এরপর কী?

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬
  • ১০ দেখা হয়েছে

ডেস্ক রির্পোট:- ইরানের নেতৃত্বে নাটকীয় পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ অভিযানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কেননা, এই ঘটনা শুধু একটি দেশের শীর্ষ নেতার মৃত্যু নয়, বরং এটি সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং শক্তির ব্যবহারের সীমা নিয়ে নতুন বিতর্ক উস্কে দিয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পূর্বানুমানযোগ্যতার ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। যদি কোনো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতাকে সরাসরি সামরিক অভিযানে হত্যা করা গ্রহণযোগ্য কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক আইন কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। সমালোচকদের ভাষ্য, এতে এমন বার্তা যায়- ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো প্রয়োজনে নিয়ম ভাঙতে করতে পারে।

এ প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করেছে। হতাহতের এ ঘটনায় আঞ্চলিক জনমত ক্ষুব্ধ। বহু বিশ্লেষক বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও গ্লোবাল সাউথের মানুষের কাছে প্রশ্নটি কেবল কূটনৈতিক ভাষা নয়, বরং মানবিক অবস্থান কতোটা স্পষ্টভাবে নেয়া হচ্ছে- সেটিই এখন মুখ্য। তাদের মতে, নীরবতা অনেক সময় নিরপেক্ষতার পরিবর্তে পক্ষপাতের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আয়াতুল্লাহ খামেনি দীর্ঘ সময় ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার সমর্থকদের কাছে তিনি পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। ইরানের বাইরে বহু শিয়া সমপ্রদায়ের মধ্যেও তার প্রভাব অত্যন্ত গভীর। ফলে তার মৃত্যু প্রতীকী অভিঘাত তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইসরাইলবিরোধী মনোভাব জোরদার করতে এবং পশ্চিমের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।

তবে মূল প্রশ্ন এখন উত্তরাধিকার নিয়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ আলি রেজা আরাফিকে অস্থায়ীভাবে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালনের জন্য গঠিত নেতৃত্ব পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞ পরিষদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। বিশ্লেষকদের মতে, এ নিয়োগের মাধ্যমে তেহরান সংকটেও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বার্তা দিয়েছে।

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামোর শীর্ষ স্তরকে দুর্বল করা। যা কৌশলগত ভাষায় ‘ডিক্যাপিটেশন’ হিসেবে পরিচিত। ধারণা হলো, নেতৃত্বশূন্যতা সৃষ্টি করলে রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হবে। তবে ইরান বহু দশক ধরে নিষেধাজ্ঞা ও বহিরাগত চাপের মধ্যে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে দেশটি উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রস্তুত ছিল বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রয়াত নেতার পুত্র মোজতবা খামেনির নাম ঘুরে ফিরে আসছে। ধারাবাহিকতার প্রশ্নে এটি একটি সম্ভাবনা হলেও, বংশগত উত্তরাধিকার প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

আরেকটি আলোচিত নাম হাসান খোমেনি। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লা খোমেনির নাতি। খোমেনি পরিবারের প্রতীকী গুরুত্ব এখনো প্রবল। তবে প্রতীকী পুঁজি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতোটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য আলেমদের মধ্যেও কয়েকটি নাম আলোচনায় আছে। পাশাপাশি সাবেক সংসদ স্পিকার আলি লারিজানিকে অনেকেই সম্ভাব্য ‘পাওয়ার ব্রোকার’ হিসেবে দেখছেন। যিনি অভিজাত মহলে সমঝোতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারেন।

এ পরিস্থিতিতে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পেলে কঠোর অবস্থান আরও জোরদার হতে পারে। যুদ্ধকালীন পরিবেশে রাজনৈতিক অভিজাতরা সাধারণত স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দেন।

তবে ইতিহাস দেখায়, ‘ডিক্যাপিটেশন’ কৌশল সবসময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না। অনেক ক্ষেত্রে তা অভ্যন্তরীণ সংহতি বাড়ায় এবং নেতৃত্ব দ্রুত পুনর্গঠিত হয়। ইরানে অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের দ্রুত ঘোষণা সেই ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

খামেনির মৃত্যু এক যুগের অবসান ঘটালেও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ব্যক্তি-নির্ভর নয় বলেই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, রাষ্ট্রব্যবস্থা নতুন ভারসাম্য খুঁজে নেবে এবং সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ায় উত্তরসূরি নির্ধারণ করবে।
সবশেষে বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা- বাইরের শক্তি দিয়ে রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে দেয়ার চেষ্টা প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা ডেকে আনে। মধ্যপ্রাচ্যের সামপ্রতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নয়, যেখানে শাসনব্যবস্থা দুর্বল করার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয়ে গড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি কোন পথে এগোবে, তা নির্ভর করবে তেহরানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

আহমেদিনেজাদ নিহত
এই রিপোর্ট লেখার সময় জেরুজালেম পোস্টের এক খবরে বলা হয়েছে, ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদ নিহত হয়েছেন। ইরানের লেবার নিউজ এজেন্সির বরাতে এ খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। এতে বলা হয়, ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত হন সাবেক ওই প্রেসিডেন্ট। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। এদিকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইসরাইলের ৯ ও যুক্তরাষ্ট্রের ৩ সেনা নিহত হওয়ার খবর দেয় আল জাজিরা। আয়রন ডোম ফাঁকি নিয়ে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এতে তেল আবিবের জনগণকে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটাছুটি করতে দেখা যায়।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions