খাগড়াছড়িতে রক্ত ঝরছেই, দেড় মাসে ৮ খুন

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৪
  • ১৯২ দেখা হয়েছে

খাগড়াছড়ি:- আজ থেকে ঠিক ৬ বছর ২ মাস ১০ দিন আগে বিভক্ত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিবিরোধী (শান্তিচুক্তি) অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। বিভক্তির পর থেকে ছোট-বড় সংঘাত লেগে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আগের চেয়ে বেশ প্রকট হয়েছে। পাহাড়ের প্রভাবশালী এই সংগঠনটির বিভক্ত দুই গ্রুপ মরিয়া হয়ে উঠেছে আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধে।

একের পর এক হামলা ও সংঘাতে জড়াচ্ছেন দুই পক্ষের নেতা-কর্মীরা। এর এক পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউপিডিএফের মূল প্রতিষ্ঠাতা প্রসিত বিকাশ খীসা এবং অন্য পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন তারই একসময়ের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা শ্যামল কান্তি চাকমা তরু। ইউপিডিএফের দুই পক্ষের ধারাবাহিক এই যুদ্ধে একদিকে যেমন নিজেদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, তেমনি অন্যদিকে আতঙ্ক বাড়ছে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের মনে। গত ছয় বছরে দুই পক্ষের অন্তত ৬৬ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রসিত গ্রুপের ৫৮ জন এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক গ্রুপের আটজনের প্রাণহানির কথা বলছেন দলের নেতারা।

গত দেড় মাসে বড় পরিসরে দুটি বন্দুকযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে জেলার দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ও সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নে। এ ছাড়া পানছড়ি, দীঘিনালা এবং মহালছড়ি উপজেলায় ব্রাশফায়ারে নিহত হয়েছেন অন্তত আটজন। তবে নিহতদের সবাই প্রসিত খীসার অনুসারী। চলমান সহিংসতায় এখন অবধি প্রতিপক্ষ ‘ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক’ দলের কারও মৃত্যু হয়নি।

সর্বশেষ গতকাল বুধবার (২৪ জানুয়ারি) খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা এবং রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম দূরছড়ি এলাকায় প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন প্রসিত খীসা গ্রুপের দুই সদস্য রবি কুমার চাকমা (৬৪) ও শান্ত চাকমা বিমল (৫৫)। এ ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন দলটির আরও এক সদস্য রহিন্তু চাকমা টিপন (৩২)।

এর আগে আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে ১৫ জানুয়ারি সকালে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের দেওয়ানপাড়া এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অন্তত পাঁচ শতাধিক রাউন্ড গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। তবে এতে অনেকে আহত হলেও নিহত হননি কেউই। এ ছাড়া গত বছরের ২০ ডিসেম্বর দুপুরে জেলার দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের ধনপাতাছড়া এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বন্দুকযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ওই যুদ্ধে প্রসিত গ্রুপের দুজন সশস্ত্র সদস্যের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও এলাকাটি অতি দুর্গম হওয়ায় কারও মরদেহ উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগে ১১ ডিসেম্বর পানছড়ি উপজেলায় সংঘটিত হয় আলোচিত ‘ফোর মার্ডার’। লোগাং ইউনিয়নের অনিলপাড়া এলাকায় প্রসিত খীসার অনুসারী বিপুল চাকমাসহ গুলি করে হত্যা করা হয় চারজনকে।

এসব ঘটনায় বরাবরের মতো প্রতিপক্ষ ‘ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক’ গ্রুপকে দায়ী করে আসছে ইউপিডিএফ প্রসিত খীসা গ্রুপ। তবে এসব হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার দায় স্বীকার করছে না ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক। নিজেদের বিভক্তির আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) বিভক্ত দুই গ্রুপ (সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পিসিজেএসএস ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বাধীন পিসিজেএসএস) ছিল ইউপিডিএফের প্রতিপক্ষ। তবে ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ইউপিডিএফের বিভক্তির খবর চাউর হওয়ার পর থেকে প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে নিজ দলের বিদ্রোহীরাই।

প্রসিত খীসার ইউপিডিএফের অন্যতম সংগঠক অংগ্য মারমা বলেন, ‘১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত আমাদের ৩৫৮ জন নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। যার মধ্যে ৩০০ জন খুন হয়েছেন সন্তু লারমার পিসিজেএসএসের হাতে আর বাকি ৫৮ জনকে হত্যা করেছে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক এবং পিসিজেএসএস সংস্কার গ্রুপ।’

এদিকে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক গ্রুপের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মিটন চাকমা বলেন, ‘এসব ঘটনায় আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বরং গত ছয় বছরে প্রসিত খীসা গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে আমাদের আটজন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ বুধবার (গতকাল) মহালছড়ি-নানিয়ারচর সীমান্তে যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেখানেও আমাদের মুভমেন্ট নেই। সেটি তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা। এসব হত্যাকাণ্ড প্রসিত গ্রুপের নিজেদের কোন্দল কিংবা অন্য কোনো কারণে ঘটে থাকতে পারে।’

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মুক্তা ধর বলেন, ‘পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত দীর্ঘ বছরের পুরোনো সংকট। আধিপত্য বিস্তারের জের এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই সহিংসতা ঘটছে এখানে। আর ঘটনাগুলোর বেশির ভাগই সংঘটিত হচ্ছে অরক্ষিত দুর্গম পাহাড়ি অরণ্যে। তবে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছে পুলিশ।’

এদিকে ইউপিডিএফের এই ধারাবাহিক যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে পুরো জেলায়। আতঙ্কে দিন পার করছেন খাগড়াছড়ির দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা। একের পর এক বর্জনের ঘোষণায় স্থবির হয়ে পড়ছে স্থানীয় হাট-বাজারগুলো। এতে লোকসানে পড়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ী, কৃষিজীবী ও তরুণ উদ্যোক্তারা। ফোর মার্ডার ইস্যুতে গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে চলমান রয়েছে টানা দুই মাসের পানছড়ি বাজার বর্জন কর্মসূচি। এ ছাড়া অজানা কারণে দুই মাস আগে থেকেই বাজারে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি ইউনিয়নের সাধারণ পাহাড়ি ও কৃষকরা। ফলে মাইসছড়ি বাজারেও ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিয়েছে। এ সংকট উত্তরণে সরকারের কার্যকরী উদ্যোগ চান পাহাড়ের খেটে খাওয়া মানুষরা।
খবরের কাগজ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.net
Website Design By Kidarkar It solutions