচসা হয়। কিন্তু মুসলিম লীগ নেতারা উল্লিখিত পরিবর্তনগুলোর উদাহরণ দেখিয়ে কোনোভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভারতভুক্তির দাবী গ্রহণ করেনি।
তাদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতে গেলে ভারতীয় সীমানা চট্টগ্রাম বন্দরের এতো নিকটে চলে আসে যে, বন্দরটির নিরাপত্তা চরম সঙ্কটে পড়ে। মুসলিম লীগের এই অনমনীয় মনোভাবের কারণে কংগ্রেস নেতারা পাঞ্জারের গুরুদাসপুর ও ফিরোজপুর জেলা এবং পূর্ব পাকিস্তানের দিনাজপুর জেলার একটি বড় অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে বিনিময় করার প্রস্তাব দেয়। গুরুদাসপুর কাশ্মীরের সাথে এবং দিনাজপুর সেভেন সিস্টার্সের সাথে যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মুসলিম লীগ এ প্রস্তাব মেনে নিলে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের তিনটি অংশের বিনিময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের ভাগে পড়ে যা ১৯৭১ সাথে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড হিসেবে পরিগণিত হয়।
তবে চতুর কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এই বিনিময় প্রস্তাব মেনে নিলেও স্নেহকুমার চাকমাসহ উপস্থিত চাকমা নেতৃত্বকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভারতভুক্তির দাবী জানাতে এবং সেখানে ভারতে পতাকা উড়িয়ে দেয়ার পরামর্শ দেন। সে মোতাবেক স্নেহকুমার চাকমার নেতৃত্বে রাঙামাটিতে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন। ১৭ আগস্ট বাউন্ডারি কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে জানা যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম পকিস্তানের ভাগে পড়েছে।
এরপর ১৯৪৭ সালের ২১ আগস্ট পাকিস্তানের বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা, কারো মতে, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস রাঙামাটিতে ওড়ানো ভারতের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে। কিন্তু চাকমা সম্প্রদায়ের একাংশ এটা এখনো মেনে নিতে পারেনি। এ কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের চাকমা সম্প্রদায়ের একাংশ এ দিনকে ব্লাক ডে বা কালো দিবস বলে পালন করে। লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সম্পাদক পার্বত্যনিউজ। পার্বত্যনিউজ