শিরোনাম
দীপন তালুকদার দিপু: দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ও নতুন অধ্যায়ের গল্প চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ: এক মাসে ১৬ মৃত্যু, আক্রান্ত ২৪৩০ থানা পর্যায়েও সাইবার নজরদারি, ‘অপতথ্য’ নির্ধারণ করবে কে রাঙ্গামাটিতে কোতয়ালী পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার ৪, জিম্মায় এক যুবক অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ মামুনের পাহাড়ে বিএনপির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে নিজস্ব নেতৃত্বে উঠে আসার গল্প ‘দলের নারী নেত্রীরা এমন হলে তাদের পুরুষ নেতাদের কী অবস্থা’ বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন একের পর এক হামলা, দখল, চাঁদাবাজি: গোয়েন্দা নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন কেন সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লি : ইন্টারনেট বন্ধ, আটক সাতশ’র বেশি

দীপন তালুকদার দিপু: দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ও নতুন অধ্যায়ের গল্প

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ দেখা হয়েছে

এসএম শামসুল আলম:– রাঙ্গামাটির রাজনৈতিক অঙ্গনে দীপন তালুকদার দিপু এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতি, সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়তা এবং জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব পেরিয়ে তিনি আজ রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি। ২০২২ সালে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২৩ সালে অনুমোদিত ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতেও সভাপতি হিসেবে তাঁর নাম আসে।
২০২৬ সালের আগস্টে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সরকার রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করে তাঁকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছে। ফলে দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি বর্তমানে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বও দিচ্ছেন।
কিন্তু জেলা বিএনপির সভাপতি কিংবা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান—এই অবস্থানে পৌঁছানোর গল্পটি একদিনের নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বে উঠে আসার একটি ধারাবাহিক পথ।
তৃণমূলের রাজনীতি থেকে জেলা পর্যায়ে
দীপন তালুকদার দিপুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আগে তিনি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ জেলা বিএনপির সভাপতি হওয়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরে কাজ করার সুযোগ পান।
এই ধারাবাহিকতাই তাঁকে জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করে বলে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্রমপর্যবেক্ষণে দেখা যায়।

২০২১ সালের সম্মেলন: সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নতুন দায়িত্ব—–
রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির রাজনীতিতে দিপুর জন্য বড় একটি মাইলফলক ছিল ২০২১ সালের জেলা সম্মেলন।
ওই সম্মেলনে তিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সে সময় সভাপতি নির্বাচিত হন হাজী মো. শাহ আলম। সাধারণ সম্পাদক পদে দিপুর নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জেলা সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব তাঁর হাতে আসে।
এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জেলা বিএনপির নেতৃত্বে বড় পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এক ভোটের ব্যবধানে সভাপতি—
২০২২ সালের ২১ এপ্রিল জেলা বিএনপির সভাপতি হাজী শাহ আলম মারা গেলে সভাপতির পদটি শূন্য হয়।
এরপর সভাপতি পদে উপনির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হলে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন দীপন তালুকদার দিপু। ২০২২ সালের ৯ জুন অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে সভাপতি পদে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
সেই নির্বাচনের ফলাফল ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ১৫০ জন কাউন্সিলরের ভোটে দিপু পান ৭৪ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইফুল ইসলাম ভুট্টো পান ৭৩ ভোট। অর্থাৎ মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে তিনি রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন।
এই জয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ এর মধ্য দিয়ে তিনি কাউন্সিলরদের ভোটে জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন।
১৫১ সদস্যের কমিটিতে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি
সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর নেতৃত্ব আরও সাংগঠনিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
২০২৩ সালের ১২ মার্চ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অনুমোদনে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে সভাপতি হিসেবে রাখা হয় দীপন তালুকদার দিপুকে এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয় অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ মামুনকে।
এর ফলে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় তাঁর নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।

আন্দোলন-সংগ্রামে দলীয় নেতৃত্ব—–
জেলা বিএনপির নেতৃত্বে থাকার সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে দিপুর সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেছে।
রাঙ্গামাটির মতো পাহাড়ি জেলায় রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনা অন্য অনেক জেলার তুলনায় আলাদা বাস্তবতার মুখোমুখি। এখানে পাহাড়ি-বাঙালি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বসবাস, দুর্গম উপজেলা, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং পাহাড়ের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে।
এই বাস্তবতার মধ্যে জেলা বিএনপির সংগঠনকে সক্রিয় রাখা এবং উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দলীয় কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করা জেলা সভাপতির অন্যতম দায়িত্ব।
দিপনের বিভিন্ন বক্তব্যেও দলকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করা, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং রাঙ্গামাটির উন্নয়ন নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য উঠে এসেছে।

পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতির কথা—
দিপনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পাহাড়ি-বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও সম্প্রীতির কথা বলা।
২০২৫ সালের একটি মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, বিএনপি সকল সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। একই বক্তব্যে তিনি রাঙ্গামাটিকে একটি মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন।
২০২৬ সালে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাঁর বক্তব্যে একই ধরনের বিষয় উঠে আসে। তিনি দল-মত নির্বিশেষে পাহাড়ি-বাঙালি সকলের জন্য বৈষম্যহীনভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তবে এই নীতিগুলো কীভাবে প্রয়োগ করা হয়—তা এখন তাঁর নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার বিষয়।
তারেক রহমানের প্রতি আস্থার কথা
২০২৬ সালের আগস্টে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার পর দেওয়া বক্তব্যে দীপন তালুকদার দিপু তাঁর রাজনৈতিক জীবনে তারেক রহমানের আস্থার বিষয়টি তুলে ধরেন।
জেলা পরিষদের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী এবং প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁদের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুসরণ করে রাঙ্গামাটি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তাঁর নতুন দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেওয়া বক্তব্যের অংশ। একই সময়ে তিনি দায়িত্ব পালনে দলীয় নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

২০২৬: রাজনৈতিক জীবনে নতুন মোড়—-
দীপন তালুকদার দিপুর রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় সাম্প্রতিক পরিবর্তন আসে ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট।
সেদিন সরকার দীপন তালুকদারকে চেয়ারম্যান করে ১৫ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করে। নতুন পরিষদে চেয়ারম্যানসহ ১৫ জনের মধ্যে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এর ফলে একই সঙ্গে তাঁর হাতে আসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়—
রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি এবং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।
রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্ব এবং সরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক নেতৃত্ব—দুই ধরনের দায়িত্বের প্রকৃতি এক নয়। ফলে তাঁর সামনে এখন নতুন ধরনের দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা হলেন—-
সরকারি জেলা পরিষদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নতুন পরিষদে চেয়ারম্যানসহ মোট ১৫ জন রয়েছেন।
চেয়ারম্যান:
১. দীপন তালুকদার
সদস্যবৃন্দ:
২. মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ
৩. শাশ্বত চাকমা
৪. বিলটু চাকমা
৫. মো. তোফাজ্জল হোসেন
৬. মোহাম্মদ ফারুক
৭. নন্দিতা দাশ
৮. অনিল বরণ চাকমা
৯. পাইচিং মং মার্মা
১০. উথোয়াইমং মারমা
১১. প্রেমা তালুকদার
১২. তিমথী খিয়াং
১৩. সুবিমল চাকমা
১৪. চন্দ্রা চাকমা
১৫. সুপর্ণ দেব বর্মন

নতুন পরিষদ নিয়ে দিপুর প্রত্যাশা—–
চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পর দীপন তালুকদার দিপু বলেন, রাঙ্গামাটির প্রতিটি প্রান্তে উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছে দিতে চান। জনগণের কল্যাণে কাজ করা এবং জেলা পরিষদকে একটি মডেল জেলা পরিষদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে রাঙ্গামাটিতে বসবাসরত সব সম্প্রদায়ের কল্যাণের বিষয়টি। তিনি বলেছেন, জনগণের ভালোবাসা ও প্রত্যাশাকে সঙ্গে নিয়ে জেলার সার্বিক উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করাই হবে নতুন পরিষদের প্রধান লক্ষ্য।

সবার সার্বিক সহযোগিতা চান চেয়ারম্যান—–
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর দীপন তালুকদার দিপু শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নয়, রাঙ্গামাটির সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতাও চেয়েছেন।
তিনি মনে করেন, একটি জেলা পরিষদ এককভাবে চেয়ারম্যানের পক্ষে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। পরিষদের সদস্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক এবং সর্বস্তরের জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি নবগঠিত জেলা পরিষদকে সহযোগিতা করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
তাঁর এই আহ্বানের মূল লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে—রাঙ্গামাটির সামগ্রিক উন্নয়ন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা।

জেলা পরিষদে কী করতে চান দিপু?
চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পর দীপন তালুকদার তাঁর অগ্রাধিকারের কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন।
তিনি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদকে বৈষম্যহীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে জেলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা, পর্যটনের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেকারত্ব কমাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাঙ্গামাটির বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি, পর্যটন, কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক অর্থনীতি, ভূমি ও সামাজিক সমস্যা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা—এসব বিষয় জেলা পরিষদের কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।
তাই নতুন চেয়ারম্যানের কর্মকাণ্ড শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে নয়, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রভাব দিয়েও মূল্যায়িত হবে।

ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সংগ্রামের জায়গাটি—–
দীপন তালুকদার দিপু নিজে ২০২৬ সালে জেলা পরিষদের দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময়ের ত্যাগ, প্রতিকূলতা, মামলা ও হামলার কথা উল্লেখ করেছেন। একটি প্রতিবেদনে তাঁর ১৭ বছরের রাজনৈতিক ত্যাগ-তিতীক্ষা, মামলা ও হামলার কথা তাঁর বক্তব্য বলা হয়েছে।
দিপুর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দীর্ঘ সময় ধরে জেলা বিএনপির বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন এবং শেষ পর্যন্ত কাউন্সিলরদের ভোটে জেলা সভাপতির পদে আসীন হওয়া।

পরিবার ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার——
দীপন তালুকদার দিপুর পরিবারও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত একটি আলোচিত পরিবার।
২০২৬ সালের আগস্টে তাঁর নিজের দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তাঁর বড় ভাই রাজনীতি করেন না এবং এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ফলে ২০২৬ সালে দিপু চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি রাঙ্গামাটির জেলা পরিষদের ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য পারিবারিক ধারাবাহিকতা তৈরি করেছে।
তবে তাঁর রাজনৈতিক উত্থানকে কেবল পারিবারিক পরিচয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করলে তাঁর দীর্ঘ সাংগঠনিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যায়। জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর দায়িত্ব পালন এবং ২০২২ সালের কাউন্সিল নির্বাচনে সরাসরি ভোটে সভাপতি হওয়া তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পৃথক গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ——
দীপন তালুকদার দিপুর সামনে এখন সবচেয়ে বড় বিষয় শুধু দল পরিচালনা নয়; সরকারি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা।
একদিকে তাঁকে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য ও দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। অন্যদিকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা থাকবে।
বিশেষ করে রাঙ্গামাটির দুর্গম এলাকাগুলোতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি ও পর্যটন উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক অর্থনীতি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান—এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া তাঁর সামনে বড় কাজ।
একই সঙ্গে পাহাড়ি-বাঙালি সব সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতি বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নের জায়গা
দীপন তালুকদার দিপুর রাজনৈতিক পথচলাকে কয়েকটি ধাপে দেখা যায়—
তৃণমূল রাজনীতি → সদর উপজেলা বিএনপির নেতৃত্ব → জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক → জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক → কাউন্সিলরদের ভোটে জেলা সভাপতি → পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটির সভাপতি → জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের মূল চিত্রটি পাওয়া যায়।
২০২২ সালের এক ভোটের ব্যবধানে পাওয়া জয় থেকে ২০২৩ সালের পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি এবং ২০২৬ সালের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান—প্রতিটি ধাপই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আলাদা মাইলফলক।
তবে এখন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছে। কারণ দলীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তাঁর সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডও জনপরিসরে আলোচিত ও মূল্যায়িত হবে।

শেষ কথা—-
দীপন তালুকদার দিপুর গল্পকে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার পদোন্নতির গল্প হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় রয়েছে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালন, জেলা বিএনপির নেতৃত্বে ওঠার প্রতিযোগিতা, মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে সভাপতি নির্বাচিত হওয়া এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নেতৃত্বের স্বীকৃতি।
২০২৬ সালে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী এবং প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দিপু যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে রাঙ্গামাটির উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার অঙ্গীকার।
একই সঙ্গে নবগঠিত পরিষদের সদস্যদের নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা এবং সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা নিয়ে রাঙ্গামাটির উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
এখন তাঁর সামনে দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি রাঙ্গামাটির সামগ্রিক উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যকারিতা, পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতি, পর্যটন, কর্মসংস্থান এবং প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মতো বড় বড় বিষয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর যে অবস্থানে তিনি পৌঁছেছেন, সেই অবস্থানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—রাজনীতির মাঠে অর্জিত নেতৃত্বকে তিনি কতটা জনসেবা, উন্নয়ন ও কার্যকর প্রশাসনিক কাজে রূপ দিতে পারেন।

লেখক:- এসএম শামসুল আলম।
স্টাফ রির্পোটার যমুনা টেলিভিশন।
সাবেক সভাপতি রাঙ্গামাটি প্রেসক্লাব।
smshamsul.cht@gmail.com

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions