
ডেস্ক রির্পোট:- মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যে চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগর অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ দেশের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে এই অঞ্চলে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ঝুঁকি
বিশ্ব জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। জ্বালানি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এই রুটে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং জ্বালানি পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এর মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ আসে কাতার থেকে।
অর্থনীতিতে তিনটি বড় ধাক্কা
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূলত তিনটি চ্যানেলের মাধ্যমে প্রভাব ফেলতে পারে—জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য, রেমিট্যান্স প্রবাহ।
বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা
সানেমের মতে, তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে তা সরাসরি বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়াবে। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়বে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্ট (জিটিএপি) মডেল ব্যবহার করে সম্ভাব্য পরিস্থিতির সিমুলেশন চালিয়েছে।
প্রবৃদ্ধি কমতে পারে, বাড়বে মূল্যস্ফীতি
সানেমের মডেল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যদি বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়—তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হলো—প্রকৃত জিডিপি কমতে পারে প্রায় ১.২ শতাংশ, রফতানি কমতে পারে প্রায় ২ শতাংশ, আমদানি কমতে পারে প্রায় ১.৫ শতাংশ, ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে প্রায় ৪ শতাংশ। এর ফলে মানুষের প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়।
শিল্প উৎপাদনে চাপ
জ্বালানি সংকটের ধাক্কা ইতোমধ্যে দেশের শিল্প খাতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে দেশের শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর ফলে তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, ইস্পাত ও ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী খাতে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্প খাতে সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে গবেষণায় দেখা গেছে— তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন কমতে পারে প্রায় ১.৫ শতাংশ, পরিবহন খাতে উৎপাদন কমতে পারে প্রায় ৩ শতাংশ, কৃষি উৎপাদন কমতে পারে প্রায় ১ শতাংশ এবং জ্বালানি-নির্ভর শিল্পে উৎপাদন কমতে পারে প্রায় ২.৫ শতাংশ। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘‘গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে রফতানি আদেশ বাস্তবায়নেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।’’
কাঁচামালের দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন শিল্প কাঁচামালের দাম দ্রুত বাড়ছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী— নন-কটন ফেব্রিকের দাম বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ, পলিয়েস্টার ফিলামেন্ট সুতা বেড়েছে ৭৯ শতাংশ, শিল্প রাসায়নিকের দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ১৮৩ শতাংশ, প্লাস্টিক রজনের দাম বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ, ক্লিংকারের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। উদ্যোক্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতার কারণে অনেক সরবরাহকারী এখন খুব স্বল্প সময়ের জন্য মূল্য কোটেশন দিচ্ছেন, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদন পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
বাড়ছে পরিবহন ব্যয়
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবহনেও প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে কনটেইনারপ্রতি পরিবহন ভাড়া ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে প্রতি কনটেইনারে ৫০০ থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাড়তে পারে দারিদ্র্য
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ (এপ্রিল ২০২৬) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে চলতি বছরে বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী—যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতো, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মাত্র ৫ লাখ মানুষের দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রা ও বাজেটে চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় বাড়তে পারে। যদি তেলের দাম ১২০ ডলারের বেশি থাকে, তাহলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার, যা বাজেট ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
তেলের দাম বাড়লে বাড়বে আমদানি ব্যয়
গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।’’
তার মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় বাড়তে পারে। আর যদি দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ১২০ ডলারের বেশি থাকে, তাহলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকার সমান। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার দীর্ঘদিন ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। একপর্যায়ে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করতে হবে, যা শিল্প উৎপাদনে নতুন চাপ তৈরি করবে।”
তার মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের শিল্প খাতে ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’-এর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এই খাতনির্ভর।
সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি পুরো অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, “জ্বালানি সরবরাহে অনিয়মিততা দেখা দিলে তা দ্রুত পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। এর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হয় এবং বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি দেখা দেয়।”
ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সতর্ক ও বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতি বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, সার উৎপাদন এবং রফতানিমুখী শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, “জ্বালানি সংকটের সময় শুধু সরবরাহ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও জ্বালানি নীতির সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, যাতে অর্থনীতির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হয়।”
কীভাবে সামলাবে বাংলাদেশ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের কৌশল প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা এবং শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিং।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি, গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ, শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মোট কৃষিজমির মাত্র ১ শতাংশ ব্যবহার করেই প্রায় ৫০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববাজারে জ্বালানি অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন, রফতানি, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু একটি সাময়িক সংকট নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তাই জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎসে বিনিয়োগ এবং দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অগ্রাধিকার।বাংলা ট্রিবিউন