বিশ্ব জুড়ে হুমকিতে জ্বালানি অর্থনীতি,হামলার নিশানায় তেল স্থাপনা

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬
  • ৪৮ দেখা হয়েছে

ডেস্ক রির্পোট:- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে তেল অবকাঠামো এখন সরাসরি যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েকদিনে ইরানের তেল সংরক্ষণাগার ও পরিশোধনাগার লক্ষ্য করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র একাধিক হামলা চালিয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তেহরান। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ইরানের তেল শোধানাগারে হামলার পরই বিশ্ব তেল অর্থনীতিতে আগুন জ্বলে উঠেছে।

যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে ভ্রূক্ষেপ করছেন না। তার ভাষ্য, তেলের বাজারের চলমান অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদি হবে না। তবে বিশ্লেকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও কিছুদিন স্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার মুখে পড়তে পারে। এ ছাড়া ইরানে হামলার জেরে বিশ্ব তেল শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। এতে যেই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে তা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি-সংকট তৈরি করতে পারে। আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো- ক্রমাগত হামলার জেরে উপসাগরীয় দেশগুলো তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরব সতর্ক করেছে তাদের তেল স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকলে তেল উৎপাদন তলানিতে পৌঁছাবে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী তেহরান ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও তেল অবকাঠামোয় হামলা চালায়। এতে একাধিক স্থাপনায় আগুন ধরে যায় এবং ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায় রাজধানীর আকাশ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিস্ফোরণের পর দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকে এবং বিষাক্ত ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে এসব হামলার জবাবে ইরানও আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। বাহরাইনের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত একটি বড় তেল পরিশোধনাগারে ড্রোন হামলার পর সেটি ‘ফোর্স মেজর’ বা অনিবার্য কারণবশত কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে উৎপাদন ও সরবরাহে চরম বিঘ্ন ঘটেছে। হামলায় স্থাপনার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

একই সময় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র ও রিফাইনারিও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলা প্রতিহত করলেও নিরাপত্তা উদ্বেগে কয়েকটি স্থাপনায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের বৃহৎ তেল উৎপাদন কেন্দ্র আরামকো দুটি কেন্দ্র বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা সংঘাতকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাত শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতির নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই এসব স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এতে তেলভিত্তিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এদিকে তেল স্থাপনায় এভাবে হামলা ও পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকায় আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ালো: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জেরে বিশ্ব জ্বালানির বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে প্রথম ঘটনা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের দাম রোববার একপর্যায়ে ৩০ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৯ ডলারে পৌঁছায়। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকেই বাজারে এই তীব্র মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। এর আগে সর্বশেষ ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সময় তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বৃটিশ দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির জোট গ্রুপ অব সেভেন বা জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি বৈঠক করার ঘোষণা দিয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হয়ে গেলে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য সাময়িক এই মূল্যবৃদ্ধি খুবই সামান্য মূল্য। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটও ট্রাম্পের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন। তিনি সিবিএস নিউজের এক অনুষ্ঠানে বলেন, পেট্রোল পাম্পে জ্বালানির দাম বাড়লেও তা ‘স্থায়ী’ হবে না।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত তেল উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি সমুদ্রের বুকে থমকে আছে। সংঘাতের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হচ্ছে। যার মধ্যে কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েত-এর বিভিন্ন তেল স্থাপনাও রয়েছে।

অন্যদিকে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো শনিবার ইসরাইল ইরানের তেল অবকাঠামোয় বিমান হামলা চালায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, হামলায় তেহরান ও আলবোরজ প্রদেশে চারটি তেল সংরক্ষণাগার এবং একটি তেলপণ্য স্থানান্তর কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এর জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে। তাদের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই খেলা চালিয়ে গেলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

শেয়ারবাজারে ক্রমাগত পতন: জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও। সোমবার এশিয়ার বাজারে বড় ধরনের পতন দেখা যায়। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৫ শতাংশের বেশি কমে বন্ধ হয়েছে। আর দক্ষিণ কোরিয়ার কেওএসপিআই সূচক প্রায় ৬ শতাংশ পড়ে যায়। হংকংয়ের হ্যায় সেং ইন্ডেক্সও নিম্নমুখী ছিল। ইউরোপেও বাজারে পতনের ধারা দেখা গেছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ ও ফ্রাঙ্কফুর্টের ড্যাক্স (ডিএএক্স) সূচক যথাক্রমে প্রায় ২ ও ৩ শতাংশ কমে লেনদেন শুরু করে। একই সঙ্গে ওয়াল স্ট্রিটের এসএন্ডপি ৫০০ ও নাসদাক কম্পোসাইট সূচকের ফিউচারেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম টানা ১০ শতাংশ বাড়লে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.৪ শতাংশ বাড়ে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.১৫ শতাংশ কমে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জোন্সট্রেডিংয়ের প্রধান বাজার কৌশলবিদ মাইক রৌরকি বলেন, যদি এই ধাক্কা স্বল্পমেয়াদি হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে তেলের দাম কয়েক সপ্তাহ এভাবে উচ্চ পর্যায়ে থাকলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত অব্যাহত থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলের সব জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। তার মতে, পরিস্থিতি অবনতির দিকে গেলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions