
বান্দরবান:- একসময় ঘন সবুজে ঢাকা ছিল চারটি গ্রামে এই পাড়াবন। নানা প্রজাতির গাছ, পশু পাখির ডাক আর শীতল ছায়ায় ছিল প্রাণের স্পন্দন। এখন সেখানে শুধু কাটা গাছের গুঁড়ি, আর বিভিন্ন প্রজাতির গাছে ধ্বংসস্তূপের চিত্র। এমন চিত্র দেখা মিলেছে আলীকদম তৈন রেঞ্জের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ২৯০ মাংগু মৌজার ব্যাঙঝিড়িতে।
বান্দরবানের দুর্গম আলীকদম-থানচি সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট মো: ইসমাইল বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে কাঠ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব কাঠের একটি অংশ ‘জোত পারমিট’-এর কাগজ দেখিয়ে বৈধতার আড়ালে পাচার করা হচ্ছে। অন্য অংশ স্থানীয় অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। আর এসবের পিছনের বনাঞ্চল ধ্বংসাত্মক কাজে নেমেছেন আলীকদম পান বাজারের বাসিন্দা মো: ইসমাইল প্রকাশ লাল ইসমাইল।
দীর্ঘ দুই বছর ধরে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ, ঝিরির পানিপ্রবাহ বন্ধ এবং শতবর্ষী মাতৃগাছ কেটে নেওয়ার ফলে পুরো এলাকার জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে পড়েছে।আলীকদম -থানচি সড়কের ১৭ কিলোমিটার অংশ থেকে ১ঘন্টা হেঁটে গেলেই চোখে পড়ে পোলা ব্যাঙঝিরি এলাকায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র।
ঝিরির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে বিশাল পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা। এই রাস্তা ব্যবহার করে ট্রাক দিয়ে নিয়মিত কাঠ পরিবহন করা হচ্ছে। রাস্তার দুই পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিশাল আকৃতির গাছের গুঁড়ি, যেগুলোর অনেকগুলোর দৈর্ঘ্য ৬০ থেকে ১০০ ফুট এবং প্রস্থ ১০ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত। অনেক গাছ অর্ধেক কেটে রাখা হয়েছে।
থানচি -আলীকদম সড়কের সাড়ে ২৩ কিলো আর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মাংগু মৌজা। সেখানে পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুই পাড়া নামচাক পাড়া,কাকই পাড়া ,আদুই পাড়াসহ হাজার মানুষের ম্রো জাতিগোষ্ঠী বসবাস। তাদের খাওয়ার প্রধান পানির উৎস সেই ব্যাঙঝিড়ি। অথচ ওই ঝিড়িতে পানি দুরের কথা প্রায় ২শত একর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চলছে এই বন উজাড় কর্মযজ্ঞ। এছাড়া রুপসী পাড়া ইউনিয়নের আরও কয়েকটি পাড়ার মানুষও একই পানির উৎস ব্যবহার করত।বন উজাড় ও ঝিরির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন মারাত্মক পানি সংকট দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আলীকদমের আবুহান মোঃ ইসমাইল সওদাগরের নেতৃত্বে একটি চক্র এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তার সহযোগী হিসেবে লংলেইন ম্রোর নামও এসেছে। অভিযোগ আছে, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এ কার্যক্রম চালাচ্ছে লামা তৈন রেঞ্জের কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম।
আদুই পাড়ার কার্বারী কামপ্লাত ম্রো বলেন, “এই ঝিরির পানির ওপর ৭-৮টি পাড়া নির্ভরশীল। কিন্তু এখন আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।
নামচাক ম্রো পাড়ার মেন রাও ম্রো বলেন, “আগে এই বনে হরিণ, ভালুক, বন্য শূকর ছিল। এখন বন নেই, প্রাণীও নেই। গত দুবছর ধরে শুধু গাছ কেটে যাচ্ছে ইসমাইল নামে এক ব্যক্তি।
ব্যাঙঝিড়িতে দুবছর আগে পানি প্রবাহ ছিল। কেননা সেখানে তখন বহুপ্রজাতি বা শতবর্ষী গাছ মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে ছিল। গাছের ছায়া আর শিকরে গোড়ায় বা পাথরে গর্তে বিভিন্ন প্রজাতির শামুক,কাকড়াসহ খাবার ছিল। সেটির সাথে গভীর জঙ্গল হওয়াতেই বানর, হরিণসহ বিভিন্ন পাখির ডাক শোনা যেত। কিন্তু এখন সেসব গাছ কেটে ফেলেছে। এখন সেই বনাঞ্চল ধুধু মরুভূমি।