
শামসুল আলম,রাঙ্গামাটি—-দুর্গম পাহাড়ি জনপদের এক মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থমকে যেতে বসেছিল শুধুমাত্র ৭ হাজার টাকার অভাবে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে হারাতে দেননি কেউ—মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। তার হস্তক্ষেপে রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার ইশিকা চাকমা এখন নিশ্চিন্তে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সরেজমিনে বরকল উপজেলায় গিয়ে মন্ত্রী শুধু একজন শিক্ষার্থীর দায়িত্বই নেননি, বরং সামগ্রিকভাবে দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তার এই উপস্থিতি ও সহায়তা পুরো এলাকায় এক মানবিক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুর্গমতার সাথে লড়াই করা এক শিক্ষার্থীর গল্প
ইশিকা চাকমা, বরকল উপজেলার জুনো পাহাড় উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্রী। তার বাড়ি ভূষণছড়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত জারুলছড়ি এলাকায়—যেখানে পৌঁছাতে নৌপথই প্রধান ভরসা। পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দৈনন্দিন জীবনের খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয় পরিবারটিকে।
এসএসসি পরীক্ষার ফি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলে প্রয়োজন ছিল প্রায় ৭ হাজার টাকা। এই অর্থ জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত ইশিকা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয়—সে এবারের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। একটি স্বপ্ন তখন নিভে যাওয়ার অপেক্ষায়।
সংবাদ পেয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপ
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেন মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। তিনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইশিকার পরীক্ষার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার গ্রহণের ঘোষণা দেন। তার নির্দেশনায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং ইশিকার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।
মাঠে নেমে সহায়তা—শুধু কথায় নয়, কাজে
ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে মন্ত্রী নিজেই বরকল উপজেলায় যান। উপজেলা সদরে আবাসিক এলাকায় অবস্থানরত ইশিকার হাতে সরাসরি নগদ অর্থ তুলে দেন। শুধু তা-ই নয়, তার ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবন নিয়েও দায়িত্বশীল আশ্বাস দেন।
মন্ত্রী বলেন,
“একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন অর্থের অভাবে থেমে যেতে পারে না। ইশিকার পড়াশোনার পথে কোনো বাধা এলে আমি ব্যক্তিগতভাবে পাশে থাকব।”
অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জন্যও সহায়তা
বরকল উপজেলার ভৌগোলিক বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে নৌপথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রী উপজেলার তিনটি এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের জন্য নৌযান ভাড়া বাবদ নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করেন।
এই অর্থ সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ও নিয়মিতভাবে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। এতে করে অনেক দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের চাপ লাঘব হয়েছে।
প্রশাসনের প্রতি কঠোর নির্দেশনা
মন্ত্রী এ সময় বরকল উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের স্পষ্ট নির্দেশ দেন—
ভবিষ্যতে যেন কোনো শিক্ষার্থী অর্থাভাবে পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। এমন ঘটনা ঘটার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং জরুরি প্রয়োজনে তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার আহ্বান জানান।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকরা এই উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষা অর্জন নিজেই একটি সংগ্রাম। সেখানে আর্থিক সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এমন সময়ে একজন মন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
মানবিক বার্তা
এই ঘটনা শুধু একটি সহায়তার গল্প নয়—এটি একটি বার্তা। শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব আছে—বরকলের এই উদ্যোগ যেন তারই বাস্তব প্রতিফলন।
দুর্গম পাহাড়ের অন্তরালে থাকা ইশিকার মতো অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্বপ্ন আজ নতুন করে ডানা মেলেছে—একটি ছোট সহায়তা, একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়ে উঠেছে।