দেশজুড়ে আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের জাল

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ দেখা হয়েছে

► নেপথ্যে ছয় দেশের নাগরিক, বেশির ভাগই চীনা ও নাইজেরীয় ► ডিজিটাল মুদ্রায় গ্রহণ ক্রিপ্টোতে পাচার সহযোগিতায় দেশি এজেন্ট
ডেস্ক রির্পোট:- আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেটগুলোর কাছে বাংলাদেশ এখন হটজোন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সাইবার সিন্ডিকেটগুলো বাংলাদেশকে অপারেশন হাব হিসেবে বেছে নিয়েছে। এ ছাড়া অনলাইন ক্যাসিনো, আবাসন ব্যবসার নামে বিনিয়োগ ফাঁদ, ব্যাংকের এটিএম বুথে জালিয়াতি, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অপ্রচলিত মাদকের কারবার, অস্ত্র পাচার, জাল মুদ্রা তৈরি, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, অ্যাপের মাধ্যমে উচ্চসুদে ঋণ দেওয়ার নামে ব্ল্যাকমেল, অনলাইনে বন্ধুত্ব গড়ে দামি উপহার পাঠানো, খুনাখুনি, ক্লোন ওয়েবসাইট বানিয়ে প্রতারণা, নকল মোবাইল ফোন তৈরি, সোনা চোরাচালান ও মানব পাচারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে একের পর এক নাম আসছে বিদেশি নাগরিকের। গ্রেপ্তারও হচ্ছেন অনেকে। তাদের মধ্যে অনেকে জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধেও জড়াচ্ছেন। অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে অনেক বিদেশি বছরের পর বছর অবৈধভাবে বসবাস করলেও থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছেন, ছয় দেশের সাইবার স্পেসের ট্রান্সন্যাশন সিন্ডিকেটগুলোর সদস্যরা পর্যটক ভিসায় এসে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের মতো শহরগুলোর অভিজাত ফ্ল্যাটে গড়ে তুলেছেন অনলাইন ক্যাসিনো ও স্ক্যামিংয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড। বেনামি সিম, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ফাঁকফোকর আর ক্রিপ্টোকারেন্সির ডার্ক চ্যানেল ব্যবহার করে বিদেশি সাইবার মাফিয়ারা প্রতিদিন পাচার করছেন কোটি কোটি টাকা; আর তাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন এ দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বেকার তরুণ ও নিঃসঙ্গ বয়স্করাও।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক, অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘বিদেশিদের এ তৎপরতা প্রতিহত করতে প্রযুক্তিগত উন্নতিসাধন এবং বাংলাদেশে অবস্থানকারী অবৈধ বিদেশিদের আইনের আওতায় আনার বিকল্প নেই।’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান, সহকারী অধ্যাপক মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিংয়ের বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট সক্রিয়। প্রতারণার মাধ্যমে এমএফএসে আসা অর্থ তারা খুব দ্রুত স্থানীয় এজেন্টদের সাহায্যে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে। দেশে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে সরকারের নজরদারি থাকলেও এই “শ্যাডো ইকোনমি” বিদেশিদের অর্থ পাচারের আদর্শ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে শুধু রাজধানী ঢাকা থেকেই বিভিন্ন অপরাধে জড়িত অর্ধশত চায়নিজ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সবশেষ বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম মহানগরের খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার একটি বাড়ি থেকে আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের ৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে ৪ শতাধিক বিদেশি বন্দি রয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই ব্যবসা, ভ্রমণ, শিক্ষার্থী ও খেলোয়াড় ভিসায় বাংলাদেশে এসেছিলেন। আরও জানা গেছে, চীন ও কম্বোডিয়া সরকার অনলাইন জুয়া এবং স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণ করে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। এ দুই দেশের ধারাবাহিকতায় ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম সরকারও অনলাইন জুয়া এবং স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। ফলে এ চার দেশের সাইবার স্পেসে সক্রিয় ট্রান্সন্যাশনাল সিন্ডিকেটগুলো তাদের অপারেশনাল হাব পরিবর্তন করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। তারা বাংলাদেশের ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, এমএফএস (মোবাইল ব্যাংকিং) সেবার ব্যাপক বিস্তার এবং সাইবার-আর্থিক অপরাধ দমনে প্রাতিষ্ঠানিক ও ফরেনসিক দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে সাইবার অপরাধের নতুন হাব হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেটসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ও অভিজাত এলাকায় তারা গড়ে তুলছে অনলাইন ক্যাসিনো এবং স্ক্যামিংয়ের সাবস্টেশন। এসব সাবস্টেশনের মূল সার্ভার ও ওয়েবসাইট রাশিয়া, মাল্টা, সাইপ্রাস এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে হোস্ট করা হয়। জানা গেছে, অনেকে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে আসেন, পরে অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে এসব অনলাইন ক্যাসিনো গড়ে তোলেন। এ ক্ষেত্রে তারা ডার্ক ওয়েব বা নির্দিষ্ট প্রোভাইডারের কাছ থেকে ‘হোয়াইট-লেবেল’ রেডিমেড ক্যাসিনো সফটওয়্যার কিনে নেন। অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনার পাশাপাশি তারা অনলাইন প্রতারণার সঙ্গেও যুক্ত। প্রতারণার ক্ষেত্রে তারা মূলত তৈরি পোশাক খাতের মাঝারি ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার এবং চট্টগ্রামভিত্তিক আমদানি-রপ্তানিকারকদের ‘বিজনেস ইমেইল কমপ্রোামাইজ’ এবং ভুয়া বিনিয়োগ স্কিমের নামে টার্গেট করেন। এ ছাড়া ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট এবং বিদেশে আকর্ষণীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বেকার তরুণদেরও ফাঁদে ফেলা হয়।

জানা গেছে, প্রতারক চক্রের সদস্যরা টার্গেট ব্যক্তিদের সঙ্গে হোয়াটস অ্যাপ, টেলিগ্রামসহ অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যমে কিছুদিন কথা বলেন। নিজেদের অভিজাত জীবনযাপন প্রদর্শন করে এবং ভুয়া ছবি বা ভিডিও কলের মাধ্যমে তাদের ওপর একটি মানসিক নির্ভরতা তৈরি করেন। শেষ পর্যন্ত এ ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হন বহু মানুষ। এ ছাড়া ফিশিং লিঙ্ক পাঠিয়ে ব্যবহারকারীর মোবাইল ও আইডির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, মোবাইল ব্যাংকিং থেকে অর্থ সরিয়ে ফেলা এবং সমাজমাধ্যমের আইডি হ্যাক করে ব্ল্যাকমেলিংয়ের মাধ্যমে টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। লেনদেনের ক্ষেত্রে সামান্য কমিশনের বিনিময়ে এরা স্থানীয় বাংলাদেশি এজেন্টদের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করেন। টাকা জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা একাধিক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে অর্থের মূল উৎস গোপন করা হয়। পরে ওই টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে পাচার করা হয়।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্মকমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘বিদেশিদের প্রতারণার জাল সব সময় ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনিটরিং বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রেপ্তার হচ্ছে বেশি। এজন্য মনে হচ্ছে বিদেশিরা বেশি প্রতারণা করছে। তবে সাইবার মাধ্যমে যারাই প্রতারণা বা অন্য কোনো অপরাধ করছে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। বিদেশি সাইবার অপরাধীদের মধ্যে চায়নিজ ও নাইজেরিয়ানের সংখ্যা বেশি। অনেকে বিদেশে বসে দেশি এজেন্ট দিয়ে এ কাজ করছে। যারা বাংলাদেশে বসে অপরাধ করছে, তথ্য পেলেই আমরা অভিযান পরিচালনা করছি।’

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘অবৈধভাবে অবস্থান, অপরাধে সম্পৃক্ততা কিংবা অপরাধ করে দেশত্যাগের চেষ্টা-এসব ক্ষেত্রে গোয়েন্দা নজরদারি, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান ও আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীর জাতীয়তা বিবেচ্য নয়; অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় তাকে আনা হবে।’

সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার শামীম হোসেন বলেন, ‘কয়েকটি দেশের নাগরিক নিয়ে গঠিত চক্র চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতারণার জাল বিছিয়েছে। প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে প্রতারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে কক্সবাজারে গ্রেপ্তার চক্রটি স্টারলিংক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া ও বিভিন্ন কারেন্সি-সংক্রান্ত প্রতারণায় জড়িত ছিল। তাদের পাসপোর্ট ব্লক করে দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে তারা দেশত্যাগ করতে পারেনি। জব্দ করা আইফোন, ল্যাপটপ এবং অন্যান্য ডিভাইস পরীক্ষা করে এগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হতো তা জানার চেষ্টা চলছে। জব্দ ডিভাইস পরীক্ষানিরীক্ষার পর চক্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।’

কারা অধিদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মাসুদ হাসান জুয়েল বলেন, ‘কারাগারে থাকা বিদেশি বন্দিদের মধ্যে চায়নিজ, আফ্রিকান ও ভারতীয়র সংখ্যাই বেশি। বিদেশি বন্দিদের নিরাপত্তার স্বার্থে আলাদা রাখা হয় এবং যে জেলায় গ্রেপ্তার হয় সেই জেলার কারাগারে রাখা হয়। খাবারের বেলায়ও বিদেশি বন্দিদের নিজ নিজ দেশের সঙ্গে মিল রাখার চেষ্টা করা হয়। যেসব বিদেশি বন্দির আইনজীবী নিয়োগের সক্ষমতা থাকে না, তাদের সরকারিভাবে আইনজীবীর ব্যবস্থা করা হয়।’বাংলাদেশ প্রতিদিন

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions