অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে কী দিয়েছে

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৭ দেখা হয়েছে

ফারহানা সুলতানা:- বাংলাদেশ সম্প্রতি একটি অসাধারণ কাজ করেছে। পর্যবেক্ষকদের ভাষায় গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে প্রথম প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। লাখো ভোটার হাজারো ভোটকেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন। অনেকেই ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো অর্থবহভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
এই নির্বাচন যে অনুষ্ঠিত হয়েছে, এটি এমনভাবে সম্পন্ন হয়েছে যাতে পর্যবেক্ষক ও নাগরিকরা একে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল বলে বর্ণনা করতে পারেন এবং এটি যে নির্ধারিত সময়েই হয়েছে- তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়।
এটি আঠারো মাসের কাজের ফল, যা একটি সংকটাপন্ন দেশকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অন্তর্বর্তী সরকার গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পথে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব পালন করে সম্পন্ন করেছে।
বাংলাদেশ যখন নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসন আঠারো মাসে কী অর্জন করেছে এবং কোথায় ঘাটতি ছিল- তা সৎভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বে বিপ্লবে এক হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এরপর ওই বছর ৫ই আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। এ সময় বাংলাদেশ কেবল সরকার পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; দেশ কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে ছিল।
পুলিশ অনেকাংশে দায়িত্ব পালন বন্ধ করে দিয়েছিল। একাধিক জেলায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক প্রভাবিত ঋণের কারণে ব্যাংকিং খাত অকার্যকর ঋণে জর্জরিত ছিল। বিচার বিভাগ, সিভিল সার্ভিস, নির্বাচন কমিশন ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো পনেরো বছর ধরে একদলীয় স্বার্থের অধীনস্থ হয়ে পড়েছিল।
ড. ইউনূস ও তার উপদেষ্টারা যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে গ্রহণ করেন, তা কোনো সচল প্রশাসনিক কাঠামো ছিল না; বরং ছিল পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয় এক প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসস্তূপ। এরপর শুরু হয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের একটি সময়কাল, যা অপূর্ণতা সত্ত্বেও স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। সংস্কার প্রক্রিয়াটি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ, গণমাধ্যম, শ্রম ও নারীর অধিকারসহ বিভিন্ন খাতে ১১টি কমিশন গঠন করা হয়। তাদের সুপারিশসমূহ সাত মাসব্যাপী জাতীয়ভাবে সম্প্রচারিত আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়। এর ফল ছিল জুলাই সনদ। এটি ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের একটি প্যাকেজ, যা প্রায় দুই ডজন দল সমর্থন করে।
শূন্য-সম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অভ্যস্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির দেশে এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বহুদলীয় আলোচনা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। নির্বাচনী অবকাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা হয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয় এবং প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য ডাকযোগে ভোটের ব্যবস্থা চালু করা হয়। প্রায় ৫০০ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিককে অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ও আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রতিনিধিরা।
নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬০ শতাংশের বেশি। গত তিনটি নির্বাচন ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পর এটি ছিল একটি গুণগত পরিবর্তন। অর্থনীতি ও কূটনীতিতেও অন্তর্বর্তী সরকার কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে, যদিও তা এখনও লক্ষ্যমাত্রার উপরে। বিনিময় হার সংস্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করতে সহায়তা করে।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ট্রাম্প প্রশাসন যখন ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, তখন সরকার আলোচনার মাধ্যমে তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে। পরে নির্বাচনের পূর্বে তা ১৯ শতাংশে নামানো হয় এবং নির্দিষ্ট টেক্সটাইল পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চীনের সঙ্গে ২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও সহায়তা চুক্তি হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রায় ১৩০টি আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। বাংলাদেশ জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করে। এক তদন্ত কমিশন ১৬ শতাধিক গুমের অভিযোগ নথিভুক্ত করে। জাতীয় বাজেট প্রথমবারের মতো সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
তবে এটি নিখুঁত রেকর্ড নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক ছিল। সাংবাদিকদের প্রতি আচরণ সমালোচিত হয়েছে। নারীরা অর্থনৈতিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংখ্যালঘু অধিকার ও যুব বেকারত্ব সমস্যা রয়ে গেছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সাধারণ মানুষের জীবনে তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনতে পারেনি।
তবুও গুরুত্বপূর্ণ হলো- এই সরকার নিজেকে একটি রূপান্তরমুখী ও মেরামতমূলক প্রশাসন হিসেবে দেখেলেও তারা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করেনি। ড. ইউনূস দায়িত্ব নেয়ার সময় তার বয়স ছিল ৮৪ বছর। ছাত্রনেতাদের আহ্বানে এই বয়সে এসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। তিনি নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন করেন এবং সরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নেন। যেখানে অনেক দেশে ক্ষমতাসীনরা সংকটকে ব্যবহার করে মেয়াদ বাড়ান, সেখানে নিজের বিকল্প তৈরি করে সরে দাঁড়ানো একটি বিরল ঘটনা।
এখন নির্বাচন শেষ। নতুন অধ্যায় শুরু। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও নাগরিকদের জবাবদিহিতার ওপর। জুলাই সনদ, সংস্কার কাঠামো, পুনর্গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা- এসব সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। তবে কাজ এখনও বাকি।
ড. ইউনূস ও তার দল একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করেছেন। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়েছেন। বহুদলীয় সংস্কার প্রক্রিয়া চালু করেছেন এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। তিনি নিখুঁত ছিলেন না। কিন্তু তার দিকনির্দেশ ছিল জবাবদিহিতা, ঐকমত্য ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দিকে।
বাংলাদেশ একটি মোড় ঘুরিয়েছে। এখন সামনে এগোনোর দায়িত্ব আমাদের সবার।

(লেখক দ্য ম্যাক্সওয়েল স্কুল অব সিটিজেনশিপ অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অব সিরাকাস ইউনিভার্সিটিতে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানের প্রফেসর। তার এ লেখাটি অনলাইন কাউন্টারপয়েন্ট থেকে অনুবাদ)

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions