‘গরিব’ বলে শতকোটির বাড়ি চান তারা! সরকারি সম্পদ দখল

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৪
  • ৫৫ দেখা হয়েছে

ডেস্ক রির্পোট:- দুটি বাড়ির অবস্থান রাজধানী ঢাকার দুই অভিজাত এলাকায়। একটির অবস্থান গুলশানে। আরেকটি এলিফ্যান্ট রোডে। দূরত্ব অনেক হলেও এই দুই বাড়ি ঘিরে ঘটছে একই রকম ঘটনা। অবৈধভাবে দখল করে বসবাস করছেন সরকারের সাবেক দুই কর্মকর্তা। একজন জনপ্রশাসনের, আরেকজন পুলিশের। একজন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ড. মো. আশরাফুল ইসলাম, আরেকজন সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল আইজিপি) মো. শামসুজ্জোহা খন্দকার। শতকোটি টাকার বাড়ি দুটি শুধু দখলে রেখেই ক্ষান্ত হননি দুই কেউকেটা, নিজেদের ‘গরিব’ দাবি করে এগুলো স্থায়ীভাবে বরাদ্দ চেয়েছেন তারা।

অথচ একাধিক দামি গাড়ি ব্যবহার করা ছাড়াও তাদের নিজের নামে রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। ছেলেমেয়েরা চাকরি ও পড়াশোনা করছেন কানাডায়। দেশে অঢেল সম্পদের মালিক হলেও চাকরিজীবন শেষ করে নিজেদের অসহায় অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে অবৈধভাবে সরকারি সম্পদ দখল করে আছেন বছরের পর বছর ধরে।

জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মেহেরপুরের গাংনী আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন ড. মো. আশরাফুল ইসলাম।

প্রাপ্ত নথিপত্র বলছে, আশরাফুল ইসলামকে পাঁচবার নোটিশ দিয়েও রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ৩৩১ নম্বর বাড়ি থেকে বের করতে পারেনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। দখল না ছেড়ে তিনি নানা কৌশলে বাড়িটি নিজের নামে নেওয়ার চেষ্টা-তদবির করছেন। এ বাড়িটি উপাচার্য ভবন হিসেবে বরাদ্দ পেতে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ। তবে ওই আবেদন আমলে নেয়নি মন্ত্রণালয়।

অন্যদিকে গুলশান-১-এর ১৩৫ নম্বর সড়কে এসই(এ)-৬ নম্বর বাড়িটি দখল করে রেখেছেন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শামসুজ্জোহা খন্দকার। এ বাড়িতে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বসবাস করেছেন পুলিশের সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ। তিনি বিদায় নেওয়ার পর ২০০৮ সালে ওঠেন অতিরিক্ত আইজিপি শামসুজ্জোহা। ২০১৭ সালে তার চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও ঢাকায় কোনো বাড়ি বা ফ্ল্যাট না থাকার অজুহাতে ওই বাড়ির দখল ছাড়ছেন না।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ‘এলিফ্যান্ট রোডের ৩৩১ নম্বর বাড়িটি সাড়ে ৭ কাঠার ওপরে নির্মিত একটি দ্বিতল ভবন। আর গুলশান লেকের পাড়ঘেঁষে ১৩৫ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর বাড়িটি ২০ কাঠার ওপরে একটি বিলাসবহুল দ্বিতল ভবন। সাবেক দুই কর্মকর্তা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে অবৈধভাবে দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি দুটি দখল করে রেখেছেন। মাঝেমধ্যে বাড়ি সংস্কার করে দেওয়ার জন্য চাপও দেন তারা।’

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. আশরাফুল ইসলাম সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক ছিলেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বসবাসের জন্য ২০১৫ সালের ১১ মে এলিফ্যান্ট রোডের সংরক্ষিত তালিকাভুক্ত বাড়িটি তার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ৯ জুন তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর-উত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যান। এরপর তার লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বরাদ্দ বিধি ১৯৮২-এর ১৫(২) ও ১৫(৩) উপবিধির আওতায় ২০১৮ সালের ৯ জুন থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাস স্বাভাবিক ভাড়ায় ওই বাড়িতে বসবাসের অনুমতি দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এরপর ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বরে দ্বিতীয় দফায় বাড়িটির বরাদ্দ পেতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেন। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বসবাসের জন্য বরাদ্দের মেয়াদ দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়। ২০২০ সালের ৭ ডিসেম্বর সেই মেয়াদও শেষ হয়।

কিন্তু তার আগেই ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি বাড়িটি স্থায়ীভাবে তার নামে বরাদ্দের জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, অবসরের পর থেকে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি এ বাসাটি ছাড়া ঢাকায় তার আর কোনো বাড়ি বা ফ্ল্যাট নেই। তার দুটি সন্তান এখনো কোনো আয়-উপার্জনে সক্ষম হয়নি। বর্তমানে এ বাসা ছাড়া মাথাগোঁজার মতো তার কোনো ঠাঁই নেই। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তার গ্রামের বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। পেনশনের টাকা দিয়ে বাড়িভাড়া দিয়ে সংসার চালানো তার পক্ষে খুবই কঠিন হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে তার সেই আবেদনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এ অবস্থায় সরকারি আবাসন পরিদপ্তর বাসাটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাগিদ দেয়। এরপর সাবেক এই কর্মকতা বাসাটি বরাদ্দের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া আবেদনটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর কাছে পাঠান। তবে প্রধানন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না আসায় মন্ত্রণালয় তাকে জানিয়ে দেয়, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্থায়ীভাবে এ বাড়ি বরাদ্দ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সেইসঙ্গে বাড়িটির দখল স্থানীয় গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ অফিসের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সাবেক অতিরিক্ত সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু উল্টো বাড়ি হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পত্র দেন।

সরেজমিন এলিফ্যান্ট রোডের বাড়িটি পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রধান ফটকে একটি নামফলকে লেখা আছে, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. মো. আশরাফুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব (অব.) ৩৩১, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা’। ভেতরে মূল ভবনের দরজার সামনে কলিংবেল চাপতেই ওপর থেকে এক ব্যক্তি নিচে নেমে আসেন। প্রতিবেদক নিজের পরিচয় দিয়ে নাম জানতে চাইলে তা না জানিয়ে নিজেকে ড. আশরাফুল ইসলামের ছোট ছেলে বলে পরিচয় দেন। তার বাবা গ্রামের বাড়ি মেহেরপুরে আছেন বলেও জানান।

এই বাড়িতে তারা কীভাবে বসবাস করছেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকায় আমাদের কোনো বাড়ি বা ফ্ল্যাট নেই। বাসাটি স্থায়ীভাবে বরাদ্দ পাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটি যেহেতু এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, সে কারণেই তারা এখনো বসবাস করছেন। সরকার না করে দিলে বাসা ছেড়ে চলে যাব।’

কয়েকবার নোটিশ দেওয়ার পরও বাড়ি বুঝিয়ে না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে বাবার সঙ্গে কথা বললে তিনি ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।’

এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও অনুবিভাগ-১) মো. হাফিজুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতিতে আছেন জানিয়ে এ মুহূর্তে কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনকে কয়েকবার ফোন করা হলেও পাওয়া যায়নি। এসএমএস করলেও তিনি তার কোনো জবাব দেননি।

এদিকে গুলশান লেকঘেঁষা ১৩৫ নম্বর সড়কে পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপি শামসুজ্জোহা খন্দকারের দখলে থাকা বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি গ্রামের বাড়ি নবাবগঞ্জে আছেন বলে জানান তার ছোট ছেলে লাবিব খন্দকার। ইংলিশ মিডিয়ামে গ্র্যাজুয়েশন করা লাবিব জানান, তারা তিন ভাই এক বোন। এক ভাই প্রকৌশলী আরেক ভাই ব্যবসায়ী। ছোট বোন কানাডায় পড়াশোনা করছেন।

বাসার গ্যারেজে দেখা মিলল টয়োটা প্রাডো মডেলের একটি এবং হোন্ডা কোম্পানির ১৮০০ সিসির একটি জিপ গাড়ি। এ ছাড়া আছে একটি পিকআপ ভ্যান। ক্লাসিকস সুইটস নামে একটি মিষ্টি বানানোর কারখানার কাজে পিকআপটি ব্যবহার করা হয়। এই মিষ্টির ব্যবসাও সাবেক অতিরিক্ত আইজিপির। এ ছাড়া তার আরও ব্যবসা-বাণিজ্য আছে।

লাবিব খন্দকার জানান, সাবেক আইজিপি নুর মোহাম্মদ ২০০৮ সালে তাদের এ বাসায় উঠিয়ে দেন। ২০১৭ সালে তার বাবার চাকরি শেষ হয়। তবে ঢাকায় কোনো বাড়ি না থাকায় এ বাড়িতেই থেকে যান তারা।

লাবিবের কাছে বেশ কয়েকবার তার বাবার ফোন নম্বর চাওয়া হলেও তিনি দেননি। ছয় বছর ধরে অবৈধভাবে সরকারি এ বাড়িতে বসবাসের বিষয়ে জানতে চাইলে লাবিব বলেন, ‘বাবা দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। পূর্বাচলে আমাদের একটি প্লট আছে। ঋণ নিয়ে সেখানে বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করতে চাই। সেখানে বাড়ির কাজ শেষ হলে আমরা চলে যাব।’

বাড়ি দুটি নিয়ে সাবেক দুই সরকারি কর্মকর্তার এসব তৎপরতার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. শহিদুল ইসলাম ভূঞার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সাবেক অতিরিক্ত সচিব স্থায়ীভাবে বরাদ্দ পাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি আবেদন করেছেন। আবেদনটি এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শামসুজ্জোহা খন্দকার বাড়ি দখলে নেওয়ার জন্য আইনি লড়াই করছেন। আমরাও আইনজীবী নিয়োগ করেছি।’

সাবেক দুই কর্মকর্তার এ ধরনের প্রবণতা সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সারাজীবন চাকরি করে এখন ঢাকায় থাকার জায়গা নেই—এমন দাবি করা তাদের এক ধরনের প্রতারণা। এভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ দখলে রাখাও অপরাধ। এ অপরাধের জন্য তাদের শাস্তির আওতায় এনে রাষ্ট্র দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।’কালবেলা

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.net
Website Design By Kidarkar It solutions