
রাঙ্গামাটি:- রাঙ্গামাটিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার সেন্টারে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি-পদায়নকে ঘিরে প্রশাসনিক এখতিয়ার, দাপ্তরিক প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখের একটি বদলি-পদায়নসংক্রান্ত প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি-পদায়নের প্রস্তাব পাঠানো হয়। এর পর ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে সংশ্লিষ্টদের বদলি-পদায়নের একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—বিভাগীয় পর্যায়ে বদলি-পদায়নের প্রস্তাবের নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া চলমান থাকার সময় জেলা পরিষদ কী প্রক্রিয়ায় এবং কোন প্রশাসনিক এখতিয়ারের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
যাদের বদলি-পদায়ন
জেলা পরিষদের ১০ আগস্টের অফিস আদেশ অনুযায়ী, হর্টিকালচার সেন্টার, আসামবস্তী, রাঙ্গামাটিতে কর্মরত মো. কামাল হোসেনকে উপজেলা কৃষি অফিস, লংগদুতে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
এ ছাড়া হর্টিকালচার সেন্টার, নানিয়ারচরে কর্মরত সিহানুক চাকমাকে হর্টিকালচার সেন্টার, বালুখালী এবং বালুখালীতে কর্মরত সুমন চাকমাকে হর্টিকালচার সেন্টার, আসামবস্তীতে বদলি-পদায়ন করা হয়েছে। আদেশে সংশ্লিষ্টদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে অনসন্ধান করে জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জেলা পরিষদের নিকট ন্যাস্ত হলেও নিয়োগ,বদলী,পদায়ন শুধুমাত্র তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। দশম গ্রেড বা তদুর্ধ কর্মকর্তাদের নিয়োগ,বদলী,পদপরিবর্তনের ক্ষমতা অধিদপ্তরের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট ন্যাস্ত। তাই আলোচিত দশম গ্রেডভূক্ত ২য় শ্রেণির কর্মকর্তাদের বদলীযোগে পদায়নের বিষয়টি জেলা পরিষদের এখতয়ার বহির্ভুত কি-না তা’ও খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে।
মূল প্রশ্ন প্রশাসনিক এখতিয়ার নিয়ে
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাধীন কর্মকর্তাদের বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রে হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক এবং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রশাসনিক এখতিয়ার কতটুকু?
কোন আইন, বিধি, সরকারি আদেশ কিংবা ক্ষমতা অর্পণের ভিত্তিতে জেলা পরিষদ এ ধরনের বদলি-পদায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাংগঠনিক কাঠামোর আওতাধীন হওয়ায় তাঁদের বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, মতামত বা সমন্বয় ছিল কি না—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আরও প্রশ্ন হলো, ২০ জুলাইয়ের প্রস্তাব পাঠানোর পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, অনুমোদন বা মতামত পাওয়ার আগেই ১০ আগস্ট জেলা পরিষদ থেকে চূড়ান্ত বদলি-পদায়নের আদেশ জারি করা হলো কি না।
দুই দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় হয়েছিল কি?
১০ আগস্টের অফিস আদেশের অনুলিপি কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সংশ্লিষ্ট পরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক, উপপরিচালকসহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
এ কারণে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—আদেশ জারির আগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জেলা পরিষদের আনুষ্ঠানিক সমন্বয়, মতবিনিময়, অনুমোদন বা সম্মতি নেওয়া হয়েছিল কি না।
জেলা পরিষদের কাছে বদলি-পদায়নের বিষয়ে কোনো সুপারিশ বা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল কি না, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না এবং কোন আইন বা বিধির আওতায় ১০ আগস্টের আদেশ জারি করা হয়েছে—এসব বিষয় নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ নথি যাচাই
ঘটনাটি নিয়ে কোনো পক্ষকে দায়ী করার আগে ২০ জুলাইয়ের মূল পত্র, দাপ্তরিক প্রেরণপথ, সংশ্লিষ্ট নথির নোটশিট, পরবর্তী পত্রাচার এবং ১০ আগস্টের অফিস আদেশ পর্যালোচনা করা জরুরি।
কারণ, শুধু একটি অফিস আদেশ দেখেই পুরো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কোন কর্তৃপক্ষ কখন কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্তের আইনগত ও প্রশাসনিক ভিত্তি কী—তা নথি যাচাইয়ের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
স্বাক্ষর নিয়েও প্রশ্ন
এদিকে অফিস আদেশটির ভাষা ও উপস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরের নিচে ‘মাননীয়’ শব্দ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে দাপ্তরিক শুদ্ধতা ও প্রচলিত সরকারি নথির রীতিনীতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আদেশটি ভুয়া বা অবৈধ—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মূল নথি ও আদেশের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক বিভ্রান্তি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং বদলি-পদায়নের পূর্ণাঙ্গ নথি যাচাই এখন সময়ের দাবি।