শিলাবৃষ্টির ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পূর্বাভাসের বদল দরকার

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় বুধবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৪
  • ৫৬ দেখা হয়েছে

ডেস্ক রির্পোট:- দেশে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে হওয়া শিলাবৃষ্টি নীরবে ক্ষতি করে যাচ্ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে কৃষকের ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঘরবাড়ি, যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনা। শিলার আঘাতে মৃত্যুও ঘটছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর মোবাইল ফোনে মেসেজের মাধ্যমে ঝড়, বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টির মতো দুর্যোগের আগাম সতর্কতা জানানোর কথা বললেও এখনো তা চালু হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে শিলাবৃষ্টির ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসপ্রক্রিয়ার পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সিলেট ও সুনামগঞ্জে গত রবিবার রাতের ব্যাপক ঝড় ও শিলাবৃষ্টির পর শিলাবৃষ্টির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে। সেই রাতের শিলাবৃষ্টি প্রায় ১৫ মিনিট স্থায়ী হয়।

এ সময় আনুমানিক ২০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের শিলাও পড়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় পাঁচ শর বেশি ঘরবাড়ি-দোকানপাট আংশিক বা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহত হয়েছে এক শর বেশি মানুষ। সিলেটের গোলাপগঞ্জে ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে আহত হয়ে অন্তত ৪০ জন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা নিয়েছে।

তাদের প্রত্যেকের মাথায় সেলাই দিতে হয়েছে। হাওরের বোরো ফসলেরও ক্ষতি হয়েছে।

শিলাবৃষ্টি ও বড় শিলার পরিমাণ কি বাড়ছে

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বলেছে, শিলাবৃষ্টির তীব্রতা ও বড় শিলার পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। এ কথায় একমত জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট রিসার্চের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, ‘শিলাবৃষ্টি বাড়ছে।

জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় ১৪টি হ্যাজার্ড (দুর্যোগ) বাড়বে বলা হয়েছে। এর মধ্যে শিলাবৃষ্টিও আছে। অনেক দিন ধরেই আমরা বলছি যে বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি বাড়বে। তাই হচ্ছে।’

আইনুন নিশাত বলেন, ‘আগে সাধারণত মার্বেল আকৃতির ছোট ছোট শিলা পড়ত। কখনো কখনো কিছু বড় শিলা পড়ত। বেশি বড় শিলা আগে ৩০ বা ৫০ বছরে একবার হতো। কিন্তু এখন তা ঘন ঘন হতে পারে। এটাই তো জলবায়ু পরিবর্তনের চেহারা। বজ্রপাতের পরিমাণও আগের চেয়ে বেড়েছে। আবহাওয়ার এত দিনের নির্দিষ্ট প্যাটার্নগুলো ভেঙে গেছে। দিনে দিনে তা আরো অনিশ্চিত হবে।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, লেখক ও গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা সিলেটের শিলাবৃষ্টিকে অস্বাভাবিক না বললেও ‘বিরল’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আগের তুলনায় বড় শিলা হচ্ছে, এটা ঠিক। কিন্তু শিলাবৃষ্টি ও ঝড় এ সময় স্বাভাবিক। ঢাকা শহরে ১৯৮৬ সালে বড় শিলাবৃষ্টি হয়েছিল। এত বড় বড় শিলা পড়েছিল যে রাস্তায় থাকা বেশির ভাগ গাড়ির ক্ষতি হয়েছিল। ফলে এটা খুব অস্বাভাবিক না, কিন্তু রেয়ার (বিরল) বলা চলে।’

পুরনো সংবাদপত্র ঘেঁটে ২০১০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে উল্লেখযোগ্য বড় শিলাবৃষ্টির কয়েকটি ঘটনা পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালের ৩০ মার্চ লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঢাকা, পাবনা, গাইবান্ধা, সিলেট, যশোর ও মাগুরায় ঝড় ও ব্যাপক শিলাবৃষ্টি হয়। শিলার আঘাতে দুজনের মৃত্যু হয়। আহত হয় শতাধিক ব্যক্তি।

২০১৫ সালে সাতক্ষীরায় শিলাবৃষ্টিতে পাঁচ হাজার পাখি মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল বলে জানান আবহাওয়া অফিসের একজন বিশেষজ্ঞ। ২০১৯ সালে নড়াইলে এ রকম ঘটনায় কয়েক হাজার পাখির মৃত্যু হয়েছিল। ২০১০ সালের ২৭ মার্চ রাতে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ ও হাতীবান্ধা উপজেলায় ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে আট হাজারের বেশি কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার কথা জানা যায়। আহত হয় পঞ্চাশজনের বেশি।

আগাম সতর্কীকরণ প্রকল্পের অগ্রগতি কতদূর

বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় ও সরকারি অর্থায়নে বাংলাদেশ আঞ্চলিক আবহাওয়া ও জলবায়ু সেবা প্রকল্পের আওতায় ‘আবহাওয়া তথ্য সেবা ও আগাম সতর্কবাণী পদ্ধতি জোরদারকরণ (কম্পোনেন্ট-এ)’ শীর্ষক একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। মেয়াদ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত। এ প্রকল্পের আওতায় দুর্যোগ, তাত্ক্ষণিক বা জরুরি যেকোনো আবহাওয়ার ঘটনায় মোবাইল ফোনে মেসেজ দিয়ে সতর্ক করার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।”

প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক আহমেদ আরিফ রশিদ বলেন, ‘প্রকল্পের অন্য কাজগুলো হয়ে গেছে। এসএমএসের মাধ্যমে আগাম সতর্ক (আর্লি ওয়ার্নিং) করার কাজও প্রায় ৯০ শতাংশ হয়ে গেছে। ট্রায়ালও (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) চলছে। আশা করছি, মে মাসের মধ্যে এই অংশটুকুর কাজও শেষ করে ফেলতে পারব। জুনের পর থেকে মানুষ এর সুফল পুরোপুরি ভোগ করতে পারবে।’

পূর্বাভাস প্রক্রিয়ার পরিবর্তন দরকার

শিলাবৃষ্টির মতো ঘটনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পূর্বাভাস প্রক্রিয়ার পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আগাম সতর্ক করা ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘আমাদের পূর্বাভাসের যে বর্তমান প্রক্রিয়া তা দিয়ে এটা সম্ভব নয়। প্রক্রিয়াটি যদি অঞ্চলভিত্তিক হতো তাহলে সম্ভব ছিল। যত দ্রুত সম্ভব আমাদের আবহাওয়ার বিষয়টির বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন।’

গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘কৃষকরা আগে থেকে শিলাবৃষ্টি বা ঝড় হওয়ার কথা বুঝতে পারেন। কিছু গাছের পাতা দেখলে তাঁরা বুঝতে পারেন শিগগিরই বৃষ্টি আসবে। স্থানীয়দের এই জ্ঞানকে আরো ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়।

বাংলাদেশ এখনো কার্যকরভাবে ঝড় ও শিলাবৃষ্টির পূর্বাভাস দিতে শেখেনি উল্লেখ করে অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, বাইরের দেশগুলোতে প্রতি ঘণ্টায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়। আমাদের যে সক্ষমতা আছে সরকার তার যথাযথ ব্যবহার করতে পারছে না।’

পূর্বাভাসে জটিলতা

আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক জানান, পূর্বাভাসে একেবারে নির্দিষ্টভাবে কখন কোথায় শিলাবৃষ্টি হবে তা বলা কঠিন। কারণ মেঘ গঠন হবে বলা গেলেও এর বিস্তার কেমন হতে পারে এবং এর ওপর নির্ভর করে শিলাবৃষ্টি হবে কী হবে না কিংবা হলেও শিলার আকার কেমন হবে তা বলা খুবই জটিল।

আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম বলেন, কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টি মাত্র আধঘণ্টা বা দু-এক ঘণ্টা আগে টের পাওয়া যায়। ১০টি কালবৈশাখী ঝড় থেকে একটিতে শিলাবৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সতর্কতায়ই বেশি গুরুত্ব

শিলাবৃষ্টির ক্ষেত্রে সতর্কতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন আবহাওয়াবিদরা। শাহীনুল ইসলাম বলেন, ‘মার্চ-এপ্রিল-মে বা বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে কালো মেঘ দেখলে বুঝতে হবে কালবৈশাখী হতে পারে। শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাতও হতে পারে। এ জন্য কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। তখনই নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হবে।’

আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, শিলাবৃষ্টির ক্ষেত্রে সতর্কতার গুরুত্ব অনেক। কারণ এতে ফসলের ক্ষতি ছাড়াও মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী আহত হতে পারে।কালের কণ্ঠ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.net
Website Design By Kidarkar It solutions