
ডেস্ক রির্পোট:- বাবা-মায়ের সঙ্গে পুরান ঢাকার লালবাগে থাকত সাত বছরের শিশু জোনায়েদ হাসান সকাল। ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি বিকালে বাসাসংলগ্ন খান মোহাম্মদ মসজিদের সামনে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলা করছিল সে। এ সময় লাল শার্ট পরা এক ব্যক্তি তাকে মোবাইলে গেমস খেলার কথা বলে সঙ্গে নিয়ে যায়। সিসি ক্যামেরা ফুটেজে রিকশায় করে সকালকে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও ফুটেজও প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায়, লাল শার্টের ব্যক্তি একটি রিকশায় যাচ্ছেন। পাশের অপর একটি রিকশায় দুই ব্যক্তির মাঝে বসিয়ে সকালকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এ ঘটনায় সকালের পাগলপ্রায় বাবা-মা ওইদিনই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর একে একে কেটে গেছে আটটি বছর। জিডি করার পর অসংখ্যবার থানায় গেছেন সকালের মা মুক্তা আক্তার ও বাবা ইসমাইল হাসান রাজন। এখনো বিভিন্ন জায়গায় দেয়ালজুড়ে পোস্টার লাগিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্নভাবে করে যাচ্ছেন ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোতে প্রচারণা। কিন্তু সকালের খোঁজ মেলেনি আজও। সকাল বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছে তা-ও জানে না কেউ। বেঁচে থাকলে নয়নের মণি সন্তান দেখতে কেমন হয়েছেন- তা দেখার প্রতীক্ষায় আছেন বাবা-মা।
খুলনার কয়রার ঘুঘরাকাটি এলাকার মো. শাহ আলম ও মোছা. বিলকিছ পারভীনের মেয়ে মো. সামিরা খাতুন (৫)। গত বছরের ২৬ আগস্ট ঘুঘরাকাটি বাজারে চাচার চায়ের দোকানে যায়। বিকালে বিলকিছ পারভীন ওই বাজারে গিয়ে মেয়ে সামিরাকে দেখতে পেয়ে বাড়ি চলে যেতে বলেন। নিজের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে দেখেন সামিরা নেই। মাইকিং থেকে শুরু করে খোঁজ পেতে সবকিছুই করেন। কিন্তু সামিরাকে আর পাওয়া যায়নি। নিখোঁজের পরের দিন কয়রা থানায় জিডি (নম্বর-১১৪৫) করেন। এতেও কোনো ফল মেলেনি।
শুধু সকাল আর সামিরাই নয়- সারা দেশে প্রতি মাসে শিশু নিখোঁজের হাজারো ঘটনা ঘটছে। তাদের সন্ধান পেতে ভিটেমাটি বিক্রি করে নিঃস্ব হচ্ছে অনেক পরিবার। এদিকে সারা দেশে দায়ের হওয়া শিশু নিখোঁজ জিডির কিছু শিশুর সন্ধান মিললেও হদিস মিলছে না অনেকেরই। তাদের শেষ পরিণতি কী হয়েছে, বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে, নাকি কোনো পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে অন্য কোনো দেশে বিক্রি হয়ে গেছে- এসব প্রশ্নেরও কোনো সুরাহা হয়নি।
তবে সম্প্রতি সময়ে শিশু নিখোঁজের বিষয়টি উদ্বেগ ছড়ানোয় নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সারা দেশে সব থানায় কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। নিখোঁজ জিডি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঠিক কতজন শিশু নিখোঁজ রয়েছে- তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই পুলিশের কাছে। তবে গত ৭ মাসে নিখোঁজদের মধ্যে ২ হাজার ৩৮ শিশুর হদিস মিলছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ সদও দপ্তর। শুধু এই ৭ মাসের হিসাবেই শিশুদের ভয়ংকর এই পরিণতির ইঙ্গিত মিলেছে।
সক্রিয় আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র : গতবছরের ২৩ মে গাজীপুরের টঙ্গী এরশাদনগর এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হয় আলিফ নামে সাড়ে ৪ বছরের শিশু। ৫ দিন পর ঝিনাইদহ থেকে উদ্ধার হয় আলিফ। এ ঘটনায় তাহমিনা, আলামিন ও কালাম নামে ৩ জন গ্রেপ্তার হয়। তাহমিনা বোরখা পড়ে আলিফকে অপহরণ করেছিল। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, আলিফকে ভারতে পাচার করা হচ্ছিল। এরই মধ্যে বিক্রির সব প্রস্তুতি সম্পন্নও করে ফেলেছিল। কিন্তু অল্পের জন্য সেটি হয়নি। ২০২২ সালে বাবা-মায়ের ঝগড়া করে বাড়ি থেকে চলে যান নোয়াখালী সদরের কালাদরাপ ইউনিয়নের উত্তর শুল্লুকিয়া গ্রামের পলি। তখন সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। পরিবারের প্রতি রাগকে কাজে লাগিয়ে তাকে আমিরাতে পাচার করে একটি চক্র। পরে তাকে দেশে ফেরত আনে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।
শুধু আলিফ ও পলি নয়- নিখোঁজ অনেক শিশুকেই ভারত ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি পাচারের শিকার ২৮ শিশুকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করে ভারত সরকার। গত ১৩ মে ভারত সরকারের মাধ্যমে ফেরত আসে ২০ শিশু। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক ও ব্র্যাক ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের প্রধান শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৬৩০ জন শিশু পাচারের তথ্য আমরা পেয়েছি।
চাইল্ড পর্নোগ্রাফি বিস্তারে অপহরণ ঝুঁকি বাড়ছে : পথশিশুদের দিয়ে পর্নোগ্রাফি বানানো অভিযোগে ২০২৪ সালে গ্রেপ্তার হন আন্তর্জাতিক শিশু পর্নোগ্রাফি চক্রের সদস্য শিশুসাহিত্যিক টিআই এম ফখরুজ্জামান ওরফে টিপু কিবরিয়া। একই অভিযোগে ২০১৪ সালে গ্রেপ্তার হয়ে ৭ বছর জেল খেটেছিলেন তিনি। তার কাছে ইতালি, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানিসহ অনেক দেশের গ্রাহকদের ২৫ হাজার শিশু পর্নোগ্রাফির ছবি ও ১ হাজার ভিডিও পাঠানোর তথ্য পায় সিটিটিসি। কিবরিয়া শুধু পথশিশুদের টার্গেট করলেও আন্তর্জাতিক চক্র অন্য শিশুদেরও টার্গেট করছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। একাধিক সূত্র বলছে, ডার্ক ওয়েবে শিশু পর্নোগ্রাফির চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। এজন্য শিশুদের পাচারের উদ্দেশ্যে টার্গেট করছে চক্র।
মুন এলার্টে বাড়ছে নিখোঁজের অভিযোগ : নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে কাজ করা মুন অ্যালার্টের (মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন) প্রতিষ্ঠাতা সাদাত রহমান বলেন, ‘বৈশ্বিকভাবে অপরাধী চক্রের কাছে শিশুদের চাহিদা বাড়ছে। এতে করে নিঃসন্দেহে শিশু পাচার বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ থাকলে বাড্ডায় ছেলে ধরা গুজবে রেনু নামে নারীর মতো আর কারও প্রাণহানিও ঘটবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইন্টারপোলের বিভিন্ন এলার্ট আছে। যেমন দাগি আসামিদের ক্ষেত্রে রেড এলার্ট সম্পর্কে আমরা পরিচিত। কিন্তু শিশু পাচার ঠেকাতে ইয়োলো এলার্ট আমরা দেখি না। অন্যদেশ ঠিকই ইয়োলো এলার্ট ব্যবহার করছে। এজন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা দরকার। তাহলে শিশু পাচার ও সন্ধানে আরও সুবিধা হবে।’ সাদাত রহমান আরও জানান, গত ৬ মাসে তারা ১ হাজার ১৪৮ অভিযোগ পান। যার মধ্যে ৬৩০টি আমলে নেওয়ার মতো ছিল। সেগুলো ভেরিফিকেশন করে ১৫৬ শিশুর সন্ধান চেয়ে অ্যালার্ট দেওয়া হয়। মুন এলার্টে দিনদিন অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানান তিনি।
শেল্ডার হাউসে ঠাঁই হয় অনেক শিশুর : গত বুধবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আরিয়ান নামে ৭ বছরের এক ছেলে শিশুর সন্ধান চায় ডিএমপির ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার। বিজ্ঞপ্তিতে ছবি যুক্ত করে জানানো হয়, গত ১ সেপ্টেম্বর মেরুল বাড্ডা বৌদ্ধমন্দির এলাকায় একা বসে থাকতে দেখে পথচারীরা তাকে বাড্ডা থানা পুলিশের নিকট নিয়ে আসে। বিজ্ঞপ্তি দেখে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শিশুটির বাবা দুলু মিয়া ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে গিয়ে ছেলেকে বুঝে নেন। আরিয়ান ঘরে ফিরলেও অনেক শিশুই আর ঘরে ফিরতে পারে না। এর প্রধান কারণ ঠিকমতো ঠিকানা বলতে না পারা বা যে ঠিকানা বলে সেখানে কাউকে না পাওয়া। এ বিষয়ে ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের ডিসি মোছা. লিজা বেগম বলেন, নিখোঁজ কোনো শিশু উদ্ধারের পর আমাদের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে আসলে পরিচয় শনাক্তে বা পরিবারে ফিরিয়ে দিতে সব ধরনের আইনগত চেষ্টা করা হয়। এর পরও পরিচয় পাওয়া না গেলে আদালতের নির্দেশে বিভিন্ন শেল্টার হাউসে পাঠানো হয়। বর্তমানে ঢাকার বিশ্বস্ত কিছু শেল্টার হাউসে এমন শিশু আসে। নিয়মিতই আমরা ওই শিশুদের খোঁজ নিয়ে থাকি।
নারী ও শিশু ডেস্কের তৎপরতা বাড়াতে হবে : অপরাধ বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, যেসব শিশু নিখোঁজ হয়- তাদের অনেকেই অপহরণের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শিশু পাচারকারী চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে। অনেক শিশুকে পর্নোগ্রাফি তৈরি, অঙ্গপ্রতঙ্গ বিক্রি, মাদক পাচারকারী হিসেবে ব্যবহার অথবা গ্যাং সদস্য হিসেবে গড়ে তুলতে কেনা নেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে পরিবারের অসচেতনতা ও পুলিশের গাফিলতিও আছে। তবে বেশির ভাগ পরিবার এমন সময়ে অভিযোগ করতে যান, যখন আর পুলিশের কিছু করার থাকে না, এটাও সত্য। কারণ পাচার চক্র ৪-৫ ঘণ্টার মধ্যে নিজেদের বলয়ের এলাকায় চলে যায়। এজন্য শিশু নিখোঁজ হলে নিজে না খুঁজে আগে পুলিশকে জানাতে হবে। প্রতি থানায় নারী ও শিশু ডেস্ক রয়েছে। এই ডেস্ককে আরও তৎপর ও কার্যকর করতে হবে। যাতে কোনো অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের থানার সমন্বয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
থানাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের নির্দেশ : পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, শিশু নিখোঁজের বিষয়টি উদ্বেগ ছড়ানোর পর জরুরি মিটিং ডেকে সব থানায় কঠোর বার্তা পাঠানো হয়েছে। যেসব শিশু নিখোঁজ জিডি নিষ্পত্তি হয়নি- সেগুলো সম্পর্কে নতুন করে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে। সব থানার আপডেট তথ্য তৈরি হলে সঠিক পরিসংখ্যান সামনে আসবে। তবে জিডির পরিসংখ্যান দেখে যতটা উদ্বেগ ছড়িয়েছে বাস্তব চিত্র তেমন নয়। তিনি আরও বলেন, নিখোঁজ জিডি হলে সেটি গুরুত্বসহকারে তদন্তের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, শিশু নিখোঁজের বিষয়ে ২০২৩ সালে ১৭ হাজার ৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪ এবং গত বছর ২২ হাজার ৫৫টি জিডি হয়েছে সারা দেশে। চলতি বছরের ৭ মাসসহ ৪৩ মাসে ৭২ হাজার ৪৮৯টি শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিদিন