এসপির বাবার সম্পদের পাহাড়,ছেলেকে ধরতে গিয়ে দুদকের জালে বাবা

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় বুধবার, ১৫ মে, ২০২৪
  • ৩৪ দেখা হয়েছে

ডেস্ক রির্পোট:- পুলিশ কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের একটি অভিযোগের অনুসন্ধান করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাঁর অবৈধ সম্পদের তথ্য পেতে দীর্ঘদিন ধরে জাল পেতে ছিলেন দুদক কর্মকর্তারা। তবে অনুসন্ধানে পুলিশ কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের সন্ধান না মিললেও দুদকের জালে ধরা পড়ে যান তাঁর বাবা আবুল কাশেম। কামরুজ্জামান বর্তমানে জামালপুরে পুলিশ সুপার (এসপি) পদে কর্মরত এবং তাঁর বাবা আবুল কাশেম স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দিনাজপুরে রেশনের ডিলার ছিলেন।

দুদক সূত্র বলেছে, আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে দুই কো‌টি ৮২ লাখ ১২ হাজার ৩৫৪ টাকার সম্পদের তথ‌্য গোপন এবং ছয় কো‌টি ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৩৩৩ টাকার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। গত ৮ মে মামলাটি করেন সংস্থাটির দিনাজপুর সমন্বিত জেলা কার্যাল‌য়ের সহকারী প‌রিচালক নূ‌র আলম।

জানতে চাইলে নূর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০২০ সালের আগে মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

দুদকের সহকারী পরিচালক মানসী বিশ্বাস দীর্ঘদিন এই বিষয়ে অনুসন্ধান করেন। এ সময় তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে দুদকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁর বাবা আবুল কাশেমের সম্পদের তথ্য চেয়ে নোটিশ জারি করা হয়। এ সময় পুলিশ কর্মকর্তার বাবার দেওয়া তথ্যে বেশ কিছু গরমিল পাওয়া যায়।

তিনি আরো বলেন, ‘কামরুজ্জামানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের জন্য তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেন। এ সময় পুলিশ কর্মকর্তার বাবার নামে বিপুল সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসে। আবুল কাশেমের নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক হোটেল, রিসোর্টসহ বিপুল সম্পদের তথ্য পায় দুদক।’

মামলার এজাহা‌রে বলা হয়, অনুসন্ধানকালে ২০২০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আবুল কাশেম দুদক‌কে সাত কো‌টি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৮০ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেন। কিন্তু যাচাইকালে তাঁর নামে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে ১০ কো‌টি তিন লাখ ৮৫ হাজার ৯৩৪ টাকা মূ‌ল্যের সম্পদ পাওয়া যায়।

এতে কামরুজ্জা‌মা‌নের বাবা দুই কো‌টি ৮২ লাখ ১২ হাজার ৩৫৪ টাকার সম্পদের তথ‌্য গোপন ক‌রে‌ছেন ব‌লে অনুসন্ধা‌নে প্রমাণ পায় দুদক, য‌া দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এজাহার সূত্রে আরো জানা যায়, আবুল কাশেমের দেওয়া তথ্য অনুসারে তাঁর ৭৯ লাখ ছয় হাজার ৬৭৬ টাকা দায়দেনা রয়েছে। অন্যদিকে পারিবারিক ব্যয় ও কর পরিশোধ করেছেন এক কোটি ৩০ লাখ ৮৯ হাজার ৩০৮ টাকা। ঋণ ও ব্যয়ের হিসাব আমলে নিলে আবুল কাশেমের মোট সম্প‌দের প‌রিমাণ দাঁড়ায় ১০ কো‌টি ৫৫ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬৬ টাকা। কিন্তু এর বিপর‌ী‌তে তাঁর আয়ের প‌রিমাণ চার কো‌টি ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার ২৩৩ টাকা। অর্থাৎ পু‌লিশ কর্মকর্তা কামরুজ্জামা‌নের বাবা আবুল কা‌শেমের ছয় কো‌টি ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৩৩৩ টাকার আয় জ্ঞাত আয়ের উৎসবহির্ভূত। তিনি অবৈধ সম্পদ করেছেন বলে দুদ‌কের অনুসন্ধানে প্রমাণ মেলে। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় মামলা ক‌রা হ‌য়ে‌ছে।

দিনাজপুর ও সেন্ট মার্টিনে কাশেমের যত সম্পদ

দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ধরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় আবুল কাশেমের অঢেল সম্পদ রয়েছে। শহরের বাণিজ্যিক এলাকা মালদহপট্টিতে সড়কের পশ্চিম পাশে রয়েছে হোটেল ডায়মন্ড এবং পূর্ব পাশে রয়েছে হোটেল ডায়মন্ড বি। দুটি হোটেলই ছয়তলা করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব হোটেলে এক রাত থাকতে ৯০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। দুটি হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ জমির ওপর, যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক পাঁচ কোটি টাকা।

সেখান থেকে একটু সামনে এগোলে চুড়িপট্টিতে রয়েছে আবুল কাশেমের দুটি বাড়ি। বাড়ি দুটির একটি সাড়ে ৫ শতাংশ জমির ওপর চারতলা এবং অন্যটি সাড়ে ৮ শতাংশ জমির ওপর তিনতলা। বাড়ি দুটির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ছয় কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, দিনাজপুরে তিনটি রাইস মিল রয়েছে আবুল কাশেমের। প্রায় ৪০ বিঘা জমির ওপর স্থাপন করা কাশেম রাইস মিল, রাসেল রাইস মিল ও পিংকী রাইস মিল। সদর উপজেলার ১ নম্বর তেলগাজী ইউনিয়নের পশ্চিম শিবরামপুর গ্রামে দিনাজপুর-দশমাইল মহাসড়কের তেলগাজী মাজারসংলগ্ন এলাকায় বিশাল জমিসহ রাইস মিলগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য অর্ধশত কোটি টাকার বেশি।

রাইস মিলগুলোর বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে কথা হয় কাশেম রাইস মিলের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) আজিজুল হকের সঙ্গে। আলাপকালে তিনি তিনটি মিলের মালিকানা আবুল কাশেমের বলে নিশ্চিত করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইউনিয়ন ব্যাংকের দিনাজপুর শাখায় আবুল কাশেমের ব্যাংক হিসাবে আড়াই কোটি টাকা জমা ছিল। দুদকের চিঠি পাওয়ার পর তড়িঘড়ি করে সেখান থেকে দেড় কোটি টাকা সরিয়ে ফেললেও কমিশনের বিশেষ অনুমতিক্রমে এক কোটি টাকা জব্দ করে দুদক।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, নিজের শহর থেকে অনেক দূরে পর্যটননগরী কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিনেও রয়েছে আবুল কাশেমের সম্পদ। সেন্ট মার্টিনের পশ্চিম বিচে হোটেল ডায়মন্ড সি রিসোর্টের মালিক তিনি। প্রায় ২২ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত রিসোর্টটির বর্তমান বাজারমূল্য কোটি টাকার বেশি।

দুদকের অনুসন্ধানের তথ্য মতে, দালিলিক নথিপত্রে আবুল কাশেমের এসব সম্পদের মূল্য সাড়ে ১০ কোটি টাকা হলেও বাস্তবে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য অর্ধশত কোটি টাকার বেশি। অথচ এসব সম্পদের বিপরীতে তাঁর আয়ের যথাযথ বৈধ উৎস নেই।

সরেজমিনে দিনাজপুরে অনুসন্ধান করে জানা যায়, আবুল কাশেমের বাবা মৃত আজিজুর রহমান পাকিস্তান আমলে পুলিশের চাকরি করতেন। বাবার চাকরি সূত্রে তাঁরা কুষ্টিয়া থেকে দিনাজপুরে স্থানান্তর হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রেশনব্যবস্থা চালু হলে দিনাজপুরে ডিলার হিসেবে কাজ শুরু করেন আবুল কাশেম। স্থানীয় লোকজন জানায়, তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি বলতে সেখানে কিছুই ছিল না।কালের কণ্ঠ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.net
Website Design By Kidarkar It solutions