শিরোনাম
পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিমুখী নির্বাচনী বাস্তবতা উত্তাপ, নীরবতা ও নেপথ্য সমঝোতার রাজনীতি পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচন ও সংবিধান: রাষ্ট্র কি নীরবে সীমান্ত হারাচ্ছে? পার্বত্য চট্টগ্রামের ভোট: ব্যালট নয়, ভয়ের রাজনীতি ও রাষ্ট্রের নীরব পশ্চাদপসরণ পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচন: ভোট নয়, ক্ষমতার অদৃশ্য মানচিত্র রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে ভোটের সরঞ্জাম ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট লোকবল সন্ন নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ভূমিকা ইরানের সঙ্গে খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে–ডনাল্ড ট্রাম্প ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র পাহারায় সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষাধিক সদস্যসহ  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ৮ লাখ সদস্য প্রস্তুত ১০ সংস্থা থেকে ২৮ হাজার পর্যবেক্ষক সক্ষমতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন,বিএনপি গত ১ ফেব্রুয়ারি সিইসির কাছে অভিযোগ জানায় ফেনসিডিলের বিকল্প চার নেশার সিরাপের ঢল

সন্ন নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ভূমিকা

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ দেখা হয়েছে

মো. বায়েজিদ সরোয়ার:- জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ন। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এই বাহিনীগুলোর ওপর জাতির প্রত্যাশা এবার অনেক বেশি। দৈনিক বনিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: “সেনাবাহিনীর পেশাদারত্বের ওপরই গণতন্ত্রের উত্তরণ” (৮ ফেব্রুয়ারি)। এটি বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর জন্য একটি এসিড টেস্ট বলা যেতে পারে। পরম আস্থায় সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের জনগণ। এটি সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি পূনঃ গঠনের অসামান্য সুযোগ বটে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জন্মলগ্ন থেকেই নিজস্ব পেশাগত কর্মকান্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় নিয়োজিত হয়ে আসছে। এ সহায়তার একটি অন্যতম ক্ষেত্র হলো স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান। স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় ইন-এইড টু সিভিল পাওয়ার-এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়ে থাকে।

সাংবিধানিক অনুমোদন
বাংলাদেশের সংবিধান মোতাবেক যে কোন নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়ন মূলত নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত। তবে সেনাবাহিনী সর্বদা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির সচিবালয় বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ) থেকে লিখিত নির্দেশনা পাপ্তির পর প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনা মোতায়ন করে থাকে। স্বাধীনতা লাভের পর বিগত ৫৪ বছরে ১২টি জাতীয়ও আনুমানিক ১০টি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন হয়েছিল। নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনী মোতায়েন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতীকে পরিনত হয়েছে।

নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্বে সেনাবাহিনী-পাকিস্তান পর্ব
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক (পাকিস্তানের) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই অঞলে নিয়োজিত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটসহ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করেছিল। এ প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক লিখেছেন- “১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা সহায়তা প্রদানমুলক কর্তব্য পালনের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। আমার দায়িত্বপূর্ন (২য় ইষ্ট বেঙ্গল) এলাকা ছিল বর্তমান শেরপুর জেলার যেটা তৎকালীন জামালপুর মহকুমার অংশ ছিল” (সমকালীন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ ও অন্যান্য, ২০১৫)। ২৯ ক্যাভালরি ইউনিটের (রংপুর সেনানিবাস) অফিসার হিসেবে মেজর নাসির উদ্দিন তৎকালীন বৃহত্তর রংপুরের কুড়িগ্রাম মহকুমায় নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন করেছিলেন (যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা, ১৯৯২)।

নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব-বাংলাদেশ পর্ব
বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বচান অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে ৭ মার্চ। একটু নতুন স্বাধীন দেশ হিসেবে আইন শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক অবকাঠামো তখনও মজবুত হয়ে উঠতে পারেনি। এমতাবস্থায়, তৎকালীন সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনী নিয়োগ করে।
আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে সেনাবাহিনীর নির্বাচন বিষয়ক দায়িত্ব পালন-নামিবিয়া থেকে সাউথ সুদান
১৯৮৯ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৯০ সালের মার্চ পর্যন্ত আফ্রিকার নামিবিয়াতে শান্তি মিশন (আনট্যাগ) পরিচালিত হয়। এটি ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় মিশন এবং বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম মিশন। এখানে ১৯৮৯ এর নভেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীগণ অর্থাৎ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যগণ বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করেন। পুলিশ কর্মকর্তা এন কে এন ইসলাম তাঁর গ্রন্থ “আমার দেখা নামিবিয়া’তে (১৯৯১)” নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথা চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।

কম্বোডিয়ায় ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশের শান্তিসেনা
১৯৯২-১৯৯৩ সালে কম্বোডিয়ার শান্তি মিশনে, (আনটাক) এক পর্যায়ে দেশটির পরিস্থিতি মারাত্মক সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতীতে নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব কিনা সেটা নিয়ে জাতিসংঘও দ্বিধায় পড়েছিল। এই সঙ্কটকালে লেঃ কর্নেল খোন্দকার কামালুজ্জামানের (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ান (৩য় ইষ্ট বেঙ্গল) দায়িত্বপূর্ণ প্রদেশে অত্যন্ত সাহসীকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এমন উদাহরণ অন্যান্য দেশের শান্তিরক্ষীদের অনুপ্রাণিত করে। পাল্টে যায় সমগ্র দৃশ্যপট। খেমাররুজ দলের ব্যাপক সহিংসতার মুখেও সিয়ামরিপ প্রদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গৃহযুদ্ধ থেকে শান্তির পথে এগিয়ে যায় কম্বোডিয়া।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের এই সাহসী ভূমিকা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রসংশা পেয়েছিল। কম্বোডিয়ায় নির্বাচনের দিনে (মে, ১৯৯৩) দূধর্ষ খেমাররুজ বাহিনী বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার একটি নির্বাচন কেন্দ্রে আক্রমণ করে। তবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীগণ সেই আক্রমণ প্রতিহত করে। তবে এক পর্যায়ে কমিউনিস্ট খেমাররুজ বাহিনীর রকেট লঞ্চারের আঘাতে চৌকষ বাংলাদেশী সেনাকর্মকর্তা মেজর তামিম আহম্মেদ চৌধুরী (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) মারাত্মকভাবে আহত হন।
একজন শান্তিরক্ষী হিসেবে (সামরিক পর্যবেক্ষক) এই নিবন্ধকার কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ানের শান্তি রক্ষা কার্যক্রম খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেসব ঘটনার কিছু বিবরণ লেখার (কম্বোডিয়া: শান্তিসেনার জার্নাল) তাঁর সুযোগ হয়েছিল। পরবর্তীতে সিয়েরালিওন, লাইবেরিয়া, আইভরি কোষ্ট, দক্ষিণ সুদানসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে নিরাপত্তা সহায়তা দিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশের শান্তিরক্ষিগণ অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

দূর্গম পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বাচন পরিচালনা
পার্বত্য চট্টগ্রামের দূর্গম, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও বিশেষত শান্তি বাহিনী/সন্ত্রাসী প্রভাবিত এলাকায় নির্বাচনে নিরাপত্তা প্রদান করা অত্যান্ত চ্যালেঞ্জিং বিষয়। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত শান্তি বাহিনীর আক্রমণ ও হুমকির মুখেও সেনাবাহিনীসহ পাহাড়ে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ সহায়তায় সরকার সেখানে নির্বাচন পরিচালনা করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচনকালে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ১৯৭৭ সালের মে মাসে গণভোটের দিন রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী এলাকায় (বাঙালহালিয়া) একটি সেনা টহলের উপর শান্তি বাহিনী একটি ভয়ঙ্কর এমবুস পরিচালনা করে। এতে ১৭জন সৈনিক নিহত হন।
১৯৮৬ সালের ৭ ৩য় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের সময় আমাদের ইউনিট (২৫ ইষ্ট বেঙ্গল) রাঙামাটি জেলার দক্ষিণে বিলাইছড়ি-ফারুয়া অঞ্চলে নিয়োজিত ছিল। তখন পাহাড়ে শান্তি বাহিনীর বিদ্রোহ বা ইন্সারজেন্সির বসন্ত। সেই অশান্ত পরিবেশে আমাদের নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল। সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বি কে দেওয়ান (পরবর্তীতে প্রতিমন্ত্রী) এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৮৯ সালের ২৫ জুন প্রথমবারের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলাতেই একযোগে স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পাহাড়ের এই আলোচিত নির্বাচনে সেনাবাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক নিরাপত্তা-সহায়তা প্রদান করে। শান্তিচূক্তির (১৯৯৭) পরও পাহাড়ে পার্থিত শান্তি ফেরেনি। শান্তিবাহিনীর মতো শক্তিশালী না হলেও বর্তমানে প্রায় ৫ টি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী কমবেশী সক্রিয় রয়েছে। ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ উপজেলা নির্বাচনকালে, রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ৭ জন নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যক্তি নিহত হয়।

নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রথাগত ভূমিকা
বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনী সাধারণত “স্ট্রাইকিং ফোর্স” হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। তাদের মূল দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, সংঘর্ষ, নাশকতা কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। এসব পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী দ্রুত মোতায়েন হয়ে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সক্ষম।
দ্বিতীয়ত, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ভোটারদের আস্থা ও সাহস জোগায়, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ বা স্পর্শকাতর এলাকায়।
তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা প্রদান। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় সেনাবাহিনী চলাফেরা করে এবং প্রয়োজনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে সহায়তা করে।
চতুর্থত, অস্ত্র ও সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমে সহায়তা। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী তৎপরতা দমন এবং বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা অনস্বীকার্য।

অন্যান্য বাহিনীর ভূমিকা
সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও র‍্যাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ রোধে সক্রিয় থাকে। উপকূলীয় ও নদীঘেঁষা এলাকায় কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। প্রয়োজনে বিমান বাহিনী লজিস্টিক ও জরুরি সহায়তা প্রদান করে।

সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্রবাহিনীর সামনে চ্যালেঞ্জ সমূহ
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
প্রথমত, নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত পরিবেশে সেনাবাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পেশাদার অবস্থান ধরে রাখা। যেকোনো পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও উত্তেজনা। তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন মাঠপর্যায়ে সেনা সদস্যদের জন্য কাজ কঠিন করে তুলতে পারে।
তৃতীয়ত, গুজব ও অপপ্রচার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ঘিরে ভুয়া তথ্য বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
চতুর্থত, আইনি সীমাবদ্ধতা ও মানবাধিকার প্রশ্ন। দায়িত্ব পালনের সময় বলপ্রয়োগ যেন আইনসম্মত ও মানবাধিকারসম্মত হয়-এ বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সতর্কতার দাবি রাখে।

এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তূতি
এরই মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে সশস্ত্রবাহিনী আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সক্রিয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা নিতে প্রস্তুত হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও বার বার বলা হচ্ছে সংঘাত এড়িয়ে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনে তারা বদ্ধপরিকর। এরই মধ্যে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেফতারে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অনেক দিন পর সেনাবাহিনীকে পুনরায় আইনশৃংখলা বাহিনীর অংশ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও ম্যাজিস্ট্রেসির ক্ষমতা থাকায় সেনাবাহিনীর কার্যক্রম অধিকতর কার্যকর হবে।
এবার বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌ বাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ড ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র‍্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩, চৌকিদার-দফাদারের ৪৫ হাজার ৮২০ জন সদস্য মোতায়েন করা হবে।

নাগরিকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করতে হবে-সেনাপ্রধান
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা জোরদারের নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার- উজ-জামান। তিনি বলেছেন, দায়িত্ব পালনকালে পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নাগরিকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।

ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে
‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে গুলিস্তানের রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সেনা সদর। সেখানে সেনা সদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয়, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে সশস্ত্র বাহিনী। অতীতের নির্বাচনগুলোতে এ দায়িত্ব ছিল না। এ কারণে এবারের নির্বাচনে এক লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪২ হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন থাকতেন।
মনজুর হোসেন বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাচন-সংক্রান্ত পরিপত্রে সশস্ত্র বাহিনীকে ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা আগে ছিল না। অতীতে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দূরে অবস্থান করা হলেও এবার প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি দায়িত্ব পালন করা হবে।
সেনাপ্রধান নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ে দুটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এক, অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস। দুই, সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচনের প্রতি আস্থা তৈরি।
দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে নির্বাচনী সরঞ্জাম ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের পরিবহনে সামরিক হেলিকপ্টার ও জলযান প্রস্তুত থাকবে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন বলেন- দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে আগেই হেলিকপ্টার মোতায়েন থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যকে বড় হুমকি উল্লেখ করে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান এই সেনা কর্মকর্তা।

আল জাজিরা পত্রিকা-বাংলাদেশের নির্বাচনে এখনো নেপথ্যের শক্তি কি সেনাবাহিনী?
২৯ জানুয়ারী কাতার ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রভাব ও ভূমিকা নিয়ে একটি বিশ্লেষন ধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় “সেনাবাহিনী বর্তমানে জনশৃঙ্খলার সবচেয়ে দৃশ্যমান গ্যারান্টার হিসাবে ভোটের পরিবেশ কেন্দ্রে চলে এসেছে।”

রাওয়া সেমিনারে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা
গত ৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে রাওয়া’র থিংক ট্যাঙ্ক ‘রাওয়া রিসার্চ এন্ড স্টাডি ফোরাম’ (আরআরএসএফ) ‘নির্বাচন ২০২৬’: জাতীয় ঐক্য ও প্রত্যাশা শীর্ষক এক সেমিনার আয়োজন করে। নির্বাচন ঘিরে অস্থিরতা তৈরিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করে মেজর নিয়াজ আহমেদ জাবের (অব.) বলেন- “একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ব্যর্থ হওয়া মানে জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জণকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করা”।
লেঃ কর্নেল আবু ইউসুফ জোবায়ের উল্লাহ (অব.) আগামীর বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব আরোপ করে বলেন- “আমাদের জন্য আজ প্রয়োজন একদল সৎ ও সাহসী মানুষের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের”। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গণি (অব.) ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের বদলে জনস্বার্থ রক্ষায় যোগ্য, সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘এখন ভোট রক্ষা করার অর্থ কেবল নির্বাচনে জয়ী হওয়া নয়, বরং রাষ্ট্রকে রক্ষা করা।’
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, “একটি প্রতিবেশী দেশ আমাদের নির্বাচন ভণ্ডুল করতে এবং এখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। অস্থিরতা তৈরি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। তাই সামনে চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”। কর্নেল হারুন-অর-রশীদ খানের (অব.) সভাপতিত্বে সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন লে. কর্নেল মোদাসসের হোসেন, বীর প্রতীক (অব.) ও লেঃ জেনারেল আমিনুল করিম (অব.) প্রমুখ।

বিগত ৩ টি নির্বাচন ও সশস্ত্রবাহিনীর ভাবমূর্তি
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত ৩ টি নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ আছে যে, আনুষ্ঠানিকভাবে সেনামোতায়েন থাকলেও সেসব নির্বাচনে কোথাও কোথাও অনিয়মের দৃশ্যমান অভিযোগ উঠলেও সেই সময় তাদের ভূমিকা ছিল নিস্ক্রিয়। এবারের নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক বাহিনীটির জন্য একধরনের ভাবমূর্তি পূনঃ গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচনের মাঠে যদি সেনাবাহিনী সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ থেকে ভোটার, প্রার্থী ও এজেন্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, কেন্দ্রভিত্তিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি অনিয়ম-সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়, তাহলে নির্বাচনে অতীতের বিতর্ককে ছাপিয়ে পেশাদারত্বের একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী আমলের গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তাতে এবারের নির্বাচন সেনাবাহিনীর জন্য কেবল দায়িত্ব পালন নয় বরং পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা দৃশ্যমানভাবে প্রমাণ করার বড় সুযোগ। যার মধ্যে দিয়ে গত কয়েক বছরের বিতর্ক ও আস্থার ঘাটতি কাটিয়ে সেনাবাহিনী নিজেদের ভূমিকা ও ভাবমূর্তি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারবেন।

সশস্ত্র বাহিনীকে যেসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে
বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে আসছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তাদের ভূমিকা হবে নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা। একই সঙ্গে নিরপেক্ষতা, সংযম ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখাই হবে এই বাহিনীগুলোর সবচেয়ে বড় সাফল্য।
আসন্ন নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর, পারস্পরিক অবিশ্বাস প্রবল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচারের বিস্তার উদ্বেগজনক। এই বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, সংযম ও নিরপেক্ষ আচরণই হতে পারে উত্তেজনা প্রশমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়-তাদের আচরণ যদি দায়িত্বশীল না হয়, তবে কোনো বাহিনীর পক্ষেই নির্বাচনকে পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ রাখা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক মহলও এই নির্বাচন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করবে। সে ক্ষেত্রে সশস্ত্রবাহিনী নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে-যে বাংলাদেশ গণতন্ত্র রক্ষায় প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম।

শেষের কথা
সবশেষে বলা যায়, আসন্ন নির্বাচনে সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকা হবে আস্থা ও দায়িত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই হবে সশস্ত্রবাহিনীর সবচেয়ে বড় সাফল্য। সেই সাফল্যের মধ্য দিয়েই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আরও দৃঢ় হতে পারে। এই দায়িত্বে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্রবাহিনীর ব্যর্থ হওয়ার কোন সুযোগ নেই।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক
bayezidsarwar792@gmail.com

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions