সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি সত্ত্বেও ছাপানো অর্থ বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় সোমবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪
  • ৫১ দেখা হয়েছে

ডেস্ক রির্পোট:- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চলতি অর্থবছরের শুরুতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজারে অর্থের প্রবাহ কমাতে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়ানো হয়েছে। কমিয়ে আনা হয়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যও। আমদানি কমিয়ে আনা হয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। শিল্পের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি এ সময়ে বাজারে পণ্যের চাহিদারও পতন হয়েছে। কিন্তু বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যুকৃত নোট বা নগদ অর্থ সরবরাহের ক্ষেত্রে। গত নভেম্বরের পর বাজারে ছাপানো অর্থের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুনের পর থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যুকৃত নোটের পরিমাণ কমে আসছিল। কিন্তু অক্টোবরে এসে ছন্দপতন হয়। ওই মাস শেষে বাজারে ইস্যুকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৩ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা ছিল ব্যাংক খাতের বাইরে। এর পর থেকে ইস্যুকৃত নোট ও ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েছে। সর্বশেষ গত ১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের ইস্যুকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। সে হিসাবে আড়াই মাসের ব্যবধানে ১০ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা বাড়ে ছাপানো অর্থ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের নভেম্বর থেকে ব্যাংকগুলোয় নগদ টাকা উত্তোলনের চাপ বেড়ে গিয়েছিল। এক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনের প্রভাব রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। আবার নানা অনিশ্চয়তার কারণে একশ্রেণীর গ্রাহকও টাকা তুলে নিয়েছেন। অর্থ সংকটে পড়ায় কিছু ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে তারল্য সহায়তাও দেয়া হয়েছিল। এসব কারণে সংকোচনমূলক নীতির পরও ইস্যুকৃত নোটের পাশাপাশি ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যুকৃত নোট রেকর্ড ৩ লাখ ১১ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ওই মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯১ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে ইস্যুকৃত এত পরিমাণ নোট ও ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থ অতীতে কখনই ছিল না। এরপর জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করে মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতি সুদহার (রেপো রেট) বাড়ানো হয়। তুলে নেয়া হয় ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশের সীমাও। এরপর দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার ক্রমাগত বাড়ছে। চলতি ফেব্রুয়ারিতে সর্বোচ্চ সুদহার দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশে। সে হিসাবে গত সাত মাসে ঋণের সুদহার ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে কয়েক দফায় নীতি সুদহার বাড়িয়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির হার কমানোর কথা বলে সুদহার বাড়ানো হলেও সেটির প্রভাব এখনো দৃশ্যমান হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরেও মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। পুরো ২০২৩ সালেই সে হার ৯ শতাংশের বেশি ছিল। যদিও অর্থনীতিবিদদের দাবি, দেশের প্রকৃত মূল্যস্ফীতির হার বিবিএসের তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি।

এত পরিমাণ নগদ টাকা ব্যাংকের বাইরে রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক যে মুদ্রানীতির কথা বলছে, সেটি ব্যর্থ হবে। কারণ একশ্রেণীর মানুষ নগদ টাকার বস্তা নিয়ে বসে আছে। দেশের অর্থনীতির অর্ধেকের বেশি এখনো ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এ অবস্থায় সুদহার বাড়িয়ে কিংবা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে এখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।’

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কালো টাকার দৌরাত্ম্য প্রতিনিয়ত বাড়ছে। জাতীয় নির্বাচনের পর ঘুস, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি আরো বিস্তৃত হয়েছে। এ কারণে নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে, এটিই স্বাভাবিক।’

একটি দেশের অর্থনীতিতে কী পরিমাণ ইস্যুকৃত নোট থাকবে সেটির একটি আদর্শ অনুপাত রয়েছে। ২০২০ সালের আগেও বাংলাদেশ ব্যাংকের ইস্যুকৃত নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ব্যাপক মুদ্রার (ব্রড মানি) সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে কভিডসৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যে এ অনুপাত কিছুটা বেড়ে যায়। তার পরও ২০২১ সালের জুনে ব্যাংকের বাইরে ছিল ব্যাপক মুদ্রার সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৪২ শতাংশ। ২০২২ সালেও এটি ১৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গত বছরের জুনে এ অনুপাত ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ পর্যন্ত উঠে যায়। ডিসেম্বরে এসে এটি কিছুটা কমলেও তা প্রায় ১৫ শতাংশ রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য হলো প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটায় বর্তমানে এ অনুপাত সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘কোনো দেশে দুর্নীতি বাড়লে সেখানে নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ে। বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রেই ঘুস, দুর্নীতিসহ কালো টাকার দৌরাত্ম্য বাড়ছে। এ কারণে এখানে নগদ অর্থের চাহিদা কমছে না। সরকারি কর্মচারী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ প্রভাবশালীরা নগদ অর্থই ঘরে স্তূপ করে রাখছেন। তারা নগদ টাকা দিয়েই কোটি কোটি টাকার লেনদেন করছেন।’

আহসান এইচ মনসুর আরো বলেন, ‘সারা বিশ্বেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ায় নগদ অর্থের চাহিদা কমে আসছে। কিন্তু আমাদের দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ব্যাংক খাতের ব্যাপ্তি অনেক বড় হলেও নগদ টাকার চাহিদা কমছে না। এটি অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাতের ব্যর্থতা। বিশ্বব্যাপী মানুষ এখন কার্ড কিংবা প্লাস্টিক মানিতে লেনদেন করছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও মানুষ বাজার-সদাই করার ক্ষেত্রে “পেটিএম” ব্যবহার করছে। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো সেটি হয়নি। দেশের বড় পাইকারি বাজারগুলোয় এখনো নগদ লেনদেন হয়।’

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক নীতি ও ব্যাংক খাতের প্রতি গ্রাহকদের আস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় গত বছরের মাঝামাঝিতে ইস্যুকৃত নোটের পরিমাণ কমতে শুরু করে। একই সঙ্গে কমে আসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণও। জুলাইয়ে এসে ইস্যুকৃত নোটের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। আর আগস্টে ২ লাখ ৮২ হাজার ৪৮৭ কোটি এবং সেপ্টেম্বরে তা ২ লাখ ৭৭ হাজার ৩১২ কোটি টাকায় নেমে আসে। সে হিসাবে জুনের তুলনায় অক্টোবর শেষে ইস্যুকৃত নোটের পরিমাণ কমে ৩৮ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। কিন্তু নভেম্বর থেকে ছাপানো এ নোটের সংখ্যা আবারো বাড়তে শুরু করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক যদিও বলছেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করতেই ইস্যুকৃত নোট বাড়ানো হচ্ছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলেও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজন অনুযায়ী নোট ইস্যু করা হচ্ছে। ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি এখন বেশ ভালো। নীতি সুদহার বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে আমানতের সুদহারও বাড়ছে। এ কারণে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহিত হচ্ছেন। ইস্যুকৃত নোট বাড়লেও সেটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট ইস্যুকৃত ছাপানো টাকার ৯২ শতাংশই উচ্চমূল্যের তথা ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট। গত জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যুকৃত ৫০০ টাকার নোট ছিল ২৩৫ কোটি ৯২ লাখ ৬৯ হাজার ৯১৬টি। এসব নোটের মূল্যমান ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৬৩ কোটি ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার টাকা, যা মোট ইস্যুকৃত অর্থের ৩৮ শতাংশ। আর বাজারে ১০০০ টাকার নোট ছিল ১৬৮ কোটি ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬২৬টি, যার মূল্যমান ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৭ কোটি ৯৬ লাখ ২৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ বাজারে ইস্যুকৃত অর্থের ৫৪ শতাংশেরও বেশি ছিল ১০০০ টাকার নোট। সব মিলিয়ে গত জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যুকৃত ছাপানো টাকার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার ১৫৬ কোটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে উচ্চমূল্যের নোট সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ঘরে রাখার প্রবণতা বাড়ছে। আবার ঘুস-দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থও কালো টাকা হিসেবে সিন্দুকে চলে যাচ্ছে। হুন্ডিসহ অবৈধ অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রেও ১০০০ টাকার নোটই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। চাহিদা বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও উচ্চমূল্যের নোট বেশি ইস্যু করছে। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে ছায়া অর্থনীতি (শ্যাডো ইকোনমি) মূল অর্থনীতির চেয়েও হয়ে উঠছে শক্তিশালী।

ব্যাংকে এখন উচ্চমূল্যের নোটের চাহিদা অনেক বেশি বলে জানান অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এ শীর্ষ নির্বাহী বলেন, ‘উচ্চমূল্যের নোট সংরক্ষণ ও পরিবহন সহজ। এ কারণে বেশি অর্থ তুলতে এসে গ্রাহকরা ১০০০ টাকার নোট চাইছে। হাজার টাকার নোট সংরক্ষণ করতে জায়গা কম লাগে। মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ঘরে রাখার জন্য উচ্চমূল্যের নোটই বেশি ব্যবহার করছে। দেশে ব্যাংক খাতের মোট তারল্যের তুলনায় নগদ অর্থ বেশি। উচ্চমূল্যের নোট এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা যেতে পারে।’বণিক বার্তা

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.net
Website Design By Kidarkar It solutions