শিরোনাম

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ কতোটা ঘনিয়ে এসেছে?

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪২ দেখা হয়েছে

ডেস্ক রির্পোট:-দু’টি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ এখন ইরানের সামরিক নাগালের মধ্যে অবস্থান করছে। এর একটি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। আরেকটি রণতরী পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে পাঠানো হয়েছে। তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এমন ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, যাতে অস্পষ্টতার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেছেন, আমেরিকান শক্তি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে পারবে না। বরং একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকেই ডুবিয়ে দেয়া হতে পারে- এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।

এই দুই সংকেতের- অত্যধিক সামরিক শক্তির প্রদর্শন এবং কঠোর প্রতিরোধমূলক ভাষার মাঝখানে নীরবে চলছে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা উত্তেজনা এড়াতে আবারও আলোচনায় বসেছেন। মূল প্রশ্ন হলো- এই মুহূর্ত কি প্রকৃত সংঘাতের পূর্বাভাস, নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের দীর্ঘ, চক্রাকারে ঘুরতে থাকা উত্তেজনার আরেকটি অধ্যায়?
ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন এনডিটিভিকে বলেন, এটি অত্যন্ত গুরুতর সময়। ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। গত এক বছরে আমরা দেখেছি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কোনো চুক্তি না হলে শক্তি প্রয়োগ করা হবে।

জুনে ১২ দিনব্যাপী ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় যোগ দেয়। ফলে আজকের হুমকিকে নিছক কথার লড়াই বলে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। অধ্যাপক ম্যাবনের মতে, বর্তমান অস্থিরতার মূল কারণ হলো ওয়াশিংটন আসলে আলোচনায় কী চায়, তা স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, সমস্যার একটি বড় অংশ হলো, তথাকথিত চুক্তির সুনির্দিষ্ট কাঠামো কী, তা পরিষ্কার নয়। আলোচনায় কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য আছে। উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে- এ অবস্থায় এটি শুভ লক্ষণ নয়। তিনি বলেন, এটি ‘জবরদস্তিমূলক কূটনীতি’র অংশ- ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বোঝানো যে, যুক্তরাষ্ট্র তার কথায় অটল এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করবে।
তবে এতে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি বলেন, কোনো ভুল যোগাযোগ বা পরিস্থিতির ভুল ব্যাখ্যা সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যদিও কোনো পক্ষই তা চায় না। এটিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘নিরাপত্তা দ্বন্দ্ব’। ইরানও হুমকি দিয়েছে যে, তারা ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে। তবে অনেক মার্কিন ঘাঁটি এমন দেশে অবস্থিত, যাদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ইতিবাচক। কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে আগের হামলার পর কাতারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। ফলে তেহরান দ্বিধায় রয়েছে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো- সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান উত্তেজনা বিস্তার ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।

আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে হলেও, এতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, হিজবুল্লাহ ও হামাসের প্রতি ইরানের সমর্থন, এমনকি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ইরান ভেতরে অর্থনৈতিক চাপে আছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, খাদ্যদ্রব্যের দাম ১০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, জানুয়ারিতে বিক্ষোভ হয়েছে। ফলে তেহরানের দরকষাকষির শক্তি সীমিত। ম্যাবনের মতে, ইরানকে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে হবে, নইলে ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক চাপে তারা গুঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু বেশি আপস করলে দুর্বলতার বার্তা যাবে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ইরানের বড় লক্ষ্য। তবে এতে সাম্প্রতিক দমনপীড়নের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। এখানে শুধু শাসক টিকে থাকার প্রশ্ন নয়, বরং পুরো ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ জড়িত। হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়েছে এবং ইরানের ওপর ক্ষুব্ধ। হুতিরা তুলনামূলক স্বাধীন। ইরাকি মিলিশিয়াদের নিজস্ব এজেন্ডা আছে। ফলে ইরানের তথাকথিত ‘প্রতিরোধ ছাতা’ আগের মতো শক্তিশালী নয়। তবে চীন ও রাশিয়ার সমর্থন ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ- তেল বিক্রি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্ব সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ইরান বহুবার হরমুজ বন্ধ করার সক্ষমতার ইঙ্গিত দিয়েছে। তা হলে বৈশ্বিক তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ট্রাম্পের নীতিনির্ধারণের অপ্রত্যাশিত স্বভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। আলোচনার মাঝেই তিনি আগে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বর্তমানে জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা চলছে। ইরান বলছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার আলোচনার অযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র চায় ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’। ইসরাইল চায় আলোচনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি ইস্যুও থাকুক।
এদিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড হরমুজ প্রণালীতে সামরিক মহড়া চালিয়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যেন উচ্চ ঝুঁকির পোকার খেলা- যেখানে প্রত্যেকে ব্লাফ করছে, কিন্তু কেউই পুরোপুরি নিশ্চিত নয় পরের চাল কী হবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions