
ডেস্ক রির্পোট:- মিয়ানমারের চলমান মানবাধিকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এ পাঠানোর জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক।আদিবাসী শিল্প আবিষ্কার
গত সোমবার জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান।
টুর্ক বলেন, মিয়ানমারের মানবাধিকার সংকট এখন “সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়” হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর ভয়াবহ প্রভাব পুরো অঞ্চলে দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তার কাছে সামরিক সরঞ্জাম ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য (dual-use items) সরবরাহ বন্ধ করারও আহ্বান জানান তিনি। এসব সরঞ্জাম মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনে ব্যবহৃত হওয়ার সুস্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেন জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান।
রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এনে ভলকার টুর্ক বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই “পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের” অভিযোগ রয়েছে।
নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রচেষ্টাকে তিনি আন্তর্জাতিক আইনের ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতির “স্পষ্ট লঙ্ঘন” হিসেবে উল্লেখ করেন। এই নীতির আওতায় কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যায় না, যেখানে তার ওপর নিপীড়ন বা গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আর্জেন্টিনার একটি আদালত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মিয়ানমারের সামরিক ও বেসামরিক পর্যায়ের ২৫ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তাদের মধ্যে মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংও রয়েছেন।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে। সামরিক সরকার বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কাছ থেকে হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখলে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্সের (AAPP) তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে সামরিক সরকারের হাতে ৮ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। একই সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া ৩১ হাজার ৮৮৭ জনের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি এখনও আটক রয়েছেন।
এদিকে, ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (NUG) বিলুপ্ত মানবাধিকার মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, অভ্যুত্থানের পর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত মিয়ানমারজুড়ে সামরিক বাহিনী ১৪ হাজারের বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ৬ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে স্কুল, ধর্মীয় স্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে মিয়ানমারবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা (IIMM)-এর প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, দেশটিতে ‘ডাবল ট্যাপ’ বিমান হামলার ঘটনাও বেড়েছে। এ ধরনের হামলায় প্রথম হামলার পর আহতদের উদ্ধার করতে ছুটে আসা স্বেচ্ছাসেবক, উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে দ্বিতীয়বার হামলা চালানো হয়।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ক্রমেই বিমান হামলার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং এসব হামলায় বেসামরিক মানুষই “প্রধান শিকার” হচ্ছেন। একই সঙ্গে প্যারামোটর ও ড্রোনের ব্যবহার বাড়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে আগাম হামলা শনাক্ত করে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।
সোমবার সন্ধ্যায় সাগাইং অঞ্চলের ইয়ে-উ টাউনশিপে কোনো স্থল সংঘর্ষ না থাকা অবস্থায় তিনটি সামরিক গাইরোকপ্টার ও একটি যুদ্ধবিমান একটি গ্রামে বোমা হামলা চালায়। এতে অন্তত সাতজন গ্রামবাসী নিহত হন।
এর আগে ২১ আগস্ট সাগাইং অঞ্চলের মিয়াউং টাউনশিপে একটি ধর্মীয় স্থানে ধ্যানের অনুষ্ঠানের সময় সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় ১৫ জন গ্রামবাসী নিহত হন। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন বয়স্ক ব্যক্তি।
IIMM-এর প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে মিয়ানমারের পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে।” তার ভাষায়, গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ আরও বেশি ঘনঘন এবং আরও তীব্রভাবে সংঘটিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংঘাতের কারণে গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত মিয়ানমারে ৪০ লাখের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) জানিয়েছে, দেশটিতে ১ কোটি ২৪ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসংকটে রয়েছেন এবং তাদের জীবন রক্ষায় তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রয়োজন।
২০১৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা IIMM মিয়ানমারে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করে আসছে।
সংস্থাটি ইতোমধ্যে ১ হাজার ৬০০টির বেশি উৎস থেকে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমের ভিডিও ফুটেজ এবং ৭৫০ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য। এসব প্রমাণ রোহিঙ্গাসহ ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে বিভিন্ন বিচারিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানের আইসিসিতে মিয়ানমারের পরিস্থিতি পাঠানোর আহ্বানের মধ্য দিয়ে দেশটির চলমান সংঘাত, বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের আন্তর্জাতিক জবাবদিহির দাবি আরও জোরালো হলো।