
শামসুল আলম:- বাংলাদেশের সংবিধান এক ও অবিভাজ্য রাষ্ট্রের কথা বলে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা দেখলে প্রশ্ন জাগে—এই সংবিধান কি পাহাড়ে সমানভাবে কার্যকর, নাকি সেখানে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে?
খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান—এই তিন জেলা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক এলাকা নয়। ভৌগোলিক অবস্থান, জাতিগত বৈচিত্র্য ও নিরাপত্তাজনিত কারণে এগুলো বাংলাদেশের কৌশলগত সীমান্তভূমি। অথচ এই অঞ্চলের নির্বাচন ক্রমেই এমন এক বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে, যেখানে ব্যালটের চেয়ে শক্তির ভাষা বেশি কার্যকর, আর সংবিধানের চেয়ে অলিখিত সমঝোতা বেশি প্রভাবশালী।
নির্বাচন যখন সংবিধানের বিকল্প হয়ে ওঠে
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন মানে জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ। কিন্তু রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে যে ‘উত্তাপহীন নির্বাচন’ দেখা যাচ্ছে, তা প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক স্বস্তির নয়—বরং সাংবিধানিক শূন্যতার লক্ষণ।
যেখানে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, যেখানে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো কৌশলগতভাবে মাঠ ছেড়ে দেয়, সেখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই শূন্যতা কে পূরণ করছে? রাষ্ট্র, না আঞ্চলিক ক্ষমতাকেন্দ্র?
জামায়াতে ইসলামীর সরাসরি প্রার্থী না দেওয়া, জেএসএস-এর প্রকাশ্য অনুপস্থিতি এবং ইউপিডিএফের নির্বাচনী উপস্থিতি-অনুপস্থিতির হিসাব—সব মিলিয়ে নির্বাচনী মাঠ এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে ফলাফল অপ্রত্যাশিত না হয়। সংবিধান এখানে আর নিয়ন্ত্রক নয়; নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে নেপথ্যের সমঝোতা।
আঞ্চলিক সংগঠন: রাজনৈতিক দল না সমান্তরাল কর্তৃত্ব?
পার্বত্য চট্টগ্রামের বড় সংকট এখানেই। জেএসএস ও ইউপিডিএফ কেবল রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কাজ করছে না—তারা অনেক জায়গায় সামাজিক ও নিরাপত্তাগত কর্তৃত্বের ভূমিকা পালন করছে। এটি সংবিধানসম্মত রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রাষ্ট্র যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, সেখানে যদি ভোটারকে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে ভয় দেখানো হয়—তবে সেটি সরাসরি সংবিধানের ৩৭ ও ৩৮ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। এই ভয়ভীতি যদি নির্বাচনের অংশ হয়ে যায়, তবে সেটি আর নির্বাচন থাকে না—তা হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা হস্তান্তর।
খাগড়াছড়ি: রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার লিটমাস টেস্ট
এই প্রেক্ষাপটে খাগড়াছড়ি কেবল একটি আসন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার লিটমাস টেস্ট।
এখানে নির্বাচন মানে কেবল এমপি নির্বাচন নয়—এটি পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব টিকে থাকবে কি না, তার পরীক্ষা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী অধিকাংশ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ—এটি স্বাভাবিক কোনো নির্বাচনী বাস্তবতা নয়, এটি একটি সতর্ক সংকেত।
যেখানে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, সেখানে রাষ্ট্র তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। আর রাষ্ট্র যখন নিজের দায়িত্ব পালন থেকে পিছিয়ে আসে, তখন সেই শূন্যতা অন্য শক্তি পূরণ করে—এটাই ইতিহাসের নিয়ম।
সংবিধান বনাম আঞ্চলিক চুক্তির রাজনীতি
পার্বত্য চুক্তি ছিল একটি রাজনৈতিক সমঝোতা। কিন্তু সংবিধান কোনো সমঝোতার দলিল নয়—এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন।
যদি নির্বাচনের মাধ্যমে এমন শক্তি ক্ষমতায় আসে, যারা ভবিষ্যতে পুলিশ হস্তান্তর, ভূমি কমিশনের একতরফা প্রয়োগ বা সেনা উপস্থিতি হ্রাসের মতো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে—তবে সেটি আর উন্নয়ন বা শান্তির প্রশ্ন থাকে না; তা সরাসরি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়।
রাষ্ট্র কি নির্বাচনের নামে এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা বৈধতা দিতে চায়, যেখানে সংবিধান ধীরে ধীরে গৌণ হয়ে পড়ে?
শেষ প্রশ্ন
পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি নির্বাচন সংবিধানের পরিবর্তে ভয়ের মানচিত্র মেনে চলে, যদি রাষ্ট্র তার কর্তৃত্ব প্রয়োগে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, তবে এই সংকট পাহাড়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রূপ নেবে।
সংবিধান শুধু ঢাকায় কার্যকর হলে চলে না; এটি খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানেও সমানভাবে কার্যকর হতে হবে। নইলে একদিন দেখা যাবে—মানচিত্র ঠিক আছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নীরবে সরে গেছে।
এবং ইতিহাস বলে, রাষ্ট্র যখন নীরব থাকে—সংবিধান তখন সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়।