
বান্দরবান:- পাহাড়ের ঢালে ভোরের কুয়াশা, চারদিকে সবুজের সমারোহ। এরই মাঝে পাহাড়ের বুক চিরে জেগে ওঠে জুমের চাষিদের স্বর্ণালী ধানক্ষেত। পাহাড়ে জুমের মাঝজুড়ে এখন সোনালি ফলনে হাসি ফুটেছে জুমচাষিদের মুখে। পাহাড়ের ঢালে ঢালে জুমের মাঠে এখন সোনালি ধানের সমারোহ। দীর্ঘ পরিশ্রম ও প্রতীক্ষার পর পাকা ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জুম চাষিরা। স্বর্ণালী ফসল ঘরে তোলার আনন্দে তাদের মুখে ফুটেছে তৃপ্তি ও স্বস্তির হাসি।
জুমের ধান শুধু খাদ্যের জোগান নয়-পাহাড়ি মানুষের জীবন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই ফসল কাটার এই মৌসুমে পাহাড়জুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে জুম চাষি মংক্যপ্রু মারমা ও মাথুইপ্রু মারমা বলেন, আমাদের কিছু নাই, পূর্বে পুরুষের যে রকম জুম চাষের ছিলেন সে রকমই আছি। আমরা পড়ালেখা করিনি অর্থাভাবে। তবে ছেলে ও মেয়েদের পড়ালেখা করাতে চেষ্টা করছি।
প্রতি বছর জুম চাষ শুরু থেকে আগাছা পরিষ্কার, পাহাড়ি ঢালে বীজ বোনা আর প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে ফসল ঘরে তোলার পর্যন্ত কষ্ট করে যাচ্ছে। এটি শুধু একটি কৃষিপদ্ধতি নয়, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন।
এলাকার ঘুরে দেখা গেছে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনো বহু পরিবার জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা আসার আগেই পাহাড়ের উপযুক্ত ঢাল বেছে নিয়ে শুরু হয় জুমের প্রস্তুতি। পাহাড়ের গাছপালা ও আগাছা পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট সময় পর তা শুকিয়ে নেওয়া হয়। পরে শুকনো গাছপালায় আগুন দিয়ে জমি প্রস্তুত করা হয়। সেই জমিতেই একসঙ্গে বোনা হয় ধান, ভুট্টা, মরিচ, তিল, ঢেঁড়স, শিম, কুমড়া, হলুদ, আদাসহ নানা ধরনের ফসল।
জুম চাষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো একই জমিতে একই সময়ে বিভিন্ন ফসলের চাষ। ফলে একটি ফসলের ফলন কম হলেও অন্য ফসল কৃষকের ঘাটতি পূরণ করতে পারে। পাহাড়ের দুর্গম আধুনিক কৃষি উপকরণের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জুম চাষ বহু পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসছে।
জুমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড়ি মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনও। জুমের জমি নির্বাচন থেকে শুরু করে জমি পরিষ্কার, বীজ বপন ও ফসল সংগ্রহ—প্রতিটি ধাপেই পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশী ও স্বজনদের অংশগ্রহণ দেখা যায়। ফলে জুম চাষ হয়ে ওঠে পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের এক অনন্য মাধ্যম।
তবে সময়ের পরিবর্তনে জুম চাষ নানা সংকটের মুখোমুখি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, চাষযোগ্য জমির সংকট, বনভূমির পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারজাতকরণ সমস্যার কারণে অনেক জুমচাষি আগের মতো লাভবান হতে পারছেন না। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে গিয়েও তাদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
জুমচাষিদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, কৃষি প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে জুম চাষ আরও সমৃদ্ধ হবে।