
ডেস্ক রির্পোট:- আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণভোটের প্রচারের জন্য সংস্কৃতি, ধর্ম, তথ্য, স্থানীয় সরকার, সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশু কল্যাণ—এই ছয় মন্ত্রণালয়কে ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ইতোমধ্যেই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ অর্থ ছাড় করা হয়েছে। মূলত গণভোট প্রচারের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ বিভাগ। প্রশ্ন উঠেছে—নির্বাচনের মাত্র ১৬ দিন আগে বরাদ্দকৃত অর্থ মন্ত্রণালয়গুলো কীভাবে, কোন কর্মসূচির মাধ্যমে এত টাকা ব্যয় করবে?
বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় পেয়েছে ৪৬ কোটি, তথ্য মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৭১ লাখ, ধর্ম মন্ত্রণালয় ৭ কোটি, স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর (এলজিইডি) ৭২ কোটি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৫২ লাখ এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
চারটি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই বরাদ্দ গ্রহণ করেছে। সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর অর্থ গ্রহণ করবে। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জনসংযোগ শাখা গণভোটের প্রচারে ৪ কোটি টাকা ব্যয় করছে।
জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে এই ছয় মন্ত্রণালয় সরাসরি কোনও দল, জোট বা প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারবে না। নির্বাচন কমিশন থেকেও সরকারি চাকরিজীবীদের কোনও দল বা জোটের পক্ষে নির্বাচনে যুক্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে তারা গণভোটে অংশ নেওয়ার জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করতে পারবে। মন্ত্রণালয়গুলো ছোট বৈঠক, লিফলেট বিতরণ, ২৪ আন্দোলনের চেতনা ও সংবিধান পরিবর্তনের সুফল জানানো, গণভোট দেওয়ার নিয়ম অবহিতকরণ, রেডিও ও টিভিতে গণভোটের স্বপক্ষে ছোট নাটক ও স্ক্রিপ্ট প্রচার এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিক দায়িত্ব পালনে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে গণভোটের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যালট পেপার, কর্মী, যাতায়াত, খামসহ নির্বাচনি সামগ্রী বাবদ খরচ করছে। কিছু প্রচার-প্রচারণা ও কেনাকাটা কমিশন নিজেই করছে। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের এনওসির পরিপ্রেক্ষিতে এলজিইডি (সিসি ক্যামেরা), সংস্কৃতি, ধর্ম, তথ্য, সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গণভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য বরাদ্দ থেকে অর্থ নিয়েছে। তারা কীভাবে প্রচার করবে এবং কাকে দিয়ে প্রচার করবে, তা মন্ত্রণালয়গুলো নিজেরাই স্থির করবে।
নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে. এম. আলী নেওয়াজ বলেন, গণভোট প্রচারের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ বিভাগ। অর্থ বিভাগ মন্ত্রণালয়গুলোকে বরাদ্দ দিয়েছে, আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে টাকা ট্রান্সফার করেছি। তারা হিসাব দেবে অর্থ বিভাগের কাছে। মন্ত্রণালয়গুলোকে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়গুলো অর্থ বিভাগের কাছে চেয়েছে, অর্থ বিভাগ নির্বাচন উপলক্ষ্যে তাদের বরাদ্দ দিয়েছে, আমরা দিয়ে দিয়েছি।
এদিকে আসন্ন গণভোটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো থেকে বিরত রাখতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা কার্যকর করতে সব মন্ত্রণালয়কে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। একইভাবে গণভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের প্রচারণায় অংশ নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে কোনও প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। ২৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে একটি বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়।
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে। গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ প্রচার বিষয়ে কমিশনের নির্দেশনা সব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জানিয়ে দেওয়া হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহছানুল হক জানিয়েছেন, আগে কমিশনের বিধি না থাকায় সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তবে এখন নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেবেন না।
জানা গেছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সরাসরি কোনও রাজনৈতিক প্রচারণা চালাবে না। বরং বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও উন্নয়নমূলক কাজের প্রচারের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে জনমত গঠন করবে। মন্ত্রণালয় সুবিধাভোগীদের (ভাতাভোগী) অবগত করবে যে, চলমান সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পগুলো বর্তমান সরকারের আমলেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ প্রসঙ্গে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ জানিয়েছেন, সত্যিকারের সংস্কারের জন্য অবকাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। সব স্তরের নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রধান কাজ।
তিনি জানান, গণভোটে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রচারণার সম্ভাব্য উপায়গুলো হলো—সুবিধাভোগীদের সঙ্গে সভা, বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার উপকারভোগীদের নিয়ে স্থানীয়ভাবে সচেতনতামূলক সভা করা। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সাফল্য তুলে ধরা হবে। সরকারি বিভিন্ন সুবিধা (ভাতা, প্রশিক্ষণ, ঋণ) স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার করা হবে এবং নির্বাচনের আগে নতুন ভাতা বা সহায়তার আওতা বাড়ানো হবে, যা পরোক্ষভাবে ইতিবাচক বার্তা দেবে।
নির্বাচনে গণভোটের পক্ষে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা জানিয়েছেন, নির্বাচন সামনে রেখে তথ্য সেল গঠন করা হবে। ইতোমধ্যেই সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময় করা হয়েছে। অর্থবহ নির্বাচন করতে জনসংযোগ কর্মকর্তাদের সহায়তা খুবই প্রয়োজন। তাদের সৃজনশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্বশীল মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। এআইয়ের যুগে অপতথ্য ও গুজব খুব দ্রুত ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে—এসব রোধে কাজ করতে হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আসন্ন নির্বাচনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় প্রধানত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের—বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজন, আইন প্রণয়ন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। একই সঙ্গে এটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় সহায়তা এবং নির্বাচনি আচরণবিধি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আবুল ফয়েক মো. আলাউদ্দিন খান জানিয়েছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের প্রচারণায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ। এর আওতায় বিশেষ গান তৈরি, ভোটার সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নির্বাচনের সময় একটি সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হবে।
এদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণভোটের বিষয়ে বরাদ্দকৃত অর্থ যেন সরকারি নিয়মনীতি মেনে ব্যয় করা হয়—সেদিকে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গণভোটের পক্ষে সচেতনতা তৈরির বিষয়টি সরকারের দায়িত্ব। সময় কম থাকলেও এই অর্থ কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় করা হয় সেটিই এখন দেখার বিষয়। এই অর্থ ব্যয় যেন কোনওভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়—সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে, নাহলে অর্থ ব্যয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে পারে। বাংলা ট্রিবিউন