
ডেস্ক রিপোর্ট:- ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণবিধিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ২০১৬ সালের বিধিমালা রহিত করে নতুন বিধিমালায় নির্বাচনি প্রচারে পোস্টার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর বিপরীতে নির্দিষ্ট শর্তে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার, ভোটারের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ, মাইক্রোফোনের শব্দের মাত্রা, সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের প্রচারে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনে প্রার্থিতা বাতিলের মতো বিষয়ে নতুন বা বিস্তৃত বিধান যুক্ত হয়েছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন ‘ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করে। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ধারা ২০-এর উপধারা (১)-এ দেওয়া ক্ষমতাবলে নতুন বিধিমালা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০১৬ সালের ‘ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা’ রহিত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আইন তালিকাতেও ২০১৬ ও ২০২৬ সালের দুটি বিধিমালা পৃথকভাবে উল্লেখ রয়েছে।
পোস্টার বাদ, বিলবোর্ডে নতুন সুযোগ
২০১৬ সালের বিধিমালার ৮ বিধিতে নির্বাচনি প্রচারসামগ্রীর ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত বিধান ছিল। সেখানে পোস্টার, লিফলেট ও হ্যান্ডবিলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হলেও পোস্টারকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। এমনকি ৮(৫) উপবিধিতে প্রার্থীর নিজের ছবি ও প্রতীক ব্যবহারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীর ক্ষেত্রে দলীয় প্রধানের ছবি পোস্টার বা লিফলেটে ব্যবহারের সুযোগ ছিল।
নতুন বিধিমালার ৯ বিধির (ক) উপবিধিতে সরাসরি বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দল কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করতে পারবে না। অর্থাৎ আগের বিধিমালার নিয়ন্ত্রিত পোস্টার ব্যবহারের জায়গায় এবার সরাসরি নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
অন্যদিকে নতুন বিধিমালার ২৬ বিধিতে প্রথমবারের মতো বিলবোর্ড ব্যবহারের জন্য পৃথক কাঠামো দেওয়া হয়েছে। বিলবোর্ডের প্রচার অংশের আয়তন সর্বোচ্চ ১৬ ফুট × ৯ ফুট হতে পারবে। একজন প্রার্থী ওয়ার্ডপ্রতি একটির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না। বিলবোর্ড এমনভাবে স্থাপন করা যাবে না, যাতে জনসাধারণের চলাচল বা যানবাহনে বিঘ্ন ঘটে কিংবা পরিবেশের ক্ষতি বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।
প্রচারসামগ্রীর ধরনেও পরিবর্তন
নতুন বিধিমালার ৯ বিধিতে পোস্টার বাদ দিয়ে ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন সাদা-কালো হতে হবে। ব্যানারের সর্বোচ্চ আয়তন ১০ ফুট × ৪ ফুট, লিফলেট ও হ্যান্ডবিল এ-ফোর আকারের এবং ফেস্টুনের আয়তন সর্বোচ্চ ১৮ ইঞ্চি × ২৪ ইঞ্চি রাখা হয়েছে। প্রচারসামগ্রীর প্রতীক ও নিজের ছবি ছাড়া অন্য কোনও ব্যক্তির ছবি বা প্রতীক ব্যবহার করা যাবে না। প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি হতে পারবে না।
এ ছাড়া মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা ও মুদ্রণের তারিখবিহীন ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন ব্যবহার করা যাবে না। পলিথিনের আবরণ ও প্লাস্টিকের পিপিসি ব্যানার ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল প্রচার এবার সরাসরি বিধিমালায়
নতুন বিধিমালার ৬ বিধি ২০১৬ সালের বিধিমালার তুলনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন সংযোজনগুলোর একটি। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারের নিয়ম নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
প্রচার শুরু করার আগে প্রার্থী, তার নির্বাচনি এজেন্ট বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ শনাক্তকরণ তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দিতে হবে। একই বিধিতে নির্বাচনি প্রচারে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঘৃণামূলক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারও চেহারা বিকৃত করা এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত বানোয়াট বা ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারও নিষিদ্ধ।
এআই দিয়ে চরিত্রহননেও নিষেধাজ্ঞা
নতুন ৬ বিধির (গ) ও (ঘ) উপবিধিতে এআই ব্যবহার করে ভুয়া, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনও প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন কিংবা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি, প্রকাশ, প্রচার বা শেয়ার করা যাবে না।
২০১৬ সালের বিধিমালায় যে প্রচারব্যবস্থা মূলত পোস্টার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, মিছিল, সভা ও প্রচলিত গণমাধ্যমকেন্দ্রিক ছিল, নতুন বিধিমালায় সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল কনটেন্ট ও এআই-ভিত্তিক প্রচারের জন্য আলাদা বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
ভোটারের জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ নিষিদ্ধ
নতুন বিধিমালার ১৯ বিধির (ঙ) উপবিধিতে ভোটার বা তার পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের লেনদেনের উদ্দেশ্যে ভোটারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে ভোটারকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য বা আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
ভোটার স্লিপে নতুন সীমা
নতুন ১০ বিধিতে ভোটার স্লিপ ব্যবহারে নির্দিষ্ট সীমা দেওয়া হয়েছে। কোনও ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে ভোটার স্লিপ বিতরণ করা যাবে না। ভোটার স্লিপের আকার পাঁচ ইঞ্চি × তিন ইঞ্চির বেশি হতে পারবে না। একই সঙ্গে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা, সংখ্যা ও তারিখবিহীন ভোটার স্লিপ মুদ্রণ করা যাবে না।
প্রতীক ব্যবহারে জীবন্ত প্রাণী নিষিদ্ধ
নতুন বিধিমালার ১১ বিধিতে নির্বাচনি প্রচারে প্রতীক হিসেবে জীবন্ত প্রাণী ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০১৬ সালের বিধিমালার প্রচারসামগ্রীকেন্দ্রিক বিধানের তুলনায় এটি নতুন ধরনের একটি নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা।
মিছিল ও শোডাউনে নিয়ন্ত্রণ বহাল
নতুন বিধিমালার ১২ বিধিতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিলের সময় মিছিল বা শোডাউন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে কোনও ধরনের মিছিল বা শোডাউনও করা যাবে না। অর্থাৎ আগের বিধিমালার বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ নতুন বিধিমালাতেও বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচজনের অধিক সদস্য নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন না।
নির্বাচনি ক্যাম্প ও অফিসে নতুন সীমা
নতুন ১৩ বিধিতে নির্বাচনি এলাকায় প্রার্থীর ক্যাম্প বা অফিস স্থাপনের ওপর বিধিনিষেধ নির্ধারণ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান প্রার্থীর জন্য সর্বোচ্চ তিনটি, সংরক্ষিত আসনের সদস্য প্রার্থীর জন্য একটি এবং সাধারণ আসনের সদস্য প্রার্থীর জন্য একটি নির্বাচনি ক্যাম্প বা অফিস স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব ক্যাম্প বা অফিসে টেলিভিশন, ভিসিআর, সিডি, ডিভিডি, এলইডি ডিসপ্লে, প্রজেক্টর ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না।
নির্বাচনি প্রচারে যানবাহনে নতুন বিধিনিষেধ
নতুন ১৪ বিধিতে মিছিল বা শোডাউনের জন্য ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান, ট্রেন বা অন্য কোনো যানবাহন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি প্রচারে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযানও ব্যবহার করা যাবে না।
তবে নির্বাচনের প্রচার শেষ হওয়ার পর প্রচারসামগ্রী বহনের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে যানবাহন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। ১৫ বিধিতে ভোটের দিন ভোটার আনা-নেওয়ার জন্য প্রার্থীর পক্ষে যানবাহন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী বা অক্ষম ব্যক্তির ক্ষেত্রে কমিশন বা রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে যানবাহন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
দেয়াল লিখনেও সরাসরি নিষেধাজ্ঞা
নতুন বিধিমালার ১৬ বিধিতে কোনও রং, কালি, চুন বা রাসায়নিক দিয়ে দেয়াল বা যানবাহনে লিখন, মুদ্রণ, ছাপচিত্র বা চিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
গেট, তোরণ ও আলোকসজ্জায় সীমা
নতুন বিধিমালার ১৭ বিধিতে নির্বাচনি প্রচারের জন্য গেট, তোরণ বা বের নির্মাণ করে চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনও প্রার্থী ৩৫০ বর্গফুটের বেশি জায়গা নিয়ে প্যান্ডেল বা ক্যাম্প তৈরি করতে পারবেন না। প্রচারের অংশ হিসেবে বিদ্যুতের সাহায্যে আলোকসজ্জাও করা যাবে না।
খাদ্য, উপঢৌকন ও অর্থ ব্যয়ে নিষেধাজ্ঞা আরও স্পষ্ট
নতুন বিধিমালার ১৮ বিধিতে নির্বাচনি প্রচারের সময় প্রার্থীর ছবি, প্রচারমূলক বক্তব্য বা প্রতীকসংবলিত শার্ট, জ্যাকেট, ফতুয়া ইত্যাদি ব্যবহার করে প্রচার চালানোর বিধান রাখা হয়েছে। তবে নির্বাচনি ক্যাম্পে ভোটারদের কোনও ধরনের পানীয় বা খাদ্য পরিবেশন এবং উপঢৌকন, বকশিশ ইত্যাদি দেওয়া নিষিদ্ধ।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় অনুভূতির ব্যবহার নিষিদ্ধ
নতুন ১৯ বিধিতে ব্যক্তিগত কুৎসা, অশালীন বা আক্রমণাত্মক বক্তব্যের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মসজিদ, মন্দির, ক্যাথলিক প্যাগোডা, গির্জা বা অন্য ধর্মীয় উপাসনালয় এবং সরকারি অফিস বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনি প্রচার চালানো যাবে না। নাগরিকের জমি, ভবন বা সম্পত্তির ক্ষতিসাধন কিংবা জনসাধারণের চলাচলে গোলযোগ বা উচ্ছৃঙ্খল আচরণের মাধ্যমেও প্রচার করা যাবে না।
মাইকের শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেল
নতুন ২১ বিধিতে একটি ওয়ার্ডে নির্বাচনি প্রচারের কাজে একটির বেশি মাইক্রোফোন বা শব্দের মাত্রা বর্ধনকারী যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। দুপুর ১২টার আগে এবং সূর্যাস্তের পর মাইক ব্যবহার করা যাবে না। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রচারে ব্যবহৃত মাইকের শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে।
অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রচারে আরও বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা
নতুন ২২ বিধিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সরকারি কর্মসূচির সঙ্গেও নির্বাচনি কর্মসূচি বা কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া যাবে না।
এ ছাড়া কোনও প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনও ব্যক্তি নির্বাচনি এলাকায় সরকারি যানবাহন, সরকারি প্রচারযন্ত্র বা অন্য সরকারি সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন না। স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিও প্রার্থী ছাড়া নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে হস্তক্ষেপ বন্ধে নতুন বিধান
নতুন ২৩ বিধিতে নির্বাচনের আগে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচিতে কর্তৃত্ব করা বা এ-সংক্রান্ত সভায় যোগ দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ২৫ বিধিতে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব বা উন্নয়ন তহবিলভুক্ত প্রকল্পের অনুমোদন, ঘোষণা, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা ফলক উন্মোচন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনুকূলে অনুদান ঘোষণা বা বরাদ্দ দেওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদেও প্রার্থীর অংশগ্রহণে বাধা
নতুন ২৪ বিধিতে কোনো প্রার্থী নির্বাচনের আগে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি বা সদস্য হিসেবে নির্বাচিত বা মনোনীত থাকলেও ওই প্রতিষ্ঠানের সভায় সভাপতিত্ব বা অংশগ্রহণ করতে পারবেন না কিংবা প্রতিষ্ঠানের কোনো কাজে যুক্ত থাকতে পারবেন না।
নির্বাচনি বয়সসীমা লঙ্ঘনেও নিষেধাজ্ঞা
নতুন ২৭ বিধিতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্ধারিত নির্বাচনি বয়সসীমা অতিক্রম করতে পারবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারণা চালানো ব্যক্তিদেরও নির্ধারিত বয়সসীমার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে আরও নির্দিষ্ট বিধান
নতুন ২৯ বিধিতে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের অধিকার কারা পাবেন তা স্পষ্ট করা হয়েছে। নির্বাচন কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, নির্বাচনি এজেন্ট, পোলিং এজেন্ট, নির্বাচনি পর্যবেক্ষক, কমিশন অনুমোদিত ব্যক্তি এবং ভোটাররা প্রবেশ করতে পারবেন।
তবে পোলিং এজেন্ট বা কোনো ভোটার প্রার্থীর পক্ষে প্রচারমূলক বক্তব্য, প্রতীকসংবলিত শার্ট, জ্যাকেট, ফতুয়া, ক্যাপ, ব্যাজ বা এ ধরনের প্রচারসামগ্রী বহন করে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না।
আচরণবিধি ভাঙলে প্রার্থিতা বাতিলের স্পষ্ট ক্ষমতা
নতুন বিধিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনগুলোর একটি ৩২ বিধি। এতে বলা হয়েছে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে কমিশনের কাছে প্রতিবেদন আসার পর কমিশন যদি সন্তুষ্ট হয় যে কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট বিধিমালা লঙ্ঘন করেছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করেছেন এবং এর জন্য তিনি চেয়ারম্যান বা সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হতে পারেন, তাহলে কমিশন লিখিত আদেশ দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে। অর্থাৎ শুধু কারাদণ্ড বা জরিমানার মধ্যে শাস্তি সীমিত না রেখে নতুন বিধিমালায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা হারানোর সরাসরি বিধান রাখা হয়েছে।
শাস্তি অপরিবর্তিত, কিন্তু প্রার্থিতা বাতিলের বিধান আলাদা
নতুন ৩১ বিধিতে আচরণবিধি লঙ্ঘনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে রেখে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি ৩২ বিধিতে কমিশনের মাধ্যমে প্রার্থিতা বাতিলের পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
২০১৬ সালের বিধিমালা পুরোপুরি রহিত
নতুন ৩৩ বিধিতে ‘ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১৬’ রহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো বিধিমালার অধীনে সম্পন্ন কোনো কার্যক্রম নতুন বিধিমালার অধীনে করা হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং কোনো মামলা বা কার্যধারা চলমান থাকলে তা এমনভাবে নিষ্পন্ন হবে, যেন পুরোনো বিধিমালা রহিত হয়নি।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সঙ্গে সম্পর্ক
নতুন বিধিমালার ২(১৯) বিধিতে ‘রাজনৈতিক দল’-এর সংজ্ঞা দিতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর আর্টিকেল ২-এর ক্লজ (এক্সআইএক্সএ)-এর ‘রেজিস্টার্ড পলিটিক্যাল পার্টি’-কে অনুসরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ এখানে সংজ্ঞার সূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে; এই গেজেটের মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের কোনো আর্টিকেল সংশোধন করা হয়নি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
নতুন বিধিমালার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন শুধু প্রচারের উপকরণ বদল নয়। ২০১৬ সালের বিধিমালায় মূলত প্রচলিত নির্বাচনি প্রচার—পোস্টার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, সভা, মিছিল, সরকারি সুবিধা ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর ছিল। নতুন বিধিমালায় সেই কাঠামোর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এআই, ডিজিটাল কনটেন্ট, ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্য, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, বিলবোর্ড এবং শব্দদূষণ যুক্ত হয়েছে।
একই সঙ্গে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কমিশনের হাতে প্রার্থিতা বাতিলের স্পষ্ট ক্ষমতা রাখা হয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালের বিধিমালাটি ২০১৬ সালের বিধিমালার শুধু সংশোধিত সংস্করণ নয়; বরং স্থানীয় নির্বাচনের প্রচার ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল যুগের নতুন বাস্তবতাকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন কাঠামো তৈরি করেছে। ৩৩ বিধিতে পুরোনো বিধিমালা রহিত করে নতুন বিধিমালা কার্যকর করা হয়েছে।