
রাঙ্গামাটি:- পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংবাদিকতার পথিকৃৎ চারণ সাংবাদিক আলহাজ¦ একেএম মকছুদ আহমেদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণ সভা ও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জেলা পরিষদের এনেক্স ভবনে অনুষ্ঠিত স্মরণ সভায় বক্তারা বলেন, সাংবাদিক একেএম মকছুদ আহমেদ ছিলেন দলমত নির্বিশেষে সকলের কন্ঠস্বর। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মহান ব্যক্তিত্ব। তাঁর হাত ধরেই পাহাড়ে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার বিপ্লব ঘটেছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সুখ, দুঃখ, আনন্দ-বেদনার ইতিহাস তুলে ধরেছিলেন বিশ^বাসীর কাছে। তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি সাপ্তাহিক বনভূমি ও দৈনিক গিরিদর্পণ পার্বত্য চট্টগ্রামের অপার সম্ভাবনাকে বিশ^ দরবারে তুলে ধরে অত্রাঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সহ সামগ্রিক উন্নয়নে বৈপ্লবিক ভুমিকা রাখেন। বক্তারা এক বাক্যে বলেন, তাঁর সৃষ্টি দৈনিক গিরিদর্পণকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এছাড়াও পাহাড়ের অবিসংবাদিত এই গুনীজনকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভুষিত করার দাবি জানান।
এতে বক্তব্য রাখেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার, রাঙামাটি সদর সেনা জোন কমান্ডার লেঃ কর্নেল একরামুল রাহাত পিএসসি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ ইকবাল হোসেন, সাবেক সচিব কৃষ্ণ নন্দী চাকমা, জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এড. মামুনুর রশিদ মামুন, জেলা জামাতের সেক্রেটারী মনসুরুল হক, রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রবীন সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে, বর্তমান সভাপতি আনোয়ার আল হক, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাউন্সিলর আবু সাদাৎ মোঃ সায়েম, রাঙামাটি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি রনতোষ মল্লিক, দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পাদক ফজলে এলাহী, স্কাউটসের কমিশনার নুরুল আবছার, রেড ক্রিসেন্টের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম জিশান বখতেয়ার, ওয়ার্ল্ড পিস এন্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি শিক্ষক অরুপ মুৎসদ্দী। একেএম মকছুদ আহমেদের জীবনীগ্রন্থের লেখক ইয়াছিন রানা সোহেলের সঞ্চালনায় এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন রুবেল।
দৈনিক গিরিদর্পণের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নন্দন দেবনাথের সভাপতিত্বে এতে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের সদস্য মোঃ হাবীব আজম, মিনহাজ মুরশীদ, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক মোঃ আবদুল গফুর, রেড ক্রিসেন্টের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম শাকিল, জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মোঃ জসিম উদ্দিন, জেলা ইসলামী ফ্রন্টের সিনিয়র সহ সভাপতি মাওলানা শফিউল আলম আল ক্বাদেরী, দৈনিক রাঙামাটির ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাহাঙ্গীর কামাল, জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি মমতাজ সওদাগর, এফপিএবির সভাপতি শাহেদা আকতার, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শওকত আকবর, পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা, আসবাবপত্র মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুশ শুক্কুর, অটোরিকশা চালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সমন্বয়ক নির্মল বড়ুয়া মিলন, বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিমল কান্তি দে, দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি জসিম উদ্দিন, জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ সভাপতি শান্তিময় চাকমা, সাধারণ সম্পাদক ফাতেমা জান্নাত মুমু, হযরত আবদুল্লাহ ফকির প্রকাশ আব্দুল্লাহ ফকির (রহঃ) ওরশ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সাত্তার, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ক জামাল হোসেন, লেকার্স স্কুলের শিক্ষক শাহজালাল সুমন সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে প্রয়াত সাংবাদিক একেএম মকছুদ আহমেদের জীবনীর উপর তথ্য চিত্র প্রদর্শণ করা হয়। একেএম মকছুদ আহমেদের সহধর্মিনী মঞ্জু রানী গুর্খার লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন দৈনিক গিরিদর্পণ পরিবারের সদস্য দীপ্তি মজুমদার। এছাড়াও তাঁর জীবনের চুম্বকাংশ তুলে ধরেন সাংবাদিক ইয়াছিন রানা সোহেল।
আলোচনা সভা শেষে মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনায় মিলাদ ও মোনাজাত পরিচালনা করেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা’আত রাঙামাটি জেলা সভাপতি মাওলানা এম এ মুস্তফা হেজাজী।
এছাড়াও দৈনিক গিরিদর্পণ পরিবারের সদস্য পুলক চক্রবর্ত্তী, মনসুর আহমেদ মান্না, মিল্টন বাহাদুর, লিটন শীল, শিশির দাশ বাবলা, দীপ্তি মজুমদার, মুন মার্মা, পংকজ বাহাদুর, দীলিপ দাশ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
আলহাজ¦ এ.কে.এম.মকছুদ আহমেদ ১৯৪৫ সালের ১০ জুলাই চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাইয়ের এক নিভৃত পল্লী মগাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতা জামাল উল্লাহ ও মাতা জমিলা খাতুনের ৫ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে একেএম মকছুদ আহমেদ ছিলেন দ্বিতীয়। উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব সময়ে অর্থাৎ ১৯৬৬ সালে তিনি দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে আগমন করেছিলেন। এখানে এসে তিনি প্রথমে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন।
১৯৬৯ সালে চট্টগ্রামস্থ দৈনিক আজাদীর রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা জীবনের শুরু করেন। এরপর বাংলাদেশ বেতার, বার্তা সংস্থা এনা, বাসস, বিবিসি, রয়টার্সসহ অসংখ্য দেশি-বিদেশী গণমাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশ্বের নিকট পরিচিত করে তুলতে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। ১৯৭৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম সংবাদপত্র সাপ্তাহিক বনভূমি ও ১৯৮৩ সালে দৈনিক গিরিদর্পণ প্রকাশ করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি গবেষণাধর্মী পুস্তক প্রকাশনা ও সম্পাদনায় বিশেষ ভুমিকা রাখেন। “আমেরিকান বায়োগ্রাফিক্যাল ইনস্টিটিউট পৃথিবীর পাঁচ হাজার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব নামক” বইতে তাঁর জীবন বৃত্তান্ত স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট এর সাংবাদিক অভিধানেও তাঁর জীবন বৃত্তান্ত যোগ করা হয়েছে।
তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক ভুমিকা রাখেন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি রাঙামাটি প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভুমিকা রাখেন এবং দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর হাত ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল।
চারণ সাংবাদিক হিসেবে সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের জন্য দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মরহুম আব্দুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার স্মৃতি পদক, মাদার তেরেসা শান্তি পদক সহ অসংখ্য সম্মাননা তিনি লাভ করেছিলেন।
২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি আমাদের ছেড়ে অনন্তকালের মহাযাত্রায় পাড়ি জমান। ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁর নিজ গ্রাম চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের মগাদিয়ায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।