মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩৫ দেখা হয়েছে

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাস হতে যাচ্ছে। জনগণ আপনাকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। মাত্র দুই মাস সময় আপনার সরকারকে মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু আপনি জানেন একটি সকাল গোটা দিনের পূর্বাভাস দেয়। সবকিছুর শুরুটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের সূচনা আশাজাগানিয়া। শুরুতেই আপনার কাজের প্রতি অখণ্ড মনোযোগ, বিভিন্ন বিষয়ে আপনার দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে আপনি কাজ করতে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রীর পদ একটি গুরুদায়িত্ব, শুধু ক্ষমতা উপভোগ নয়।

এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে আপনার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়েছে। দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে, মব সন্ত্রাসসহ নানান অসহিষ্ণুতায় সামাজিক জীবন বিপন্ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো না, চারদিকে ষড়যন্ত্র-এ রকম এক বাস্তবতার মধ্যে আপনার হাতে দেশের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল জনগণ। বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পরপরই ইরান যুদ্ধ গোটা বিশ্বকে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি আরও চ্যালেঞ্জিং। গত দুই মাসে এটা বোঝাতে পেরেছেন যে এ কঠিন চ্যালেঞ্জ আপনি গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব পালনে আপনি পিছপা হবেন না।

এ স্বল্প সময়ে আপনি বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, যা সবাইকে আশাবাদী করে তুলেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর আপনার সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত হলো, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশে তেলের দাম বাড়াননি। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ ছিল না। বিশেষ করে যখন দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো না। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলেই মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যেত উদ্বেগজনক হারে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ত হুহু করে। ব্যাংকঋণে সুদের হার বাড়ত। গোটা অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে যেত। মানুষের দুর্ভোগ পৌঁছে যেত চরমে। দেশজুড়ে হাহাকার সৃষ্টি হতো। এ ক্ষেত্রে আপনার সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা জানি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি না করার কারণে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। কিন্তু এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট সংকট। এখানে বিএনপি সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যখন জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করার সহজ সমাধানের পথে হাঁটছে, তখন বিএনপি সরকার সামষ্টিক অর্থনীতির কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আপনার সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশে মব সন্ত্রাস কমে এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মব সন্ত্রাস প্রতিহত করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। আশা করি জনগণ খুব শিগগিরই ইউনূস সরকারের সৃষ্ট এ মব সন্ত্রাসের ভয়াবহ ব?্যাধি থেকে মুক্তি পাবে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পথ অবরোধ সন্ত্রাসও কমেছে। ইউনূস সরকারের আমলে কথায় কথায় তুচ্ছ দাবি আদায়ের জন্য সড়ক অবরোধ করার এক নিকৃষ্ট সংস্কৃতি চালু হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রেই সরকার এ সড়ক অবরোধ প্রশ্রয় দিত। আপনার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই সড়ক বন্ধ করে দাবি আদায়ের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। ড. ইউনূস সরকারের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। দেড় শতাধিক শিশুর অকালমৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আশার কথা বিএনপি সরকার হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে টিকা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। হামের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপ জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

ড. ইউনূস সরকারের আমলে চাঁদাবাজি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল। চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষ। অতীতেও আমরা দেখেছি, যারা যখন ক্ষমতায় এসেছে তাদের ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজরা বেপরোয়া হয়ে উঠত। কিন্তু গত দুই মাসে চাঁদাবাজি কিছুটা হলেও কমেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় চাঁদাবাজি এখন দেখা যাচ্ছে না।

ইউনূস সরকার দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। বিএনপি সরকার সেখান থেকে শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেছে। শিক্ষামন্ত্রী অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি সংস্কৃতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন, যা ইতিবাচক।

আর এ কারণেই অনলাইনভিত্তিক ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিয়েও সরকার সেখান থেকে সরে আসে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এ রকম ধীরস্থির পদক্ষেপ জরুরি। দায়িত্বশীল সরকারের কাছ থেকে এটাই জনগণ প্রত্যাশা করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার বিষয়ে সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ঠিক সেভাবে হকার উচ্ছেদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ঢাকা মহানগরীসহ সব নগর-মহানগরে হকার থাকা বেমানান। কিন্তু হকার উচ্ছেদের আগে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে এভাবে উচ্ছেদ নতুন সংকট সৃষ্টি করবে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না।

ইউনূস সরকারের দেড় বছরে কয়েক লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ইউনূস সরকারের আমলে মব বাহিনীর অত্যাচারে বেসরকারি বিনিয়োগকারী, শিল্পপতি, ব্যবসায়ীরা হাত-পা গুটিয়ে ছিলেন। দেশে গত দেড় বছরে কোনো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। এ রকম একটি সময়ে এখনই হকার উচ্ছেদ কতটা জরুরি ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তা ছাড়া বিএনপি যখন তার নির্বাচনি ইশতেহারে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেছে, তখন বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে হকার উচ্ছেদ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না ভেবে দেখা দরকার। সরকার যেখানে ফ?্যামিলি কার্ডের মতো দারিদ্র্যমোচন কর্মসূচি সরকার গঠনের পরপরই বাস্তবায়ন শুরু করেছে, সেখানে এখনই এভাবে পরিকল্পনাহীন হকার উচ্ছেদ কতটা জরুরি ছিল?

বিএনপি সরকারকে তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। হকার উচ্ছেদের চেয়েও বেশি প্রয়োজন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বেসরকারি খাতকে সহায়তা দিতে হবে। ইউনূস সরকার বেসরকারি খাত ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছিল। মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন মামলা দায়ের করা হয়েছিল বড় বড় শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। অর্থ পাচারের কাল্পনিক অভিযোগ এনে ১১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্তের নামে হয়রানি করা হয়। কীসের ভিত্তিতে এই ১১ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এক-এগারোর অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করার লক্ষ্যেই ইউনূস সরকার বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে স্টিমরোলার চালিয়েছিল। এখন বিএনপি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বেসরকারি খাতকে আস্থায় নেওয়া। কে অতীতে কী করেছে, কে কার পক্ষে তা না খুঁজে কারা দেশের জন্য কতটা অবদান রাখতে পারে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিয়ে চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হবে। এটা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

শুধু ব্যবসায়ী নয়, ইউনূস সরকারের ১৮ মাসে অনেক নিরীহ মানুষের ব?্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে শুধু হয়রানির করার জন্য। এসব হয়রানি ও প্রতিহিংসা বন্ধ করতে হবে। ১৮ মাসে যে আতঙ্কের পরিবেশ দেশে তৈরি হয়েছিল, তা থেকে মুক্ত করতে হবে দেশকে।

সরকার দুই মাসের মধ্যেই এক-এগারো ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কিন্তু এক-এগারোর মূল কুশীলবরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাঁরা আগের চেয়েও শক্তিশালী। এক-এগারো ষড়যন্ত্রকারীদের দেখা গেছে ইউনূস সরকারের মধ্যেও। এঁরা নতুন সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে ষড়যন্ত্র করছে। সরকার যদি চোখ-কান খোলা রাখে তা হলেই দেখতে পারবে ২০০২ থেকে ২০০৬ সালে সুশীল সমাজের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দুটি সংবাদপত্র যেভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করেছিল, এখন আবার সেই একই রকম চেষ্টা শুরু করেছে। তাই গভীর সংকটে থাকা দেশ, বিরূপ বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং গণতন্ত্রবিরোধী অপশক্তির ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বিএনপিকে এগিয়ে যেতে হবে। দেশ পরিচালনায় তাই অনেক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নিজের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ব্যর্থ হলে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে।-অদিতি করিম : লেখক ও নাট্যকার

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions