ফুলবাড়ীর ৮ নারী কর্মকর্তা

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
  • ২৫৯ দেখা হয়েছে

মেহেদী হাসান, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর):- পাখির চোখে না দেখলে বিষয়টি ঠিক বোঝা যাবে না। আট নারী কর্মকর্তা কাজ করছেন একটি উপজেলায়! দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় বিভিন্ন পদে কাজ করছেন এ আট নারী কর্মকর্তা। তাঁরা নিজ নিজ দপ্তরে অবদান রেখে অর্জন করেছেন সুনাম ও খ্যাতি। তাঁরা সবাই সরকারের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। সরকারি এই আট নারী কর্মকর্তা ঘর-সংসার সামলানোর পাশাপাশি নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করে ইতিমধ্যে তাঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতার স্তর জানান দিয়েছেন।

রুম্মান আক্তার
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. রুম্মান আক্তার কুড়িগ্রামের বাসিন্দা। তিনি ২০১১ সালে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ২০১৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (ময়মনসিংহ) থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হন। ২০১৬ সালে ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা পদে যোগদান করেন। এই উপজেলায় ৪ বছর চাকরি করার পর ২০২১ সালে পদোন্নতি পেয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন।

কৃষিবিদ রুম্মান আক্তার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নসহ পৌরসভার প্রতিটি এলাকা পরিদর্শন করে কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর প্রচেষ্টায় এবার সরিষা চাষ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া এই উপজেলায় মালটা, ভুট্টা এবং সেই সঙ্গে উচ্চফলনশীল নতুন জাতের ধানের উৎপাদন বেড়েছে। মাঠপর্যায়ে এলাকার কৃষকদের বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে জৈব সার ব্যবহারেও উদ্বুদ্ধ করছেন রুম্মান আক্তার। এ ছাড়া দুই ফসলি জমিতে তিন ফসল ও তিন ফসলি জমিতে চার ফসল উৎপাদনে কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে আসছেন তিনি। একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে কৃষকদের সঙ্গে সর্বক্ষণ যোগাযোগ ও দায়িত্ব পালনে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন রুম্মান আক্তার।

রাশেদা আক্তার
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোছা. রাশেদা আক্তার ৩৭তম বিসিএস ক্যাডার। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মাছের অভয়ারণ্য রক্ষণাবেক্ষণসহ মৎস্যচাষিদের বিষমুক্ত মাছ চাষে উৎসাহিত করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন তিনি। ২০১৯ সালে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন রাশেদা আক্তার। এরপর ২০২২ সালের ২ অক্টোবর ফুলবাড়ী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাশেদা আক্তার বলেন, ‘আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সততা ও সুনামের সঙ্গে পালন করে যেতে চাই। এতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

হাসিনা ভূঁইয়া
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. হাসিনা ভূঁইয়া চাঁদপুর সদরের বাসিন্দা। তিনি ১৯৯৯ সালে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করে ২৮তম বিসিএসে নন-ক্যাডার পদে উত্তীর্ণ হন। পরে ২০১১ সালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। এরপর ২০১৪ সালে দিনাজপুর ফুলবাড়ী উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন হাসিনা ভূঁইয়া। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষায় গতি ফিরিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, করোনাকালে তিনি অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

হাসিনা ভূঁইয়া জানান, ‘নারীদের আলাদা করে দেখলে চলবে না। নারীরাও পারে সব ক্ষেত্রে অবদান রাখতে, এ জন্য চাই সহযোগিতা।’

রিতা মণ্ডল
উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রিতা মণ্ডল বরিশালের বাসিন্দা। তিনি বরিশাল বিএম কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করে ২০০১ সালে প্রথম ভোলা জেলার
বোরহান উদ্দিন উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। পরে ২০১৭ সালে ফুলবাড়ী উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা
হিসেবে যোগদান করেন।

রিতা মণ্ডল এ উপজেলার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দরিদ্র মায়েদের ভাতা প্রদান, নারীদের পারিবারিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিবাহ থেকে
বিরত রাখা, নারীদের সচেতন করাসহ সরকারঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
রিতা মণ্ডল বলেন, ‘প্রতিটি পরিবার থেকে সহযোগিতা পেলে মেয়েরা অনেক কিছু করতে পারবে। আমাদের সমাজে এখনো অনেক নারী অবহেলিত। এ কারণে নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো খুব জরুরি।’

হাবিবা সুলতানা
সোনালী ব্যাংক লিমিটেড ফুলবাড়ী শাখার ব্যবস্থাপক হাবিবা সুলতানা দিনাজপুরের একই উপজেলার বাসিন্দা। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ থেকে কৃষি বিভাগে স্নাতক এবং হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করে ২০০৯ সালে বিআরসি রিক্রুটমেন্ট থেকে সোনালী ব্যাংকে যোগদান করেন। ২০১০ সালে পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র অফিসার হয়ে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের ফুলবাড়ী শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগদান করেন, এখনো দায়িত্ব পালন করছেন।

হাবিবা সুলতানা এই শাখার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গ্রাহকসেবা প্রদানে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য দ্রুত সেবা প্রদান এবং তাঁদের বসার জন্য
পৃথক ব্যবস্থা করেছেন। এ ছাড়া এ শাখায় আগের চেয়ে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে শ্রেণীকৃত ঋণের চার ভাগের তিন ভাগ আদায় করেছেন হাবিবা সুলতানা।

তাসলিমা খাতুন
উপজেলা সহকারী প্রোগ্রামার অফিসার মোছা. তাসলিমা খাতুন সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলার বাসিন্দা। ২০১৩ সালে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং
ইন কম্পিউটার সায়েন্সে পাস করেন। ২০১৯ সালে প্রথমে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলা সহকারী প্রোগ্রামার পদে যোগদান করেন। সেখানে তিন বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০২২ সালে ফুলবাড়ী উপজেলা সহকারী প্রোগ্রামার (আইসিটি) অফিসার পদে যোগদান করেন।

মোছা. তাসলিমা খাতুন যোগদানের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সহযোগিতায় এলাকার বেকার নারী-পুরুষদের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে তাঁর সহযোগিতায় ‘অনলাইন সার্টিফিকেট সিস্টেম’ নামে একটি সফটওয়্যার তৈরি করেন। এতে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ২৭টি সেবা প্রদান করা হচ্ছে প্রযুক্তির মাধ্যমে। এ সেবা দেশের কোনো উপজেলায় এখনো চালু হয়নি।

মোছা. তাসলিমা খাতুন জানিয়েছেন, ফুলবাড়ী উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ১১টিতে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব রয়েছে এবং একটি স্কুল অব ফিউচার রয়েছে। খুব শিগগিরই ইডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলায় একটি ট্রেনিং সেন্টার হবে, যার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছে দেওয়া হবে।

রীতা রায়
উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা রীতা রায় চিরিরবন্দর আওলিয়া পুকুর ইউনিয়নের
বাসিন্দা। তিনি ১৯৮৩ সালে এসএসসি পাস করার পর আনসার ও ভিডিপি থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ১৯৮৬ সালে উপজেলা প্রশিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সফলভাবে দায়িত্ব পালন করায় ২০২১ সালে তিনি পদোন্নতি পান। পরে ২০২২ সালে ফুলবাড়ী উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন।

রোখসানা খাতুন
উপজেলায় তথ্য আপা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন মোছা. রোখসানা খাতুন নারগীছ। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকারঘোষিত প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করছেন তিনি। ‘তথ্য যোগাযোগপ্রযুক্তির মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় গ্রামের অসহায়, দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত নারীদের তথ্যে প্রবেশাধিকার এবং তাঁদের তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও সেবা প্রদান সুনিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন রোখসানা খাতুন নারগীছ।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.net
Website Design By Kidarkar It solutions