শিরোনাম
রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলা কালাপাকুজ্জা ইউনিয়নে হাতপাখার প্রার্থী জসিম উদ্দীন এর ব্যাপক গণসংযোগ নির্বাচনী প্রচারণায় জুঁই চাকমার রাঙ্গামাটি শহরে জনসংযোগ ঝুঁকির মধ্যে পাঠদান: থানচির টুকটং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আতঙ্কে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পাহাড়ে ষড়যন্ত্রের শেষ নেই সাবধান থাকতে হবে—নির্বাচনী পথসভায় ওয়াদুদ ভূইয়া রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক অরো প্রশস্ত হচ্ছে রাঙ্গামাটির ভোটের মাঠে আলো ছড়াচ্ছেন একমাত্র নারীমুখ জুঁই চাকমা রাঙ্গামাটির পাংখোয়াপাড়ার গোড়াপত্তন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপহারেই রাঙ্গামাটিতে ১৩টি ব্যালট বক্সে লক করা হলো ৫ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোটার বাংলাদেশি গণতন্ত্রের জন্য ধর্মের ফাঁদ পাতছে জামায়াতে ইসলামী ময়মনসিংহে জামিন ছাড়াই কারামুক্ত হত্যা মামলার তিন আসামি

বাংলাদেশি গণতন্ত্রের জন্য ধর্মের ফাঁদ পাতছে জামায়াতে ইসলামী

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৭ দেখা হয়েছে

কাজী জেসিন:- রাজনৈতিক আন্দোলন যখন ধর্মীয় বিশ্বাসের ভাষায় কথা বলে তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে না। বিপজ্জনক হয়ে ওঠে তখন, যখন তারা নৈতিকতার একচ্ছত্র মালিকানা দাবি করে। বৃটিশ দার্শনিক আইজায়া বার্লিনের এই পর্যবেক্ষণ আজকের বাংলাদেশের জন্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।
২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর বাংলাদেশ এক ‘আঁকাবাঁকা’ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর দুর্নীতি ও দমননীতির রেখে যাওয়া শূন্যতার ভেতর থেকে ধর্মভিত্তিক সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। নিজেদের তারা তুলে ধরছে বিশৃঙ্খলার সাগরে একমাত্র শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ‘নৈতিক’ বিকল্প হিসেবে।
কিন্তু এই সংযত ভাবমূর্তির আড়ালে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে। তাহলো- আদর্শগত চূড়ান্ত অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো দল কি বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম করতে পারে, তাকে ভেঙে না ফেলে? সেই প্রশ্নের উত্তর অন্তত আংশিকভাবে পাওয়া যাবে ১২ই ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে।
জামায়াত দক্ষতার সঙ্গে ‘দ্বৈত বার্তা’র রাজনীতি করেছে। কূটনৈতিক মিশনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে দলটির শীর্ষ নেতারা আশ্বস্তমূলক কথা বলেন। তারা সাংবিধানিকতার কথা তোলেন, শরিয়া আইন তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার ধারণা নাকচ করেন। তারা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেদের একটি নিরীহ, ধর্মভিত্তিক সিভিল সোসাইটি আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরতে চান।
কিন্তু মাঠপর্যায়ে চিত্র ভিন্ন। গ্রাম ও হাটবাজারে- যেখানে বাস্তবে নির্বাচনের জয় নিশ্চিত হয়, সেখানে যেসব কথাবার্তা হয় তা নাগরিক দায়িত্ব নিয়ে নয়, বরং সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত আদেশ নিয়ে। এখানে ভোট দেয়া আর রাজনৈতিক পছন্দ থাকে না; তা হয়ে ওঠে ধর্মীয় বিশ্বাসের পরীক্ষা। জামায়াতকে ভোট দেয়া মানে ‘ঐশী পুরস্কার’ অর্জন, আর বিপক্ষে ভোট দেয়া মানে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে যাত্রা।
ভোটকেন্দ্রকে পরকালের প্রবেশদ্বার হিসেবে উপস্থাপন করে জামায়াত কার্যত বিরোধীদের সমাজচ্যুত করছে। জামায়াত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির প্রকাশ্যে বলেছেন, দলের নির্বাচনী প্রতীক দাড়িপাল্লায় ভোট দেয়া একটি ‘ঈমানি দায়িত্ব’।
জনসংযোগের সময় এই আক্রমণ সত্ত্বেও, জামায়াতের নিজস্ব প্রতিষ্ঠাকালীন দলিলই তাদের ‘মধ্যপন্থী’ বয়ানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। দলটির গঠনতন্ত্রে এখনো বলা আছে- সার্বভৌমত্ব জনগণের নয়, কেবল আল্লাহর। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য রয়ে গেছে ‘ইকামতে দ্বীন’- ইসলামকে একটি সর্বব্যাপী জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্র ব্যক্তি-অধিকারের রক্ষক নয়; বরং নৈতিক রূপান্তরের হাতিয়ার। এখানে আইনকে ছোট করা হয় নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যার কাছে, আর জনগণের ক্ষমতাকে দেখা হয় সাময়িক ও শর্তসাপেক্ষ বিরক্তিকর বিষয় হিসেবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতি- সমতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতি, যদি কোনো দল সত্যিই মেনে চলতে চায়, তবে প্রথমেই তাকে তার আদর্শকে সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হয়। জামায়াত তা করেনি। এই আদর্শগত কঠোরতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে দেশের নারী জনগোষ্ঠী সম্পর্কে দলের দৃষ্টিভঙ্গিতে। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ও শীর্ষ নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই এমন একটি সামাজিক কর্মসূচির কথা বলেছেন, যেখানে গৃহবন্দিত্বকে ‘পুরস্কৃত’ করা হবে, নারীদের কর্মঘণ্টা কমানো হবে এবং তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রিত হবে।
এই প্রস্তাবগুলো এমন এক মানসিকতার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা- যা বাংলাদেশের ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, তা একটি ‘সমস্যা’ হিসেবে বিবেচিত। যে দেশে নারীরা আনুষ্ঠানিক শ্রমশক্তির প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং তৈরি পোশাক খাতের মেরুদণ্ড, সেখানে এ ধরনের নীতি কার্যত জাতীয় পশ্চাৎপসরণের নকশা।
বাদ দেয়ার এই বিষয়টি ইতিমধ্যেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। জামায়াতের নির্বাচিত নীতিনির্ধারণী পরিষদে একজন নারীও নেই। যখন শীর্ষ নেতারা বলেন, নারীরা কেবল নারীদের সামনেই পারফর্ম করবে, তখন তা নারীদের জনজীবন, গণমাধ্যম ও শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে মুছে ফেলার ইঙ্গিত দেয়। এমনকি আনুষ্ঠানিক আইন ছাড়াও বিপদ লুকিয়ে আছে ‘নৈতিক নজরদারিতে’- সমাজের চাপের মাধ্যমে ‘গ্রহণযোগ্য’ আচরণ চাপিয়ে দেয়ার ভিতর। এর একটি ঝলক আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি।
গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ‘সঠিকভাবে’ ওড়না না পরার অভিযোগে প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি গ্রেপ্তার হওয়ার পর ‘তৌহিদী জনতা’ নামে একটি ইসলামপন্থী গোষ্ঠী তার মুক্তির দাবিতে রাস্তায় নামে। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পেলে তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হয়।

এই দৃশ্য একটি নির্মম বার্তা দেয়। তাহলো নৈতিক নজরদারি আইনি প্রক্রিয়াকে ছাপিয়ে যেতে পারে এবং জনসম্মুখে ভয় দেখানোই ফল নির্ধারণ করতে পারে। যখন আদর্শগত কর্তৃত্ব আদালতের বদলে পাড়ায় মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন ন্যায়বিচার হয়ে ওঠে এক ধরনের প্রদর্শনী, আর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার জায়গা নেয় জনতার শাসন।
এক্ষেত্রে বৈশ্বিক যে অভিজ্ঞতা তা গঠনমুলক শিক্ষা দেয়। তুরস্কে একেপি সাংবিধানিক আনুগত্যের কথা বলতে বলতে ধীরে ধীরে রক্ষণশীল সামাজিক মানদণ্ড চাপিয়ে দিয়েছে। আর সেই ধারার শেষ প্রান্তে আফগানিস্তান, যেখানে নারীদের সম্পূর্ণভাবে জনজীবন থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। জামায়াতের সাম্প্রতিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ইশারা, যেমন একজন হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন হলো আদর্শগত রূপান্তরের চেয়ে রাজনৈতিক কৌশলই বেশি।
যে ব্যবস্থা ধর্মীয় নৈতিকতা থেকে বৈধতা নিয়ে নেয়, সেখানে সংখ্যালঘুদের হয়তো সহ্য করা হয়, কিন্তু সমান নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা যায় না। এমন কাঠামোয় ভিন্নমত সহজেই ‘বিশ্বাসের অবমাননা’ হিসেবে চিহ্নিত হয়, আর মতভেদ পরিণত হয় নৈতিক অপরাধে, গণতান্ত্রিক অধিকারে নয়।
দার্শনিক কার্ল পপার সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, অসীম সহনশীলতা শেষ পর্যন্ত সহনশীলতার বিলুপ্তি ডেকে আনে। বাংলাদেশের সামনে বিপদ কেবল ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া কর্তৃত্ববাদ নয়; বরং পাশ থেকে স্বঘোষিত নৈতিক প্রহরীদের মাধ্যমে প্রয়োগ করা এক ধরনের অত্যাচার।
অতীতের ব্যর্থতায় বাংলাদেশের ভোটাররা স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্ত। কিন্তু পরিবর্তনকে অগ্রগতি বলে ভুল করা উচিত নয়। যদি জামায়াত নৈতিকতার একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তবে তারা আইনি জবাবদিহিতার জায়গায় নৈতিক নিশ্চিতকরণের বিষয় বসাবে। আর প্রথম যে জিনিসটি বলি হবে, তা হলো সেই বহুত্ববাদ, যার সুযোগে তারা নিজেরাই উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন এক সজাগ জনগণের ওপর, যারা নৈতিক প্ররোচনা ও নৈতিক জবরদস্তির পার্থক্য বুঝতে পারে। প্রশ্ন একটাই- গুণের মুখোশে লুকানো একরূপি দাবির সামনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র কি টিকে থাকতে পারবে?

(লেখিকা একজন সাংবাদিক এবং রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে একাধিক জনপ্রিয় টেলিভিশন টকশো সঞ্চালক। অনলাইন এশিয়া টাইমস থেকে তার লেখার অনুবাদ) মানবজমিন

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions