ডেস্ক রির্পোট:- রাজধানীর বিজয়নগরে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের ওপর বর্বর হামলা চালিয়েছেন পুলিশ ও সেনাসদস্যরা। এতে দলটির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। শুক্রবার রাত ৯টার দিকে এ হামলা হয়েছে।
আহতদের মধ্যে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের অবস্থা গুরুতর। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে পার্শ্ববর্তী ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতাল নেওয়া হয়, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
কার নির্দেশে হামলা হয়েছে, তা জানানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে গণঅধিকার পরিষদ। একই সঙ্গে হামলার প্রতিবাদ ও জড়িতদের বিচার দাবিতে আজ শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি।
এর আগে সন্ধ্যার দিকে কাকরাইলে জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতাকর্মীদের সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। জাপা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের এ ঘটনায় উভয়পক্ষের ৩০ জন আহত হন। এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিজয়নগরে দলীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন উভয় দলের শত শত নেতাকর্মী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে অবস্থান নেন অতিরিক্ত পুলিশ এবং টহল জোরদার করেন সেনা সদস্যরা।
বিপুল পরিমাণ সেনা ও পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে রাত ৯টার দিকে বিজয়নগরে দলীয় কার্যালয়ের সামনে গণঅধিকার পরিষদ সংবাদ ব্রিফিং করছিল। তাতে বাধা দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
দলটির দপ্তর সম্পাদক শাকিল উজ্জামান বলেন, সংবাদ ব্রিফিং করার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং লাঠিপেটা করে। এতে দলের সভাপতি নুরুল হক নুরসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। তাদের কাকরাইলে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
জানা গেছে, জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং লোকজন ছোটাছুটি করতে থাকেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন পুলিশ, র্যাব ও সেনাসদস্যরা। কাকরাইলে জাতীয় পার্টি ও বিজয়নগরে গণপরিষদের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। আহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে কাকরাইলে জাপা কার্যালয়ের সামনে দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের একটি বিক্ষোভ মিছিল যাওয়ার সময় এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ সময় উভয়পক্ষ একে অপরের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় রূপ নেয়। প্রায় ৩০ মিনিট ধরে এ সংঘর্ষ চলে। পরে পুলিশ গিয়ে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য আবু হানিফ জানান, জাতীয় পার্টিসহ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসরদের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সন্ধ্যায় তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় দিকে পল্টন মোড়ে তাদের মিছিলের পেছনের অংশে হামলা করা হয়।
তিনি দাবি করেন, জাতীয় পার্টির অফিসের সামনে থেকে অনেক লোক এ হামলায় অংশ নেয় এবং হামলাকারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগও ছিল বলে দাবি করেন তিনি। একপর্যায়ে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা প্রতিরোধ করলে সেখানে সংঘর্ষ হয়।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা ছিলেন এ মিছিলে। এ ঘটনায় রাশেদ খান আহত হয়েছেন বলে তার ফেসবুক পেজে দাবি করা হয়েছে।
জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে দলটির যুব পার্টির নেতা সোহেল বলেন, আমাদের নেতাকর্মীরা পার্টি অফিসের সামনে বসেছিলেন। গণঅধিকারের মিছিল থেকে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য উপস্থিত হন।
পরে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম পাটোয়ারী কাকরাইলের দলীয় অফিসে তাৎক্ষণিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘আজ আমাদের পার্টি অফিসে অভ্যন্তরীণ মিটিং ছিল। গণঅধিকার পরিষদের বেআইনি মিটিং ছিল। তারা সেখান থেকে আমাদের দলের নিবন্ধন বাতিল ও আমাদের চেয়ারম্যানের গ্রেপ্তারের দাবি জানায়। আমার জানা মতে, এ ধরনের মিটিং করা বেআইনি, গভীর উসকানিমূলক ও দেশকে খাদের কিনারে নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ।
তিনি অভিযোগ করেন, গণঅধিকার পরিষদের মিছিল থেকে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর ইটপাটকেল ছুড়ে মারা হয়। এতে আমাদের বেশকিছু নেতাকর্মী আহত হন। অনেকে হাসপাতালে আছেন। পরে আমাদের নেতাকর্মী তাদের আক্রমণ সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিহত করে। তাৎক্ষণিকভাবে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আমরা কৃতজ্ঞ।
এ বিষয়ে রমনা থানার এসআই অরূপ তালুকদার সাংবাদিকদের জানান, এ ঘটনায় কেউ থানায় অভিযোগ করেনি। কাউকে আটকও করা হয়নি। অভিযোগ পেলে তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জিএম কাদেরের গ্রেপ্তার দাবি
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, অবিলম্বে ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর জিএম কাদেরকে গ্রেপ্তার না করলে সচিবালয় ঘেরাও করা হবে। গতকাল সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে তিনি এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
প্রেস সচিবের নিন্দা ও তদন্তের ঘোষণা
নুরুল হক নুরের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, আমরা এই পুরো জিনিসটা ইনভেস্টিগেট করবো।
শুক্রবার রাত সোয়া ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত নুরকে দেখতে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
প্রেস সচিব বলেন, তারা বলেছেন, নুরের আঘাত গুরুতর। তার ওপর আঘাত খুবই ন্যাক্কারজনক একটা ঘটনা। আমরা এটার নিন্দা করি। আমরা এই পুরো জিনিসটা ইনভেস্টিগেট করবো।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নুর ও তার দল গণঅধিকার পরিষদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেসময় নুরকে এরেস্ট করা হয় এবং নির্মমভাবে টর্চার করা হয়।
নুরের ওপর হামলার নিন্দা বিভিন্ন দলের
গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিত্ব। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস অন্যতম। তাদের কেউ কেউ এই আক্রমণকে আওয়ামী ষড়যন্ত্রের অংশ বলেও উল্লেখ করেছেন।