শিরোনাম
ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ! সিসি ও বডি–ওর্ন ক্যামেরা থেকে ফুটেজ নেয়ার পরামর্শ যেসব কারণে ভোট বাতিল হতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিমুখী নির্বাচনী বাস্তবতা উত্তাপ, নীরবতা ও নেপথ্য সমঝোতার রাজনীতি পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচন ও সংবিধান: রাষ্ট্র কি নীরবে সীমান্ত হারাচ্ছে? পার্বত্য চট্টগ্রামের ভোট: ব্যালট নয়, ভয়ের রাজনীতি ও রাষ্ট্রের নীরব পশ্চাদপসরণ পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচন: ভোট নয়, ক্ষমতার অদৃশ্য মানচিত্র রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে ভোটের সরঞ্জাম ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট লোকবল সন্ন নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ভূমিকা ইরানের সঙ্গে খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে–ডনাল্ড ট্রাম্প ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র পাহারায় সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষাধিক সদস্যসহ  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ৮ লাখ সদস্য প্রস্তুত

পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিমুখী নির্বাচনী বাস্তবতা উত্তাপ, নীরবতা ও নেপথ্য সমঝোতার রাজনীতি

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪২ দেখা হয়েছে

শামসুল আলম:-ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে যখন রাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রচারণা ও হিসাব-নিকাশ চরমে, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান—তিন ভিন্নধর্মী নির্বাচনী বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। কোথাও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কোথাও প্রায় নিস্তব্ধ মাঠ, আবার কোথাও নেপথ্য সমঝোতার অভিযোগে একতরফা নির্বাচনী সমীকরণ—এই ভিন্ন চিত্র শুধু নির্বাচন নয়, বরং পাহাড়ের ভবিষ্যৎ ক্ষমতা কাঠামো, জাতিগত ভারসাম্য ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে।
রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে উত্তাপহীন নির্বাচন
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে নির্বাচনী মাঠে দৃশ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলকভাবে কম। অভিযোগ রয়েছে, আঞ্চলিক রাজনীতির নেপথ্য সমঝোতার কারণে এই দুই জেলায় মূলধারার বিরোধিতা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
খাগড়াছড়িতে আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) প্রার্থী দিলেও রাঙ্গামাটি,বান্দরবানে দলটির কার্যক্রম সীমিত থাকায় সেখানে তারা প্রার্থী দিতে পারেনি। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) তিন পার্বত্য জেলায় কোনো সরাসরি প্রার্থী দেয়নি। স্থানীয়দের দাবি, বিএনপির সঙ্গে গোপন রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবেই জেএসএস এই কৌশল নিয়েছে।
রাঙ্গামাটিতে জামায়াতে ইসলামী সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে জোটের অংশ হিসেবে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. আবু বক্কর মোল্লাকে রিকশা প্রতীক দেয়। বান্দরবানেও একই কৌশলে এনসিপির প্রার্থী সুজা শাপলা কলিকে সামনে আনা হয়। ফলে রাঙ্গামাটিতে বিএনপির প্রার্থী দীপেন দেওয়ান এবং বান্দরবানে সাচিং প্রু জেরি কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বীহীন সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যান বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
ইউপিডিএফ প্রার্থী থাকলেও প্রভাব সীমিত
রাঙ্গামাটিতে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থী পাভেল চাকমা ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে থাকলেও জেলার অধিকাংশ উপজেলায় জেএসএসের সাংগঠনিক ও সামাজিক প্রভাবের কারণে তার প্রচারণা ও ভোট সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কাউখালী, কাপ্তাই, নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়ির সাজেক এলাকায় ইউপিডিএফের কিছু প্রভাব থাকলেও জেলার বৃহৎ অংশে জেএসএসের আধিপত্য দৃশ্যমান।
পাভেল চাকমার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, তাকে ভোট না দিতে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এ বিষয়ে নিরাপত্তা চেয়ে তিনি সাধারণ ডায়েরি করেছেন এবং রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছেও লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন।
বান্দরবানে পরিস্থিতি আরও একতরফা বলে স্থানীয়দের দাবি। সুজা শাপলা কলির ভোটকেন্দ্রিক শক্ত অবস্থান না থাকায় বাঙালি ও পাহাড়ি উভয় ভোটই সাচিং প্রু জেরির দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি: দেশের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন
তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে খাগড়াছড়ি যেন সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি এবারের নির্বাচনে দেশের অন্যতম সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন। মোট ১১ জন প্রার্থী থাকলেও বাস্তব লড়াই সীমাবদ্ধ হয়ে এসেছে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতায়—বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইউপিডিএফ।
বিএনপির প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভুঁইয়া, যিনি ২০০১ সালে এই আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন, একজন প্রভাবশালী বাঙালি নেতা হিসেবে পরিচিত। তার শক্ত অবস্থান ইউপিডিএফ ও জেএসএসকে শঙ্কিত করেছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
এরই প্রেক্ষিতে ইউপিডিএফ ধর্মজ্যোতি চাকমাকে ঘোড়া প্রতীক দিয়ে এবং জেএসএস বিএনপির বহিষ্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থী সমীরণ দেওয়ানকে মাঠে নামিয়েছে। তবে জেলায় জেএসএসের সরাসরি সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ সীমিত থাকায় তার প্রভাবও প্রশ্নের মুখে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মো. এয়াকুব আলী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে অপ্রত্যাশিত জনসমর্থন তৈরি করেছেন। প্রচারণা পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ত্রিপুরা নারীদের একটি অংশসহ চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর কিছু ভোটার তার দিকে ঝুঁকছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়িতে মোট ভোটার ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৬৪ জন। এর মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি বাঙালি ভোটার। তবে বাঙালি ভোট যদি বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বিভক্ত হয়, তাহলে পাহাড়ি ভোটের বড় অংশ ইউপিডিএফের পক্ষে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, পাহাড়ি গ্রামগুলোতে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, জেলার ২০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৮৯টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬৮টি ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত—যা নিরাপত্তা উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বৃহত্তর রাজনৈতিক তাৎপর্য
পার্বত্য বাঙালি সংগঠনগুলোর মতে, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে শক্তিশালী বাঙালি প্রার্থী না থাকায় সেখানে আঞ্চলিক দলগুলো সরাসরি প্রার্থী দেয়নি। কিন্তু খাগড়াছড়িতে শক্তিশালী বাঙালি প্রার্থী থাকায় ইউপিডিএফ ও জেএসএস সক্রিয় হয়েছে। এতে পাহাড়ে বাঙালি অনৈক্য ও আঞ্চলিক ঐক্যের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে তারা মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন নিছক একটি ভোটযুদ্ধ নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষমতা, নিরাপত্তা, ভূমি অধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের অংশ। এই প্রেক্ষাপটে খাগড়াছড়িতে যে প্রার্থীই বিজয়ী হোন না কেন, তার প্রভাব তিন পার্বত্য জেলার রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী হবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com
Website Design By Kidarkar It solutions