
ডেস্ক রির্পোট:- শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে পাহাড়ের প্রত্যন্ত এক গ্রামে ভাড়া বাসা নেওয়া দুই বিদেশি নাগরিককে ঘিরে শুরু হওয়া সন্দেহের সূত্র ধরে উন্মোচিত হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিস্তৃত একটি আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্র। তদন্তে জানা গেছে, সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে বসানো হচ্ছিল আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের গোপন সরঞ্জাম, যা ব্যবহার করে বড় ধরনের সাইবার অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা ছিল।
পুলিশ জানায়, গত প্রায় দুই বছর ধরে চট্টগ্রাম বিভাগের খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম নগরীতে ধাপে ধাপে সক্রিয় ছিল এই চক্রটি। তিনটি পৃথক অভিযানে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৭১ জন বিদেশি নাগরিককে, যাদের মধ্যে ১৩ জন চীনের। তিনটি ঘটনাতেই চীনা নাগরিকদের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তদন্তকারীরা মনে করছেন, চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছেন চীনারাই।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার মোহাম্মদ শামীম হোসেন জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা মোবাইল, ল্যাপটপ ও উচ্চক্ষমতার ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। রিমান্ডে এনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চক্রটির উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই চক্রের প্রথম ঘাঁটি ছিল খাগড়াছড়ির রামগড়। গত বছরের ১৪ নভেম্বর পুলিশ ও বিটিআরসির যৌথ অভিযানে রামগড় পৌরসভার একটি বাসা থেকে দুই চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় অত্যাধুনিক ভিওআইপি নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম। পুলিশ জানায়, ওই বাসাটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে অবস্থিত ছিল, যা বিষয়টিকে আরও স্পর্শকাতর করে তোলে।
রামগড় থানার তৎকালীন ওসি মুহাম্মদ মঈন উদ্দীন জানান, চীনা নাগরিকরা এর আগে চট্টগ্রামের উত্তর খুলশীতে অবস্থান করছিলেন এবং পরে স্থানীয় সহযোগীর মাধ্যমে রামগড়ে গিয়ে সার্ভার স্থাপনের কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, ভারতীয় মোবাইল নেটওয়ার্কও সেখানে সক্রিয় ছিল, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে- বাংলাদেশ ও ভারতের নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করেই কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা ছিল।
এ ধরনের সিমবক্স ও ভিওআইপি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য বা সিডিআর সংরক্ষিত না থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে অপরাধ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
খাগড়াছড়ির ঘটনার পর কক্সবাজারে একই ধরনের আরেকটি চক্রের সন্ধান পায় পুলিশ। গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে শহরের কলাতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয় চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় ১,৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ ও বিভিন্ন যোগাযোগ সরঞ্জাম। এ ঘটনায় রামু থানায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত করছে সিআইডি।
সবশেষ গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী এলাকার একটি সাততলা ভবনে অভিযান চালিয়ে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে পাঁচজন চীনের নাগরিক এবং বাকিরা পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের। এ ঘটনার তদন্ত করছে সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।
তদন্তকারীরা জানান, খুলশী এলাকার জাকির হোসেন রোডের একটি চীনা পণ্যের দোকান ছিল এই চক্রের মূল যোগাযোগ কেন্দ্র। এখান থেকেই বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে স্থানীয় দোভাষী ও সহযোগীদের সংযোগ স্থাপন করা হতো। খুলশীর ঘটনায় মহসিন ও রাকিব নামে দুই স্থানীয় ব্যক্তি বাসা ভাড়া ও চুক্তির কাজে সহযোগিতা করেন। মহসিন ইতোমধ্যে একটি মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
পুলিশ বলছে, তিনটি ঘটনার মধ্যে সুস্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে এবং দেশজুড়ে আরও এমন নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে। চক্রটির আন্তর্জাতিক সংযোগ, বিস্তার ও প্রকৃত উদ্দেশ্য উদঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তথ্যসূত্র: আগামীর সময় ও পাহাড় সমুদ্র।