
গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া অবস্থানে রয়েছে। এর বিরোধীতাকারীদের শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এতে ওয়াশিংটন ও ইউরোপের মধ্যে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির জবাবে ইউরোপ আপসের পথে যাবে না—এমন বার্তা দিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। ইউরোপীয় ঐক্য জোরালো হয়েছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে বিরোধিতা চললে আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কসহ ইউরোপের আটটি মিত্র দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করতে পারে—এমন সতর্কবার্তা আগেই দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তালিকায় রয়েছে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন ও যুক্তরাজ্য। এই হুমকির পরই ইউরোপজুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ে এবং দেশগুলোর অবস্থান নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়।
ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করে ট্রাম্প প্রয়োজনে কঠোর পথ নেয়ার কথাও উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক মহলে তার এ বক্তব্য সমালোচনার জন্ম দেয়। শুল্ক-হুমকির আওতায় থাকা ইউরোপীয় দেশগুলো এক যৌথ প্রতিক্রিয়ায় সতর্ক করে জানায়, এ ধরনের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। একই সঙ্গে তারা ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এবং ন্যাটোর সদস্য হিসেবে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। সংলাপের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার নীতিকে অটল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন এবং সংঘাত এড়ানোর আহ্বান জানান। ইউরোপজুড়ে যে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মতে, ইউরোপীয় কমিউনিটির মৌলিক মূল্যবোধের প্রশ্নে এখন আরও দৃঢ় থাকা জরুরি।
এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে ফোনে আলোচনা করেন। পরে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গেও কথা বলেন। স্টারমারের কার্যালয় জানায়, গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ন্যাটোর সব সদস্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মিলিত নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে মিত্র দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ সঠিক বার্তা দেয় না।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আটটি দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যে প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে, যা ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই হার ২৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে এবং সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আরেক পোস্টে ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলেও উল্লেখ করেন।
গ্রিনল্যান্ড জনসংখ্যায় ছোট হলেও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এবং কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক তৎপরতা নজরদারিতে এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও মন্তব্য করেছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে—এমন ধারণাই ওয়াশিংটনের অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে।
সব মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও ইউরোপের দৃঢ় প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন এক উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে শুল্ক, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব—তিনটি বিষয়ই সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।