শিরোনাম

পাহাড়ে শুরু হচ্ছে বৈসাবি উৎসব: বিঝু দিয়ে সূচনা, সাংগ্রাইয়ে সমাপ্তি—ভিন্ন নামে একই আনন্দ

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২৯ দেখা হয়েছে

শামসুল আলম,রাঙ্গামাটি:- পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে আবারও ফিরে এসেছে বর্ষবরণের উৎসবের আমেজ। আগামীকাল ১২ এপ্রিল চাকমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বিঝু উৎসবের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে ক্ষুদ্র নৃ জনগোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব—যা সামগ্রিকভাবে ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত। কয়েক দিনব্যাপী চলা এই উৎসব পর্ব শেষ হবে মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাইয়ের মাধ্যমে।
বৈসাবি শব্দটি এসেছে তিনটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর উৎসবের নামের প্রথম অক্ষর থেকে—বৈসু (ত্রিপুরা), সাংগ্রাই (মারমা) ও বিঝু (চাকমা)। তবে বাস্তবে এই উৎসব কেবল এই তিন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের বহু ক্ষুদ্র নৃ জনগোষ্ঠী নিজ নিজ নাম ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একই সময় বর্ষবিদায় ও নববর্ষকে বরণ করে নেয়।


উৎসবের সময় ও তাৎপর্য
চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখের প্রথম দিন—এই তিন দিনকে কেন্দ্র করে মূলত উৎসব পালিত হয়। এটি প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি কৃষিনির্ভর উৎসব। পুরনো বছরের দুঃখ-কষ্ট, গ্লানি ও অশুভকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও শুভতার প্রত্যাশায় বরণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উৎসবের মূল দর্শন হলো প্রকৃতির পুনর্জাগরণ ও মানবিক সম্পর্কের নবায়ন। পাহাড়ের মানুষ বিশ্বাস করে—প্রকৃতি যেমন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়, তেমনি মানুষও এই সময় নতুন আশা ও উদ্যমে জীবন শুরু করে।


চাকমাদের বিঝু: ঐতিহ্যের প্রাণ
চাকমা সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব বিঝু তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়—ফুল বিঝু, মূল বিঝু ও গজ্যাপজ্যা।
ফুল বিঝু: ভোরে তরুণ-তরুণীরা বন ও পাহাড় থেকে ফুল সংগ্রহ করে নদী বা ঝরনায় ভাসায়। দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়, যাতে নতুন বছর শুভ হয়।
মূল বিঝু: এদিন ঘরে ঘরে রান্না হয় ‘পাজন’—বহু ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী খাবার। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের আপ্যায়ন করা হয়।
গজ্যাপজ্যা: উৎসবের শেষ দিনে আত্মীয়তা ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার লক্ষ্যে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়।


ত্রিপুরাদের বৈসু: আচার ও নৃত্যের মেলবন্ধন
ত্রিপুরা সম্প্রদায় বৈসু উৎসব উদযাপন করে তিন ধাপে—হারি বৈসু, বৈসুমা ও আতাদাক।
এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো গরিয়া দেবের পূজা ও খেরবাই নৃত্য। গরিয়া দেবকে শস্য ও সমৃদ্ধির দেবতা হিসেবে মানা হয়। নারী-পুরুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাক—রিনাই ও রিসা পরে দলবদ্ধভাবে নাচে অংশ নেয়। খ্রাম (ঢোল) ও সুমু (বাঁশি) বাজনার তালে এই নৃত্য উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে।


মারমাদের সাংগ্রাই: জলকেলির উচ্ছ্বাস
মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ‘রি-সাংগ্রাই’ বা জলকেলি।
এই দিনে সবাই একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে পুরনো বছরের দুঃখ-কষ্ট ধুয়ে ফেলার প্রতীকী আচার পালন করে। এটি কেবল আনন্দের অংশ নয়, বরং শুদ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক।
সাংগ্রাইয়ের সঙ্গে থাইল্যান্ডের সংক্রান ও মিয়ানমারের থিংইয়ান উৎসবের সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে, যা বৌদ্ধ নববর্ষ উদযাপনের একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ঐতিহ্যের অংশ।
অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ
পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ জনগোষ্ঠী একই সময় বর্ষবরণ উৎসব পালন করে।
চাক, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খিয়াং, খুমি, বম, পাংখোয়া, লুসাই, খাসিয়া, মণিপুরি, সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, কোচ ও হাজংসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উৎসবের নাম ও আচার ভিন্ন হলেও মূল ভাবনা এক—প্রকৃতির নবজাগরণ ও নতুন বছরের আগমন।
সম্প্রীতি ও ঐক্যের বার্তা
এই উৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তঃসম্প্রদায় সম্প্রীতি। এক সম্প্রদায়ের মানুষ অন্য সম্প্রদায়ের উৎসবে অংশগ্রহণ করে, একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়।
এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়, বরং সামাজিক বন্ধন জোরদার করার এক অনন্য মাধ্যম।


প্রস্তুত পাহাড়ি জনপদ
রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ইতোমধ্যেই উৎসবের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। পাড়ায় পাড়ায় চলছে ঐতিহ্যবাহী পোশাক তৈরি, ঘরবাড়ি পরিষ্কার, পিঠাপুলি ও বিশেষ খাবার প্রস্তুত এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া।
তরুণ-তরুণীরা নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে উৎসবকে বরণ করতে প্রস্তুত। স্থানীয় বাজারগুলোতেও বেড়েছে কেনাকাটার ভিড়।
উৎসবের সারবত্তা
সব মিলিয়ে বৈসাবি উৎসব কেবল একটি বর্ষবরণ অনুষ্ঠান নয়—এটি পাহাড়ের মানুষের জীবনধারা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সম্মিলিত প্রতিফলন।
ভিন্ন নামে, ভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে উদযাপিত হলেও এই উৎসবের মূল সুর একটাই—আনন্দ, সম্প্রীতি ও নতুন সূচনার প্রত্যাশা।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions