
নুরুল আলম:- রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের অধীনে সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া বিভিন্ন পদের নিয়োগে চরম সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের স্পষ্ট প্রমাণ সামনে এসেছে। একটি স্বাধীন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে যেখানে মেধা, যোগ্যতা এবং সমতার ভিত্তিতে নিয়োগ হওয়ার কথা, সেখানে কোটা মেইনটেইনের নামে প্রকাশ্য বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত নিয়োগপত্রসমূহ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিভিন্ন স্মারকের মাধ্যমে মোট ৫১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই নিয়োগে একটি নির্দিষ্ট অনুপাত বজায় রেখে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে স্পষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
তথ্য বলছে, ০৫.৪২.৮৪০০.২০৩.১৪.০০১.২৬-২৭৯ নম্বর স্মারকে পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে ৯ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৫ জন বাঙালি। ০৫.৪২.৮৪০০.২০৩.১৪.০০১.২৬-২৭৬ নম্বর স্মারকে ১৮ জন অফিস সহায়ক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৪ জন বাঙালি। ০৫.৪২.৮৪০০.২০৩.১৪.০০১.২৬-২৭৮ নম্বর স্মারকে ১৪ জন অফিস সহায়ক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৬ জন বাঙালি। ০৫.৪২.৮৪০০.২০৩.১৪.০০১.২৬-২৮০ নম্বর স্মারকে ৯ জন নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ২ জন বাঙালি। এছাড়া একই ধারাবাহিকতায় একজন বেহারার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি বাঙালি।
মোট ৫১ জন নিয়োগের মধ্যে মাত্র ১৭ জন বাঙালি। অর্থাৎ ৩৩ শতাংশ। বাকি ৬৬ শতাংশ উপজাতি। এই হিসাব কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে কোটা মেইনটেইন করার স্পষ্ট প্রমাণ।
প্রশ্ন হচ্ছে, কোন আইনের বলে জেলা প্রশাসক এই কোটা মেইনটেইন করলেন? বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলা হয়েছে। ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে সকল নাগরিকের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অথচ এখানে প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ধরে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের অধীনে সম্পন্ন হওয়া নিয়োগে এ ধরনের বৈষম্য শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি সংবিধানের মৌলিক চেতনারও পরিপন্থী।
বিগত সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে জেলা পরিষদের কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছে বিভিন্ন সংগঠন ও সচেতন মানুষ। বিশেষ করে হস্তান্তরিত প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে বৈষম্যের অভিযোগ ওঠার পর কোটা বিরোধী ঐক্যজোট আন্দোলন, সংগ্রাম এবং হরতাল পর্যন্ত পালন করেছিল। তাদের অন্যতম দাবি ছিল, হস্তান্তরিত বিভাগের নিয়োগ প্রক্রিয়া জেলা প্রশাসকের অধীনে নেওয়া হোক যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, জেলা প্রশাসকের অধীনে হওয়া নিয়োগেই সাম্প্রদায়িক কোটা মেইনটেইন করে বৈষম্যের নতুন নজির তৈরি করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়ে গেছে, সমস্যা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং পুরো নিয়োগ কাঠামোতেই বৈষম্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শুধুমাত্র রোল নম্বর বা ক্রমিক নম্বর দিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে প্রার্থীদের পরিচয় গোপন থাকায় বৈষম্যের বিষয়টি সাধারণ মানুষের চোখে পড়েনি। যদি কোটা বিরোধী সচেতন মহল বিষয়টি খতিয়ে না দেখতো, তাহলে এই বৈষম্য আড়ালেই থেকে যেত।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছে। কিন্তু বারবার প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর থেকেই এই বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এটি শুধু বাঙালিদের জন্য নয়, বরং সমতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো সব মানুষের জন্য উদ্বেগজনক।
সরকারি চাকরি কোনো সম্প্রদায়ভিত্তিক ভাগাভাগির বিষয় নয়। এটি নাগরিকের অধিকার। মেধা, যোগ্যতা এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ না হলে প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়বে।
রাঙ্গামাটির এই নিয়োগ প্রক্রিয়া তাই শুধু একটি নিয়োগ নয়, এটি একটি বড় প্রশ্ন। প্রশাসন কি নিরপেক্ষ থাকবে, নাকি সাম্প্রদায়িক ভাগাভাগির পথে হাঁটবে।
সময় এসেছে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার। স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রকাশ করতে হবে। বৈষম্যের দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ সমতা চায়, বৈষম্য নয়। ন্যায়বিচার চায়, সাম্প্রদায়িক কোটা নয়। এখনই সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর।